রোহিঙ্গা সমস্যার নেপথ্যে


মাইলের পর মাইল জল কাদা ডিঙিয়ে প্রাণ হাতে করে নিরাপদ আশ্রয়ের জন্যে যারা ভিটে মাটি ছেড়ে রওনা দেয়, তারাই জানে জীবনের সঠিক মানে। লক্ষ লক্ষ নিরীহ মানুষ যার একটি বড়ো অংশ বৃদ্ধ ও শিশু এই ভাবে দিনের পর দিন পায়ে হেঁটে নিরাপদ আশ্রয়ের আশায় নিজের ভুখন্ড ছাড়তে বাধ্য হয় যখন তখন বুঝতে হবে কোথাও না কোথাও মানুষের লোভের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে উঠেছে। যে আগুনের লেলিহান শিখায় পুড়ে ছাড়খার সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার। আর সেই লোভের লেলিহান শিখা তখন হিসাব কষতে ব্যাস্ত কোন খাতে কত লাভের কড়ি জমা হওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি হলো এই সুযোগে। এবং তখনই দেখা দরকার এই সুযোগটা তৈরী করে কারা। সুযোগটার সদ্ব্যাবহার করে কারা বাড়িয়ে নেয় তাদের লাভের সাম্রাজ্য। মানুষের মৌলিক অধিকার ধর্ষিত হয় যাদের লোভের আগুনে। পৃথিবীর ইতিহাস বলছে, পৃথিবীটা বন্ধক থাকে তাদেরই স্বার্থের কাছে।


সিরিয়ার শরণার্থী সমস্যার পর এবার সমস্যা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিয়ে। যুদ্ধবিদ্ধস্ত সিরিয়ার মানুষ দেশ ছেড়েছিল যুদ্ধের থেকে বাঁচার জন্যে। রোহিঙ্গারা দেশ ছাড়ছে জাতিবিদ্বেষ থেকে বাঁচার জন্যে। অনেকেই এই জাতিবিদ্বেষের ইতিহাস নিয়ে চর্চা শুরু করে দিয়েছেন। কারা এই রোহিঙ্গারা। কি তাদের উৎপত্তির ইতিহাস। মায়ানমারের অন্যান্য জনগোষ্ঠীর সাথে তাদের সম্পর্ক ও দ্বন্দ্বই বা কেন? উঠে আসছে নানান রকম তথ্য ও তত্ব। তাদের মধ্যে পরস্পরবিরোধীতাও যে নাই, তাও নয়। কিন্তু মূল সত্য যাই হোক, মায়ানমারের রাখাইন প্রদেশে রোহিঙ্গা উপজাতির মানুষদের বসবাসের যে একটি দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে, সেটি অস্বীকার করার উপায় নাই কোনভাবেই। ফলে আজকের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর যে সেই দেশে বসবাস করার মৌলিক অধিকার রয়েছে, সেকথা অস্বীকার করার উপায়ও নাই কারুরই। মূল প্রশ্নটি এইখানেও। একথাও বিশ্বাস করা মুশকিল সমগ্র মায়ানমারের সকল নাগরিকরাই রোহিঙ্গাদের উৎপীরন করে দেশছাড়া করতে উঠে পড়ে লেগেছে। ইতিহাসে তেমনটা ঘটে না কোন কালেই। চিরকালই অল্প কয়েকজনের ষড়যন্ত্রে গুণ্ডা বদমায়েশ সন্ত্রাসীদের মদত দিয়েই জাতি দাঙ্গা লাগানো হয়। ঠিক যেমনটি লাগিয়েছিল ব্রিটিশ প্রশাসন তাদের ভারতীয় দালালদের সহায়তায় বাংলা ও পাঞ্জাবকে ভাগ করার জন্যে।

এখন দেখা দরকার মায়ানমারে উদ্ভুত সাম্প্রতিক এই পরিস্থিতির নেপথ্যে কারা। এটা ঠিক ঘটনার একেবারে সমসায়কিতায় সব প্রশ্নের সঠিক উত্তর পাওয়া সম্ভব নয়। অপেক্ষা করতে হয়। দেখতে হয় ঘটনার সরাসরি প্রভাবে দীর্ঘকালীন সুফল ভোগ করে কারা। তখনই সমগ্র চিত্রটি সঠিক ভাবে ধরা পড়ার সম্ভাবনা থাকে। বলা হচ্ছে রোহিঙ্গাদের সাথে মায়ানমারের বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্বের কথা। বলা হচ্ছে রোহিঙ্গা টেররিস্ট গোষ্ঠীর নাশকতামূলক কার্যকলাপই নাকি সাম্প্রতিক পরিস্থিতির জন্যে দায়ী। তারাই নাকি মায়ানমারের সুরক্ষা বাহিনীর উপর প্রথম আঘাত হেনেছিল।  বেশ ভালো কথা। তবে তো মায়ানমারের রাষ্ট্রশক্তিরই রোহিঙ্গাদের সেই সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে সে দেশের আইনের পথে শাস্তি প্রদানের কথা। যে কোন সন্ত্রাসী গোষ্ঠী, তা সে যে জনগোষ্ঠীরই অংশ হোক না কেন, সমগ্র সম্প্রদায়েরই প্রতিনিধি হয় না কখনোই। ঠিক যেমন তথাকথিত আলকায়দা বা আইএসআই কখনোই সমগ্র মুসলিম বিশ্বেরই প্রতিনিধি নয়। তাহলে একথাই ধরে নেওয়া উচিৎ, রোহিঙ্গাদের যে গোষ্ঠীই এইরকম সন্ত্রাসী কার্যকলাপ করুক না কেন, মায়ানমারের সরকারের দায়িত্ব সেই দলের বিরুদ্ধে আইনানুগ প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার। কিন্তু তার বদলে সমগ্র রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠীর বিরুদ্ধেই যদি সে দেশের এক অংশের মানুষ উৎপীড়ন নিপীড়ন অত্যাচার শুরু করে দেয়, তবে বুঝতে হবে সেটা সেই সরকারেরই ব্যর্থতা। কিংবা সরকারেরই ষড়যন্ত্র। কারণ এই ধরণের জাতিদাঙ্গা লাগে তখনই যখন হয় সরকার অপদার্থ হয়ে পড়ে, নয় সরকার নিজেই তলায় তলায় মদত দেয় দাঙ্গাকারীদের। এখন অনেকেই বলতে পারেন এক হাতে তো তালি বাজে না। দাঙ্গা লাগে দুই পক্ষের আগ্রাসন থেকে। না সেকথাটি সবসময় ঠিক নয়। অধিকাংশ সময়েই দাঙ্গা লাগায় একটি পক্ষই। অপর পক্ষ দুর্বল না হলে তারাও পাল্টা মার দিতে থাকবে। আর দূর্বল হলে ভিটে মাটি ছেড়ে পালাতে থাকবে। এটাই পৃথিবীর ইতিহাস। এখন যারাই পালাতে থাকবে, ধরে নিতে হবে তারা দাঙ্গার সাথে যুক্ত নয়। এটা নেহাতই সাধারণ জ্ঞানের বিষয়। তাই রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে সাম্প্রতিক এই জাতি দাঙ্গার জন্যে অভিযুক্ত করা যায় না কোনভাবেই।

কিন্তু যারা লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়ে নিরীহ মানুষদের হত্যা ধর্ষণ নির্যাতন করে দেশ ছাড়তে বাধ্য করলো, মায়ানমার সরকার তাদের বিরুদ্ধে কি পদক্ষেপ নিয়েছে? সেদেশের রাষ্ট্রযন্ত্র কি এর বিরুদ্ধে কোনরকম আইনানুগ প্রশাসনিক বন্দোবস্ত নিয়েছে? না কি ২০০২ এর গুজরাট দাঙ্গার প্রথম তিনদিন প্রশাসনকে নিষ্ক্রিয় করে রাখার মতোই সরকারী বন্দোবস্ত চালিয়ে আসছে ঘটনার সূত্রপাত থেকে। সন্দেহ হওয়ার কারণ একটাই। রাষ্ট্রশক্তি যদি দ্রুতই ব্যবস্থা নিতো তবে প্রায় তিন সপ্তাহ দরে ছয় সাত লক্ষ রোহিঙ্গাদের দেশ ছাড়তে হলো কেন? কেনই বা প্রায় হাজার খানেক রোহিঙ্গাকে প্রাণত্যাগ করতে হলো জাতিদাঙ্গায়? অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে গুজরাট দাঙ্গার মতোই সরকারী প্রশাসন নিষ্ক্রিয় থেকে দাঙ্গাকারীদের মদত দিয়েই চলেছে। বস্তুত রাষ্ট্রশক্তির মদত ও পোষকতা কিংবা সমর্থন ছাড়া আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় এইভাবে দাঙ্গা লাগানো যায় না। এরই সাথে এমন কথাও শোনা যাচ্ছে যে রাষ্ট্রশক্তি নিজেই তথাকথিত রোহিঙ্গা টেররিস্ট গোষ্ঠীকে দমন করতে ঝাঁপিয়ে পড়েছে সমগ্র রোহিঙ্গা উপজাতির উপরেই।

আর সেটাই যদি সত্য হয়, তবে বুঝতে হবে ষড়যন্ত্র অনেক গভীরে। তবে বুঝতে হবে রোহিঙ্গাদের মায়ানমার ছাড়তে বাধ্য করার জন্যেই অনেক দিনের পরিকল্পনার ফসল সাম্প্রতিক এই পরিস্থিতি। অর্থাৎ রোহিঙ্গাদের যে টেররিস্ট গোষ্ঠী মায়ানমারের প্রতিরক্ষা বাহিনীর উপর সন্ত্রাসী হামলা চালিয়েছিল বলে খবরে প্রকাশ, সেই গোষ্ঠীকে পর্দার পেছন থেকে পরিচালিত করেছে সেই দেশেরই রোহিঙ্গা বিরোধী গোষ্ঠী। সরকারী মদতেই হোক আর প্রশ্রয়েই হোক। নাহলে রোহিঙ্গাদের মেরে ধরে তাড়িয়ে মায়ানমার ছাড়তে বাধ্য করার এমন সুবর্ণ সুযোগ ও অজুহাত পাওয়াই বা যেত কি করে? অনেকটাই যেন নাইন-ইলেভেনের টুইনটাওয়ার ধ্বংসের মতো ব্যাপার। রাজনীতির খেলা এইভাবেই সকল নীতিকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে নিজের স্বার্থসিদ্ধির দিকে এগোতে থাকে। যার বলি হতে থাকে নিরীহ সাধারণ জনগণ। বলা হচ্ছে ইসলামিক টেররিস্ট গোষ্ঠীর প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত ছিল রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা। এখন তথাকথিক এই রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা কেন এইভাবে নিজের পায়ে নিজেই কুড়ুল মারবে, প্রশ্ন সেটাই। কারা তাদের বিভ্রান্ত করলো, কিভাবে করলো সেই সব তথ্যের মধ্যেই লুকিয়ে আছে মূল রহস্য।

রহস্য আরও অনেক জায়গায়। এত দিন ধরে চলতে থাকা এই পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যর্থ বা অনিচ্ছুক মায়ানমারের বর্তমান সরকারের উপর আন্তর্জাতিক চাপ তৈরী হচ্ছে না কেন এখনো? কেন রাষ্ট্রপুঞ্জ শিখণ্ডীর মতো একমেরু বিশ্বের প্রভুর নির্দেশের অপেক্ষায় বসে থাকবে? এক দিকে প্রযুক্তির প্রভূত উন্নতি নিয়ে মানুষের গর্বের শেষ নাই। একদিকে আধুনিক বিশ্ব রাজনীতির মানবাধিকার নিয়ে রাষ্ট্রগুলির স্বঘোষিত গর্বে কান পাতা দায়। আর একদিকে আদিম বিশ্বের মতো নিরীহ নিরস্ত নিপিড়ীত মানুষের পায়ে হাঁটা মিছিল চলেছে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে। এ কোন উন্নত বিশ্ব

উন্নত বিশ্বের শুরুই হয়েছিল খনিজ পদর্থের বহুল ব্যবহারের মধ্যে দিয়ে। নিত্য নতুন খনিজ পদার্থের আবিষ্কার ও তার বহুল ব্যবহারের প্রযুক্তি নির্মাণ এবং তার বাণিজ্যের হাত ধরেই উন্নত বিশ্বের তথাকথিত জয়যাত্রা। হ্যাঁ আজও সেই ধারাই বজায় রয়েছে। তাই মধ্য প্রাচ্যের তেলকে কেন্দ্র করেই আজও বিশ্বরাজনীতি আবর্তিত। খবরে প্রকাশ মায়ানমারের রাখাইন প্রদেশ ও তৎসন্নিহিত অঞ্চলে বিপুল পরিমাণে খনিজ শক্তির আধার পাওয়া গিয়েছে। সে দেশের বিগত সরকারের আমলে নানবিধ বাণিজ্যিক চুক্তিতে চীন সেই শক্তি উত্তলনে বহু কোটি টাকা লগ্নী করেছে। ইতিমধ্যেই মায়ানমারের মধ্যে দিয়ে চীন পর্যন্ত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহনের জন্যে একটি সুদীর্ঘ পাইপলাইনও বসিয়ে ফেলেছে চীন। বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন এই অঞ্চলে চীনের এই বাণিজ্যিক প্রতিপত্তিতে শঙ্কিত মার্কিন শিল্পমহল। মায়ানমারের এই সদ্য আবিষ্কৃত বিপুল খনিজ শক্তির উপর মার্কিন শিল্পমহলেরও যে শ্যেনদৃষ্ট পড়বে সে আর বিচিত্র কি। এখন এই অঞ্চলে চীনের প্রতিপত্তিকে প্রতিহত করার জন্যে তারা যে সর্বশক্তি দিয়ে ছলে বলে কৌশলে ঝাঁপিয়ে পড়বে সেতো বলাই বাহুল্য। তাই বিশেষজ্ঞদের এক অংশের ধারণা, মায়ানমারের দীর্ঘদিনের রোহিঙ্গা সমস্যায় ঘৃতাহূতি দিয়ে এই অঞ্চলে একটি ব্যাপক অরাজকতার সৃষ্টি করতে পারলে মার্কিনদের সব দিক দিয়েই ষোলকলা লাভ। একবার রাষ্ট্রপুঞ্জকে শিখণ্ডী করে মায়ানমারে মেরিন সৈন্য নামিয়ে দিতে পারলেই চীনকে শুধুই যে বাণিজ্যিক ভাবে প্রতিহত করা যাবে তাই নয়, সামরিক দিক দিয়েও এই গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলেটিকে সরাসরি মার্কিন সামরিক শক্তির নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা যাবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন মায়ানমারের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি সেই দিকে যাওয়ারই ইঙ্গিত দিচ্ছে। এখন মায়ানমারের বর্তমান সরকার কতটা স্বাধীন রয়েছে, আর কতটা মার্কিন স্বার্থের কাছে বিকিয়ে গিয়েছে, তার ওপরেই নির্ভর করছে সে দেশের ভবিষ্যৎ।

কথায় বলে রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয় আর উলুখাগড়ার প্রাণ যায়। তাই চীন ও আমেরিকার বাণিজ্য যুদ্ধের মধ্যে পড়ে সমগ্র রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীই আজ যে দেশ ছাড়তে বাধ্য হলো, সে দেশের অন্যান্য জনগোষ্ঠী কি কল্পনাও করতে পারছে, সামনে কি ভয়াবহ ভবিষ্যৎ অপেক্ষামান তাদের জন্যে। আজ যারা রোহিঙ্গাদের বাড়িঘরদোরে আগুন দিয়ে জমিজমা দখল করে নেওয়ার আনন্দে উল্লসিত, তাদের ভভিষ্যৎ যে কোন হাঁড়িকাঠে বলি হতে চলেছে সেবিষয়েও ওয়াকিবহাল নয় তারা। এমনটাই হয়। দেশের প্রশাসন বা রাষ্ট্রশক্তি যদি নিজেই দেশবাসীকে ঠকাতে শুরু করে তখন সাধারণ মানুষের সামনে বোধহয় আর কোন পথই খোলা থাকে না। যে আধুনিক বিশ্ব নিয়ে আমাদের নানাবিধ গর্ব, আজ রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সামনাসামনি হলে সেই গর্বের বেলুন সত্যই চুপসে যাওয়ারই কথা।

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত