বাংলা সিরিয়াল ও ধর্ষিত শৈশব


টিভি সিরিয়াল প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই দৈনন্দিন বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিগত চার দশক ব্যাপি সময়সীমায় আজকের সময়ে এসে টিভির অপরিহার্যতা বিতর্কের উর্দ্ধে। আর সেই সূত্রেই বাংলা সিরিয়ালের রমরমা। একুশ শতকের বাংলায় সিনেমা হলগুলি উঠে যেতে থাকায় টিভিই হয়ে দাঁড়িয়েছে বিনোদনের প্রধান মাধ্যম। তাই অর্থলগ্নীর পসরা নিয়ে প্রযোজকদের লাইনও দীর্ঘ হচ্ছে টিভি চ্যানেলগুলির দরজায় দরজায়। যুগ পরিবর্তনের সাথেই ঘটে চলেছে এই স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু অস্বাভাবিক ঘটছে যে বিষয়টি, সেটি হল টিভি সিরিয়ালের মাধ্যমে বাংলার নিজস্ব সংস্কৃতিকে এবং বাংলার ভবিষ্যত প্রজন্মকে বিকলাঙ্গ করে দেওয়ার একটি ধারাবাহিক অপচেষ্টা চলেছে পুরোদমে। আর সেই কাজেই নিজেদের উজার করে দিয়ে দুই পয়সা কামিয়ে নিচ্ছেন নির্দেশক থেকে চিত্রনাট্যকার। সংলাপ সংযোজক থেকে কলাকুশলী অভিনেতা অভিনেত্রী সকলেই। টাকার কাছে আর সব কিছুই তুচ্ছ। যে কাজে ভালো টাকা, বেশি টাকা, সেই কাজই লক্ষ্য। কাজের ফল কি হতে পারে সেই বিষয়ে ভাবনা করার মতো সময় কার আছে? ভাবনার পরিশ্রমটুকুও করতে কেইবা রাজি হবে?


কলকাতায় নির্মিত বর্তমান সিরিয়ালগুলিতে একটি বিশেষ প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, প্রায় প্রতিটি গল্পেই যৌথ সংসার। বিপুল বৈভব। ব্যবসা বাণিজ্যের রমরমা। কেবল ড্রইংরুম সিন আর সেই সংসারে মাতৃস্থানীয়া এক বা একাধিক মহিলা খল নায়িকা। এক বা একাধিক পুরুষ সাকরেদ নিয়ে বাকি সদস্যদের প্রাণ ওষ্ঠাগত করে দিচ্ছে। এরই সাথে গোদের উপর বিষফোড়ের মতো যোগ হয়েছে, এই ধরণের কোন কোন সিরিয়ালের কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসাবে দুধের শিশুদের নিয়ে এসে তাদেরকে এইরকম পরিস্থিতির আবর্তে ফেলে ক্রমাগত ঘুরপাক খাইয়ে সিরিয়ালগুলিকে টেনে টেনে লম্বা করা হচ্ছে তো হচ্ছেই। প্রতিদিন টিভি খুললেই দেখা যাবে চ্যানেল থেকে চ্যানেলে একই গল্পের বিভিন্ন রকমফের। আর খলচরিত্রগুলির কূটকাচালি ষড়যন্ত্র আর মিথ্যাচারে অবোধ শিশুর দুচোখ ভরা জল। যত বেশি জলের ধারা ততবেশি জনপ্রিয় সিরিয়াল। সপ্তাহের সাতটি দিন ধরেই এই একই কাহিনী। ভাবতে অবাক লাগে এই ধরণের কুরুচিকর এবং নিম্নমানের সাংস্কৃতিক অবক্ষয়ী সিরিয়ালগুলি জনপ্রিয় হয় কি করে? চিন্তা আসে ড্রাগাসক্ত বিপথগামী নেশাগ্রস্তদের মতো সাধারণ পারিবারিক মানুষগুলি দিনের পর দিন এইসব ছাইপাঁশ গিলতে থাকে কোন জাদুতে? তবে কি বাঙালির রুচি সংস্কৃতির এইটাই বর্তমান চিত্র? এইরকম গল্প ও চিত্র দেখাটাকেই বিনোদন উপভোগের অন্যতম মাধ্যম করে তুলেছে আপামর জনসাধারণ? কারণ জনপ্রিয়তাই যেখানে টিভি সিরিয়ালগুলির চলার জীয়নকাঠি; সেখানে এই প্রশ্নটিই তো উঠে আসার কথা স্বাভাবিক ভাবেই। মাসের পর মাস একই রকমের গল্প, আর বেশ কিছু ক্ষেত্রেই সেই গল্পের কেন্দ্রে অবোধ শিশুর বিরুদ্ধে জঘন্যতম অপরাধ সংঘটিত করেও খল নায়ক নয়িকারা দিব্যি দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। বাংলা মানুষ সেইসব গল্পগুলিকেই প্রতিদিনের সান্ধ্যবিনোদনের মাধ্যম করে তুলেছেন পরম আনন্দে? আর নিশ্চিন্তে নিদ্রা দিচ্ছে সমাজ বিজ্ঞানী থেকে বিখ্যাত বুদ্ধিজীবি সমাজ?

আনেকেই বলে থাকেন তাদের বাড়িতে ছেলেমেয়েরা বাংলা সিরিয়াল দেখে না। বাংলার চল নাই। সেটাও ভালো কথা নয় মোটেই। বাংলার বদলে যে হিন্দী ও ইংরাজী সিরিয়াল দেখে তারা বিকশিত হয়ে উঠছে তাতে বঙ্গসংস্কৃতির সাথে যোগ থাকছে কতটুকু। কেউ কেউ বলতে পারেন ছাইপাঁশ বাংলা সিরিয়াল দেখে বঙ্গসংস্কৃতির কুপ্রভাবে না পড়াই তো ভালো। সত্যই কথা। কিন্তু বাঙালির সন্তান বাংলায় থেকেও বঙ্গসংস্কৃতির দূরবর্তী থেকে বিকশিত হয়ে উঠলে সেটা যে অভিভাবকদের পক্ষেই অসম্মানের, অনেককে দেখা যায় এই বিষয়ে সচেতন নন আদপেই। কিন্তু যাদের বাড়ির কচি কাঁচারা দিনের পর দিন এইসব কুরুচিপূর্ণ বাংলা সিরিয়াল দেখতে দেখতে বড়ো হয়ে উঠছে, কি হবে তাদের? এইসব নিম্নরুচীর হিংসা দ্বেষপূর্ণ নিরন্তর ষড়যন্ত্র মূলক কাহিনীগুলি কি অসীম কুপ্রভাব ফেলে চলেছে তদের কচি কিশলয়ের অপুষ্ট মস্তিষ্ক থেকে কোমল হৃদয়ে; সে বিষয়ে কজন সচেতন আমরা? সাধারণ জনগণ? বাড়ির অভিভাবকরা? হ্যাঁ অনেকেই বলে উঠবেন, আজকাল স্কুলের পড়ার চাপে হোমটাস্কে দিশাহারা শিশুদের সময় কোথায় টিভির সামনে বসে থাকার। কথার মধ্যে অবশ্যই সত্যতা আছে। কিন্তু সেটাই তো রক্ষা কবচ হতে পারে না। নয়ও কখনোই। সব বাড়িতেই বাচ্চারা একই রকম পরিবেশে বড়ো হয়ে উঠতে থাকে না কিন্তু। সব অভিভাবকরাই সন্তানদের পেছনে সমান নজর দিতে পারেন না। ফলে পড়ার চাপে শিশুরা টিভির সামনে বসে বাংলা সিরিয়াল দেখে ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, জোর দিয়ে বলা যায় না সে কথা। এবং অনেক বাড়িতেই শিশুরা মায়ের সাথে বসেই হয়তো সিরিয়ালগুলি গিলতে থাকে। কেউই কি আমরা ভেবে দেখি, কি রকম সাংঘাতিক প্রভাব পড়তে পারে কোমল মতি অবোধ শিশুদের উপর। এইসব কাহিনীগুলির? দিনের পর দিন তারই মতো শিশুটিকে পর্দায় নিগৃহীত হতে দেখতে দেখতে শিশুমনের অবচেতনে কিরকম সুদূর প্রসারী খারাপ ফল পড়তে পারে ভেবে দেখবো না আমরা কেউ? ক্রমাগত কাল্পনিক চরিত্রদের কূটকাচালি দেখতে দেখতে, মিথ্যাচারের কার্যকারিতা দেখতে দেখতে কোন মূল্যবোধের শরিক হয়ে উঠছে আজকের শিশু কিশোর? কজন ভেবে দেখি সেই বিষয়টি? চোখের সামনে দিনের পর দিন দূর্বলের উপর সবলের নিগ্রহ দেখানোর সামাজিক প্রভাব সম্বন্ধেও কি আমরা উদাসীন থাকবো? এই উদাসীনতার খাল কেটে আমরা যে বিপদ ডেকে আনছি নিশ্চিন্তে তাতে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মগুলি ভালো থাকবে তো আগামী দশক গুলিতে? আগামী শতকগুলিতে? বাংলার সমাজজীবনের ভবিষ্যৎ কিন্তু এই বিষয়গুলির উপরও নির্ভর করবে।

এইখানে আরও একটি বিষয়ে আমাদের দৃষ্টিপাত করা প্রয়োজন। সিনেমা দেখার প্রভাব আর সিরিয়াল দেখার প্রভাবের মধ্যে পার্থক্য আকাশ পাতাল। শিশু কিশোরদের মনের উপর একটি চলচিত্র ভালো হোক মন্দ হোক যে প্রভাব ফেলে, টিভি সিরিয়াল কিন্তু তার থেকে অনেক বেশি প্রভাব ফেলে থাকে। কারণ সিনেমা দেখা হয় মাঝে মধ্যে, আর সিরিয়াল দেখা হয় নিত্যদিনের অভ্যাসে। ফলে সেই দৈনন্দিন পরিসরে ভালোই হোক আর মন্দই হোক যে প্রভাবটি পরে সেটি কিন্তু অনেক গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী এবং সুদূর প্রসারী। আর এই কারণেই ক্ষতি হলে, টিভি সিরিয়ালের ক্ষতির ফলাফল হবে মারাত্মক। শিশুদের রোজকার ব্যবহার, তাদের ঝোঁক বায়না, কোন ঘটনার প্রতিক্রিয়া, খেলার সাথীদের সাথে আচরণ, স্কুলের পরীক্ষায় নম্বর তোলার প্রতিযোগিতায় সহপাঠীদের সম্বন্ধে মনোভাব ইত্যাদি নানান ভাবে তাদের উপর টিভি সিরিয়ালের প্রভাব লক্ষ্য করা যাবে। আর এই লক্ষ্মণগুলি দিনে দিনে নানা শাখা উপশাখায় পল্লবিত হয়ে বিকশিত হয়ে উঠতে থাকবে। গড়ে উঠতে থাকবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সাধারণ প্রকৃতি। যাকে পরবর্তীতে মানুষ জানবে বাঙালির চরিত্র হিসাবে। বাঙালির ধর্ম হিসাবে। তাই আজকের টিভি সিরিয়ালের কাল্পনিক কাহিনী অভিনেতা অভিনেত্রীদের অভিনয় পরবর্তী প্রজন্মের বাঙালির প্রকৃতি গঠনে এমনই সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে। ফেলবেই। যদি না সচেতন হয় আজকের বাঙালি। আজকের অভিভাবক। পিতা মাতা।

এইখানেই আরও একটি গভীর প্রশ্ন কার্যত দাঁড়িয়ে যায় আমাদের চিন্তা ভাবনা অনুভবের সামনাসামনি। বাংলা টিভি সিরিয়ালগুলির কাহিনীর মধ্যে দিয়ে কেন এই বিষক্রিয়ার প্রবাহ ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে? একটু ভালো করে লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে অধিকাংশ বাংলা টিভি চ্যানেলের মালিক অবাঙালি শিল্পপতিরা। আবার ঠিক টালিগঞ্জের ফিল্ম ইণ্ডাস্ট্রীর মতোই অধিকাংশ সিরিয়ালগুলির প্রযোজকরাও অবাঙালি পুঁজিপতি। একাটা বিভক্ত জাতির বুকের উপর বসে এই অবাঙালি পুঁজিই বাঙালির আবহমান সংস্কৃতি তছনছ করে দেওয়ার এক নীল নকশা অনুযায়ীই অগ্রসর হচ্ছে। শুধুই অতিরিক্ত মুনাফাই এদের একমাত্র লক্ষ্য নয়। সেই সাথে বাঙালির শিশুমনকে যদি প্রথম থেকেই বিকৃত করে দেওয়া যায়, তবে তার মত নিশ্চিত ক্ষতি আর কোনভাবেই করা সম্ভব নয় এত সহজে। তাই রোজকার সান্ধ্য বিনোদনের আড়ালে বাংলা ও বাঙালির ভবিষ্যৎকে বিকলাঙ্গ করে তোলার কাজ হয়ে চলেছে নিঃশব্দে কিন্তু নিশ্চিত ভবেই। আর তখনই প্রশ্ন জাগে, আমাদের বাঙালি কলাকুশলী অভিনেতা অভিনেত্রী চিত্রনাট্যকার নির্দেশকরা কি সব ধোয়া তুলসী পাতা? নাকি তারা এতই নির্বোধ যে অবাঙালি চ্যানেল কর্তৃপক্ষ থেকে সিরিয়াল প্রযোজকদের চক্রান্তে সামিল হয়ে গেলেন? এখানে দুটি কথা ভাবতে হবে। ফিল্ম ও টিভি ইণ্ডাস্ট্রির পেশার নিদারুণ অনিশ্চয়তার কথা। এবং তীব্র ও ভয়াবহ প্রতিযোগিতার কথা। এই পেশায় টিকে থাকতে গেলে নৈতিকতা আদর্শ জাতীয়তাবোধ ইত্যাদি গুণগুলি আঁকড়ে বসে থাকার মানে না খেতে পেয়ে আত্মহত্যার সামিল। সে আপনি নির্দেশনায় থাকুন কি অভিনয়ে থাকুন। চিত্রনাট্যই লিখুন কি ক্যামেরা চালান। আপনার ভুমিকা শুধু দম দেওয়া কলের পুতুলের মতো আপনার উপরে আরোপিত কাজটুকু এমন ভাবে উৎরে দেওয়া যাতে পরের দিনেও আপনার ডাক পড়ে ঠিক একই রকম কাজে। নয়তো আপনি ছিটকে গেলেন গ্রহণুপঞ্জের মতো শতটুকরো হয়ে। আর দ্বিতীয়ত এই গ্ল্যামার জগতের হাতছানির মোহ এমনই অমোঘ যে, সহজে কেউই এই দুর্নিবার আকর্ষণ এড়াতে পারেন না, যদি তাঁর সামান্যতমও প্রতিভা থাকে এই পেশায়। অর্থ খ্যাতি প্রতিপত্তির মোহ মানুষকে অন্ধ করে দেয়। দেবেই। তখন বাকি সব বিষয় হয়ে পড়ে নিতান্তই গৌণ। আপন আত্মাকেই বন্ধক দিয়ে দিতে হয় ইণ্ডাস্ট্রীর হাতে। তখন সত্যিই আর কিছু করার থাকে এই পেশার সাথে জড়িত বিখ্যাত মানুষগুলির। তারা তখন এক একজন পেশাদার ক্রীতদাসে পরিণত হয়ে যান। আর তাদের মাথার উপর ছড়ি ঘোরাতে থাকে পুঁজির আস্ফালন। শিল্পপতিদের গুপ্ত অভিসন্ধি। আর সেটাই যখন বিভক্ত বাঙালির ভবিষ্যৎকেই বিকলাঙ্গ করে দেওয়ার মতো গভীর ষড়য়ন্ত্র হয়, তখন তো কথাই নাই। বুঝতে হবে প্রতিপক্ষ অনেক আটঘাট বেঁধেই খেলতে নেমেছে। যে খেলার প্রথম বলি আজকের কোমলমতি শিশু কিশোর। আর তাদের নিস্পাপ শৈশব।

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত