মার্কিনশক্তির আফগানিস্তান ত্যাগ

 

অবশেষে আপদ বিদায় হয়েছে। কিন্তু গোটা আফগানিস্তানকেই ভিখারি বানিয়ে তবেই দেশটা ছেড়েছে। যদিও আফগানদের ভাগ্যনিয়ন্ত্রণের অধিকার আফগানদের হাতে ছেড়ে যায়নি। আফগানিস্তানকে রেখে গিয়েছে নিজেদের হাতে গড়ে তোলা মধ্যযুগীয় চিন্তাধারার তালিবানদের হাতেই। এবং সেটাও পিছনের দরজা দিয়ে। সরাসরি তালিবানদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে পর্দার পিছন থেকেই তালিবানদেরকে ক্ষমতায় বসিয়ে তবেই দেশটা ছেড়েছে। এবং আগামী বেশ কয়েক প্রজন্মের আফগানরা যাতে তালিবানী শাসনের নিয়ন্ত্রণেই থাকতে বাধ্য হয়। সেইরকম বন্দোবস্ত করে রেখে তবেই গিয়েছে। এই যে মধ্যযুগীয় চিন্তাধারার তালিবানী সংস্কৃতি। আজকে গোটা আফগানিস্তান জুড়ে জাঁকিয়ে বসে রয়েছে বিগত প্রায় তিন দশক ধরে। এটাই আফগানিস্তানে মার্কিনশক্তির সবচেয়ে বড়ো সাফল্য। সোভিয়েতের সাহায্য নিয়ে আফগানিস্তানের যে সমাজ আধুনিক বিশ্ববন্দোবস্তের সাথে সংযুক্ত হওয়ার লক্ষ্যে আধুনিক জীবনযাপনের সংস্কৃতিকে আফগানিস্তানে কায়েম করতে চেয়েছিল। সেই গোটা সামাজধারাটিকেই সমূলে বিনাশ করতে সফল হয়েছে মার্কিনশক্তি। সফল হয়েছে এই তালিবানী শক্তির জন্ম দিয়ে। তালিবানদেরকে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির একেবারে উপযুক্ত করে তিলে তিলে তৈরী করে, আধুনিকপন্থী আফগান সমাজের শিকড়সুদ্ধ উপড়িয়ে ফেলে দিয়েছে। আর সেখানেই বসিয়ে দিয়েছে এই তালিবানী সংস্কৃতি। আবিশ্ব মার্কিনশক্তির স্বার্থরক্ষায় যে সংস্কৃতি কাজ করে চলেছে বিগত প্রায় তিন দশক ধরে। কাজ করে চলবে আরও বেশ কয়েক দশক জুড়ে। যতদিন মার্কিন স্বার্থরক্ষায় এই সংস্কৃতির প্রয়োজন থাকবে। ততদিনই আফগানিস্তান জুড়ে দাপিয়ে বেড়াবে তালিবানী সংস্কৃতি। আর ততদিনই মধ্যযুগীয় অন্ধকারে পড়ে থাকবে গোটা আফগানিস্তান। যার ফলে সবচেয়ে বেশি মূল্য দিতে হবে আফগানিস্তানের নারী সমাজকেই। আর সবেচেয়ে বেশি মূল্য দিতে হয়েছে আফগানিস্তানের সেই নারী সমাজকেই। বিশ্বজুড়ে জাঁকিয়ে অস্ত্রব্যবসা করার জন্য যে বিশ্বরাজনীতির সৃষ্টি করেছে মার্কিনশক্তি। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের হাত ধরে। আফগানিস্তান ইরাক লিবিয়া সিরিয়া সেই রাজনীতিরই সরাসরি বলি হয়েছে। না, পাশ্চাত্য মিডিয়ার পাঠশালার সুবোধ ছাত্রছাত্রী যারা বিগত তিন চার দশক জুড়ে ঝাড়েবংশে বেড়ে উঠেছে। তারা এই ইতিহাস কোনদিনই স্বীকার করতে রাজি নয়। ইতিহাসের বদলে তাদের কাছে মিডিয়ার তৈরী মিথ আর গল্পগাথাই বেশি বিশ্বাসযোগ্য। ভরসাস্থল।

 

১৪ই আগস্ট কাঁটাতার দিবস

 

১৪ই আগস্ট’ ১৯৪৭। পৃথিবীর ইতিহাসে বাঁধিয়ে রাখার মতো একটি দিন। এই দিন বাঙালি নামক একটি প্রজাতির মাতৃভূমিকে বেশ কিছু অবাঙালি জাতিগোষ্ঠী মিলে ইংল্যাণ্ডের তত্ত্বাবধানে দুই ভাগে ভাগ করে দেয়। না, সেইদিন বাঙালি নামক সেই প্রজাতিটির কিছুই এসে যায় নি সেই ঘটনায়। বরং হিন্দু এবং মুসোলমান নামক দুইটি ভিন্ন সম্প্রদায়ে আড়াআড়ি ভাগ হয়ে যেতে পেরে দুই সম্প্রদায়ের বাঙালিই সেদিন উৎসবে মেতে উঠেছিল স্বাধীনতার আনন্দে। একদিন আগে পিছে। খাতায় কলমে স্বাধীনতার অর্থ ব্রিটিশের অধীনতার নাগপাশ থেকে মুক্তিলাভের বিষয় ছিল ঠিকই। কিন্তু, বাঙালি নামক প্রজাতিটির মনের আনন্দে সেদিনের স্বাধীনতার আসল অর্থ ছিল হিন্দু মুসলিমের পারস্পরিক অধীনতা থেকে মুক্তিলাভ। এই যেমন আমি আপনি। আজ ২০২১ সালে এসেও কেমন সুন্দর হিন্দু আর মুসোলমান হয়ে বসে রয়েছি। সেদিন আমার এবং আপনার পূর্বপুরুষেরা মহানন্দে স্বাধীনতার আনন্দে মেতে উঠেছিলেন। ব্রিটিশের অধীনতা থেকে মুক্তিতে নয়। বাঙালি হিন্দু সেদিন আনন্দ করেছিল বাঙালি মুসলিমের থেকে আলাদা হতে পারার আনন্দে। বাঙালি মুসলিম সেদিন আনন্দ করেছিল বাঙালি হিন্দুর থেকে আলাদা হতে পারার আনন্দে। হিন্দু বাঙালির মাথার উপরে ছিল মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকারের অধীনস্থ থাকার রাজনৈতিক খাঁড়া। বাঙালি মুসলিমের মাথার উপরে ছিল হাজার বছরব্যাপী হিন্দু সামাজের আধিপত্যের সামাজিক খাঁড়া। এই দুই খাঁড়ার হাত থেকেই বাঙালি নামক প্রজাতিটির এই দুই হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ ১৯৪৭ সালের এইদিনে অর্থাৎ ১৪ই আগস্টে রক্ষা পেয়েছিল। সৌজন্যে অবাঙালি জাতিগোষ্ঠী সমূহ এবং তাদের বাঙালি প্রতিনিধিবৃন্দ। সংখ্যায় তারা কম হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ হিন্দু ও মুসলিম বাঙালি মাত্রেই সেদিন তাদের কাছে কৃতজ্ঞ ছিলেন নিঃসন্দেহে। ছিলেন বলেই না, ১৯০৫ সালের মতো সেদিন আর বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন গড়ে ওঠেনি। তাই বাঙালি নামক প্রজাতিটির হিন্দু এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের সকলেই এই ১৪ই আগস্টের কাছে এবং বাংলাভাগের কাণ্ডারী অবাঙালি জাতিগোষ্ঠী সমূহের কাছে চির কৃতজ্ঞ। আজ সেই কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনদিবস। আমাদের বাঙালি হিন্দু বাঙালি মুসলিমের ভিতরে আর যতই বিরোধ থাকুক না কেন। এই ১৪ই আগস্ট নিয়ে কোন বিরোধ নাই। বাঙালি নামক প্রজাতিটির উভয় সম্প্রদায়ের মানুষের কাছেই আজ উৎসবের তিথি। আজ বাংলা ভাগের দিন। আজ হিন্দু মুসলিমের নিজ নিজ অঞ্চল বুঝে নেওয়ার দিন। একান্নবর্তী পরিবার ভেঙে ভিন্ন হাঁড়ি নিয়ে আলাদা হওয়ার দিন। তাই আজ আমাদের স্বাধীনতার উৎসব। বাঙালি মুসলিমের হাত থেকে, বাঙালি হিন্দুর হাত থেকে, বাঙালি হিন্দু ও বাঙালি মুসলিমের স্বাধীনতা প্রাপ্তির উৎসব আজ।

এক্টিভিটি লগ

 

বাঙালির জীবনে ফেসবুক এখন প্রতিদিনের দিনপঞ্জী হয়ে উঠেছে। অন্তত যাঁদেরই হাতে একটি স্মর্টফোন রয়েছে। ডেক্সটপ ও ল্যাপটপ কিংবা ট্যাবের মালিকদের তো কথাই নাই। বিশেষ করে বিগত দশ বছরে বাঙালির ফেসবুক চর্চা এমন জয়াগায় পৌঁছিয়ে গিয়েছে। যেখান থেকে বঙ্গসংস্কৃতির বিচার ও বিশ্লেষণে আজকে ফেসবুকের জন্যেই একটা বড়ো অধ্যায় রাখতে হবে। নিশ্চিত ভাবেই বলা যায়। পরবর্তী সময়ে একুশ শতকের বাঙালির সমাজজীবন নিয়ে গবেষণায় ফেসবুক অন্যতম একটি বিষয় হয়ে উঠতে বাধ্য। এখন ফেসবুক আসায় আমাদের জীবনে কি কি বদল হয়েছে, হচ্ছে এবং হবে। সেটি যেমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তেমনই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ফেসবুকের মাধ্যমে বাংলার সমাজজীবনের মূল দিকগুলি কতটা ও কিভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে। এটা ঠিক, এই বিষয়গুলি আমাদের মতো সাধারণ মানুষের গবেষণা করার বিষয় নয়। আমরা সেই পথে এগোতেও চাইছি না। সেই পথে এগোবেন তাঁরাই যাঁরা এই সকল বিষয়ের বিশেষজ্ঞ মানুষ। কিন্তু তাহলেও সাধারণ ভাবেই সাধারণ মানুষের দৃষ্টিপাতে বিষয়গুলি কতটা ও কিভাবে রেখাপাত করে। সেই বিষয়ে সাধারণ ভাবেই আলোচনার পরিসর সজীব রাখা যেতেই পারে। অবশ্যই সেটি নানা মুনির নানা পথ হবে। নির্দিষ্ট কোন সিদ্ধান্ত বা উপসংহারে আসার কথা নয়। কথা হলো, কে কি ভাবছেন। তাই নিয়ে।

ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক পরিচয়

 

মানুষকে তার ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক পরিচয়ে বিশেষায়িত করার যে সংস্কৃতি। সেটি বাঙালির মজ্জাগত এক অভ্যাস। এই অভ্যাস হতো না যদি না, বাঙালি মূলত দুইটি পৃথক ধর্মীয় সম্প্রদায়ে বিভক্ত হয়ে যেত। এবং দুই সম্প্রদায়ের ভিতরে সামাজিক এবং বিশেষ করে বৈবাহিক মিলনের পথ অবরুদ্ধ না থাকতো। এই অবরুদ্ধ পথ দিয়েই সাম্প্রদায়িক বিভাজনের রাজপথ ক্রমশ বিস্তৃত ও প্রসারিত হতে থাকে। আমাদের বাঙালি জাতিতেও ঠিক সেটিই ঘটেছে। আমরা ভুলে গিয়েছি। মানুষের প্রাথমিক পরিচয় কোনটি। শাশ্বতকাল ব্যাপী সময় সীমায়, মানুষের প্রাথমিক পরিচয় তার ভাষিক পরিচয়ের সূত্রেই গড়ে ওঠে। সেই পরিচয়ে যাঁরই মাতৃভাষা বাংলা। তিনি সেই ভাষা ব্যবহার করুন আর নাই করুন। তাঁর প্রাথমিক পরিচয়, তিনি বাঙালি। এবং সেই পরিচয়ের সূত্রেই তিনি বাঙালি জাতির একজন প্রতিনিধি। সে তিনি বিশ্বের যে প্রান্তেই থাকুন। যে দেশেরই নাগরিক হন না কেন। এই যে সোজা কথাটুকু। এইটিই আমরা আজ ভুলে গিয়েছি প্রায়। ধর্ম একটি ব্যক্তিগত বিশ্বাস এবং চর্চার বিষয়। সেই বিশ্বাস ও চর্চায় কোন জাতি গড়ে ওঠে না। ধর্মীয় সম্প্রদায় গড়ে ওঠ। কিন্তু ভাষিক পরিচয় কোন বিশ্বাসের বিষয় নয়। চর্চার বিষয় হলেও সেটি জন্মগত বিষয়। সেই পরিচয়ই একজন ব্যক্তি মানুষের প্রাথমিক পরিচয়। মাতৃ‌ভাষার মাধ্যমেই আমরা আমাদের জাতির সাথে যুক্ত থাকি। আবার মাতৃভষার মাধ্যমেই আমরা অন্যান্য জাতি থেকে পৃথক থাকি। ফলে একমাত্র জাতিগত পরিচয়েই আমরা কারুর কাছে স্বদেশী। আবার জাতিগত পরিচয়েই আমরা কারুর কাছে বিদেশী। কিন্তু ধর্মীয় সম্প্রদায়ের যে পরিচয়। যেহেতু সেই পরিচয় কোন জাতিগত পরিচয় নয়। সেহেতু সেই পরিচয়ে আমরা করুরই কাছই স্বদেশী নই। কারুর কাছেই বিদেশীও নই। বহু বিদেশী মানুষও যেমন ধর্মীয় পরিচয়ে আমার সম্প্রদায়ের ভুক্ত হতে পারেন। ঠিক সেমনই বহু স্বদেশী মানুষও আমার সম্প্রদায়ের না হয়ে ভিন্ন সম্প্রদায় গোষ্ঠীর হতে পারেন। তাতে আমাদের ভিতরে কোন পার্থক্য সূচিত হয় না। আবার একই সম্প্রদায়ের বিদেশী মানুষের সাথে আমার সাম্প্রদয়য়িক সাযুজ্য থাকা সত্তেও জাতিগত পার্থক্য সবসময়ই বিদ্যমান থেকে যায়, যাবে। 

স্ত্রীলিঙ্গ অবরোধ

 

আমাদের আটপৌরে জীবনের চৌহদ্দীতে পুরুষতান্ত্রিক জীবনবোধের পরিসরে কেমন নারীকে জীবনসঙ্গী হিসেবে পেতে চাই আমরা?  উচ্চশিক্ষিত, শিক্ষিত, আধাশিক্ষিত, অশিক্ষিত পুরুষ প্রজাতির ব্যক্তিরা? অবশ্যই আমাদের শিক্ষা দীক্ষা রুচি আর্থসামাজিক প্রেক্ষিতের ভিত্তিতে এই চাহিদা বিচিত্ররকম ভাবেই ভিন্ন রকমের হবে ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে তার একটা শ্রেণী চরিত্রের বিন্যাসও খুঁজে পাওয়া যেতে পারে নিবিড় বিশ্লেষণের উদ্যোগে এবং এই ভিন্নধর্মী প্রত্যাশার মাপের মধ্যে পছন্দের নারীর কাছ থেকে কত কি পাওয়ার স্বপ্নে আমাদের যাবতীয় উদ্যোগ উদ্বোধিত হয়ে থাকে কিন্তু সেই স্বপ্নের অন্তর্বাসের আড়ালটুকু মুক্ত করলে দেখি, নারীকে আমরা বশ করতেই চাই হ্যাঁ, আবহমান কাল ধরে নারীর কাছে আমরা বশ্যতাই আশা করে এসেছি নারীর প্রতি আমাদের প্রেম প্রীতি ভালোবাসা, অন্তর্লীন সেই আশার প্রেক্ষিতেই আমাদের চেতনার অলিন্দে জায়মান হয় নারীকে অধিকার করার প্রয়োজনেই বিবাহপ্রথার উৎপত্তি নারীকে নিজের বশে আনার মধ্যেই  পৌরুষের সার্থকতা আর তাই পুরুষমনের আশা আকাঙ্খাগুলি সেই প্রেক্ষিতেই নারীকে ঘিরে আবর্তিত হয় যে নারীকে বুকের মধ্যে আলিঙ্গনাবদ্ধ করে তার নরম ওষ্ঠে ওষ্ঠ ডুবাই, ঠিক নিবিড় চুম্বনের সেই নীরব নিভৃত মাহেন্দ্রক্ষণে মন তৃপ্ত হয় সেই অধিকার বোধেরই সক্রিয় পরিতৃপ্তিতে নারীর ভালোবাসায় নয় নয় তার চুম্বনের আস্বাদনে তৃপ্তি আমার অধিকারবোধের চৌহদ্দীতে নারীর আত্মসমর্পণে

কন্ঠরোধের গল্প

রাষ্ট্রশক্তি আর ব্যক্তি মানস কোথাও কি একটা মিল দেখা যাচ্ছে? অন্তত বর্তমান ভারতবর্ষের রাজনীতি ও সমাজিক পরিসরে। রাষ্ট্র পরিস্কার বলে দিতে চাইছে, হয় আমার স্তাবকতা কর। আর নয়তো নিশ্চুপ থাকো। কিন্তু কোনভাবেই রাষ্ট্রের সমালোচনা করা চলবে না। রাষ্ট্রকে তার কোন কাজের জন্য প্রশ্ন করা যাবে না। রাষ্ট্রের জবাবদিহির কোন দায় নেই জনতার কাছে। রাষ্ট্র হয়তো একটি বিমূর্ত সত্তা। কিন্তু রাষ্ট্রকে পরিচালনা করার অধিকার প্রাপ্ত প্রশাসন কোন বিমূর্ত সত্তা নয়। প্রশাসনকে চোখের সামনে দেখা যায়। তার কাজকর্মের ফলে আমাদেরকে ভুগতে হয়। কিন্তু বর্তমান সংস্কৃতিতে সেই প্রশাসনকে তার কাজকর্ম সম্বন্ধে কোন প্রশ্ন করা চলবে না। প্রশাসন ও তার কর্তাব্যক্তিদের কাজের জন্য, তাদের কাছ থেকে কোন জবাবাদিহি চাওয়া যাবে না। অর্থাৎ সহজ কথায়, প্রশাসনের স্তাবকতা করতে অসুবিধে হলে, নীরব থাকাই শ্রেয়। মুখ খুললেই বিপদ। সম্প্রতি চালু হয়েছে নতুন তথ্য প্রযুক্তি আইন। ছাব্বিশে মে বুধবার থেকে। আমরা এখনো এই আইনের খুঁটিনাটি বিষয়ে ওয়াকিবহাল নই। কিন্তু প্রকাশিত খবরের সূত্র ধরে একথা বুঝতে অসুবিধে হচ্ছে না, সামাজিক মাধ্যমগুলিতে রাষ্ট্র অর্থাৎ প্রশাসনের বিরুদ্ধে মুখ খুললে, সমালোচনা করলে, প্রশ্ন তুললে এবার থেকে আইনের নাগালে নাকানিচোবানি খেতে হতে পারে। কয়েকটি সামাজিক মাধ্যমের সাথে এই বিষয় নিয়ে প্রশাসনের টাগ অফ ওয়ার চলছে। এমনকি দিল্লী হাইকোর্টে সরকারী ফরমানের বিরুদ্ধে মামলাও দায়ের হয়েছে। বহুজাতিক সংস্থার তরফ থেকে। তাদের বক্তব্য এই আইনের অন্যতম ধারা ‘তথ্যের উৎসমূল চিহ্নিতকরণ’ আসলেই অসাংবিধানিক। কারণ ভারতীয় সংবিধান অনুসারে মানুষের ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা মানুষের মৌলিক অধিকারের বিষয়। কিন্তু নতুন এই আইন সাংবিধানিক মৌলিক অধিকার রক্ষার পরিপন্থী।

সাপে নেউলে

 

বই আর বাঙালি। সম্পর্কটা কি অনেকটা সাপে নেউলের মতোন? জানি, এমন কথায় বাঙালি মাত্রেই চটে উঠবেন। সেটাই স্বাভাবিক। ঢাকা আর কলকাতা। একুশের গ্রন্থমেলা আর কলিকাতা পুস্তকমেলা। দুটিই আন্তর্জাতিক স্তরে প্রখ্যাত। ঢাকার বাংলা বাজার। কলকাতার কলেজস্ট্রীট। বাঙালি লেখক ও পাঠকের তীর্থক্ষেত্র। এবং রবীন্দ্রনাথ। সাহিত্যে বাঙালির নোবেল প্রাপ্তি। সেই একবার। তারপর এক শতাব্দী সময় চলে গেলেও ঐ একটি নোবেলের ওজনেই আমরা এখনো করে খাচ্ছি। সেই বাঙালির বই প্রীতি নিয়ে প্রশ্ন তুললে পাবলিক ছেড়ে দেবে নাকি? কিন্তু বাঙালির বই প্রীতির কথা বলতে গেলে। প্রথমেই বলতে হয়, কারুর কাছ থেকে বই চেয়ে নিয়ে এসে সেই বই তাকে ফেরত দেওয়ার বিষয়ে আমাদের ঐতিহাসিক অনীহার কথা। পদার্থ বিজ্ঞানের সূত্রের মতোন এই অনীহা সর্বাত্মক হলে বই প্রীতিও মারাত্মক হওয়ারই কথা। কিন্তু অধিকাংশ সময়েই দেখা যায়, আমরা যত বই কিনি তত বই পড়ি না। যত বই সংগ্রহ করি তত বই খুলে দেখি না। যত বই পড়তে শুরু করি তত বই শেষ অব্দি পড়ি না। যত বই শেষ অব্দিও বা পড়ি, তত মনে রাখতে পারি না। যতখানি মনেও রাখতে পারি ততখানি আন্য কারুর সাথে আলোচনাও করি না। ফলে আমাদের বই প্রীতির বিষয় যত কম বলা যায়। তত বেশি ভালো। জাতিগত মর্য্যাদা রক্ষা হয়। নাহলে বড় বিব্রত বোধ করতে হয়।

বাংলার মাটি বাংলার জল

 

বরাৎ জোর তিনি আজ জীবত নেই। থাকলে চমৎকৃত হতেন খুব। একই মানুষের দুদিন পঁচিশে বৈশাখ। ঠিক। আজ বাংলাদেশে পালিত হচ্ছে পঁচিশে বৈশাখ। আগামী কাল পশ্চিমবঙ্গ সহ অন্যান্য বঙ্গভাষী অঞ্চলে পালিত হবে সেই পঁচিশে বৈশাখ। কবি বেঁচে থাকলে তার স্বপ্নের সোনার বাংলার এই হাল দেখে কি লিখতেন জানি না। কিন্তু খুব কি অবাক হতেন? মনে হয় না। সেই ১৯০৫ এর বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের কেন্দ্রে থেকে শতভঙ্গ বাংলা দেশের চিত্র দেখে নিয়ে ছিলেন। দেখে নিয়েছিলেন বংশ পরম্পরায় বাঙালির সাম্প্রদায়িক মন মনন ও চেতনার প্রকৃতিগত স্বরূপ। হ্যাঁ হিন্দুমুসলিম সম্প্রীতির সমাজ বাস্তবতাও যেমন সত্য ছিল। ঠিক একই রকম সত্য ছিল জাতপাত ভিত্তিক সামাজিক ভেদাভেদের সমাজ বাস্তবতা। সেই ভেদাভেদের সমাজ সংস্কৃতির উপরেই ব্রিটিশের আনুকূল্যে গড়ে উঠছিল এক রাজনৈতিক পরিসর। কবি সেই রাজনৈতিক পরিসরের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে তাঁর নিজের কাজ চালিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন নিজের মতোন করে। আর নিজের মতো করে চালাতে হয়েছিল বলেই, নিজেই নিজেকে প্রবোধ দেওয়ার প্রয়াস করেছিলেন। ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে, তবে একলা চলো রে’। একলাই চলতে হয়েছিল কবি কে। তাঁর ডাক হাতে গোনা কয়েকজন নিশ্চয় শুনেছিলেন। কিন্তু জাতি হিসাবে বাঙালি কবি’র ডাক শোনেনি কোনদিন। আজ পঁচিশে বৈশাখে যদি সত্য অর্থেই কবিকে স্মরণ করতে হয়। তবে স্বীকার করে নিতে হবে সেই সত্যটুকুও। যদি আজও সেই সত্য স্বীকারে ব্যার্থ হই। তবে বুঝতে হবে আত্মপ্রবঞ্চনার সকল সীমাই লঙ্ঘন করে ফেলেছি।

ফ্রেমের ছবি ছবির ফ্রেম


না, আমার শঙ্খ ঘোষের সাথে কোন সেল্ফি নাই। কোন ছবি নাই। মানুষটির সাথে কোনদিন মুখোমুখি দেখাও হয় নি। শুনিনি কোনদিন তাঁর কোন বক্তৃতা প্রকাশ্য জনসভায় কিংবা বৌদ্ধিক সেমিনারে। কোন সাহিত্যসভাতেও দেখা হয়নি তাঁর সাথে। কিন্তু কথা হয়েছে নিরন্তর। না দূরাভাষে নয়। দূর আভাসেও নয়। কথা হয়েছে নিরবে নিভৃতে। একান্তে তাঁর লেখার ভিতর দিয়ে। যেমন কথা হয় আমাদের অনেকেরই, রবি ঠাকুরের সাথে। যেমন কথা হয় কারুর কারুর কার্ল মার্কসের সাথে। কিংবা লেলিনের সাথে। কখনো সখনো গ্রামশীর সাথে। ফ্রয়েডের সাথে। স্বামী বিবেকানন্দ কি ঋষি অরবিন্দের সাথে। রাসেলের সাথে, বার্নাড শ’র সাথে। রোমা রোঁলা কিংবা মানবেন্দ্র রায়ের সাথে। ঠিক তেমনই শঙ্খ ঘোষের সাথেও অন্য অনেকের মতোই আমারও কথা হয়েছে। হয় এবং আরও হবে। নিরন্তর হবে। যতদিন আয়ু সাহায্য করবে ততদিন।

অরাজনৈতিক নয়

 

সোশ্যালসাইটে বিশেষ করে ফেসবুকে, অনেকেরই সাম্প্রতিক রাজনীতির বিষয় নিয়ে আলাপ আলোচনায় অংশগ্রহণে আপত্তি রয়েছে। আপত্তি থাকা না থাকা, একজন ব্যক্তির মৌলিক অধিকারের বিষয়। সেই বিষয় নিয়ে আপত্তি করার কোন জায়গা থাকে না। এবং আপত্তি থাকার এই সামাজিক প্রবণতা কয়েকজনের ভিতরে সীমাবদ্ধ থাকলে সেই বিষয়ে আলোচনাও অর্থহীন। কিন্তু সেই একই প্রবণতা যখন একটা গোটা সমাজের প্রকৃতি হয়ে উঠতে থাকে। তখন সেই বিষয়ে আলাপ আলোচনার আশু প্রয়োজন রয়েছে বই কি। গণতান্ত্রিক নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় কে কোন দলের কোন প্রার্থীকে ভোট দেবেন, সেটি ব্যক্তি মানুষের একান্ত নিজস্ব একটি বিষয়। কিন্তু সমাজ রাজনীতির ঘূর্ণীতে সাধারণ মানুষ কিভাবে আবর্তিত হচ্ছে, এবং হতে বাধ্য হচ্ছে সেটি সর্বজনীন আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠাই বাঞ্ছনীয়। কিন্তু সাধারণ মানুষ সেই আলোচনায় আগ্রহী নন আর ইদানিং। তার একাধিক কারণ বর্তমান। কিন্তু প্রধানত যে কারণগুলি মানুষকে মুখে কুলুপ আঁটতে বাধ্য করে সেগুলির দিকে লক্ষ্য রাখলেই বর্তমান রাজনীতির মূল ব্যাধির হদিশ পাওয়া যেতে পারে।