আতঙ্কের নাম করোনা


আতঙ্কের নাম করোনা। অন্তরিন মানুষ। প্রত্যেকের চোখেই প্রত্যেকে যেন সাক্ষাৎ মৃত্যুদূত। কে যে কার মৃত্যুর কারণ হবে কেউ জানে না। তাই সকলেই আতঙ্কিত। প্রত্যেকেই প্রত্যেকের থেকে সভয়ে ন্যূনতম দূরত্ব বজায় রেখে চলার বিষয়ে স্বচেষ্ট। মানুষকে মানুষের থেকে দূরে রাখার বিষয়ে এমন সাফল্য নজিরবিহীন। সবচেয়ে হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রশক্তি। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক দেশেই রাষ্ট্রশক্তির বিরুদ্ধে স্বতঃস্ফূর্ত গণ আন্দোলন সংগঠিত হচ্ছিল। বস্তুত রাজনৈতিক শিবিরের পতাকা ছাড়া সংগঠিত গণ আন্দোলনের মত ভীতিজনক আর কোন কিছুই নয়। অন্তত ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত গোষ্ঠীর কাছে। তাই যে কোন রাষ্ট্রশক্তিই রাজনৈতিক দলের সংগঠিত আন্দোলনকে নিয়ে তেমন বিচলিত হয় না। নানান উপায়ে সেই আন্দোলন নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। কিন্তু জনতার স্বতঃস্ফূর্ত যোগদানে সংগঠিত গণ আন্দোলনকে প্রতিহত করা অনেক বেশি কঠিন। বিশেষত সংবিধান সম্মত গণতান্ত্রিক দেশগুলিতে। 


ভারতবর্ষে সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন ২০১৯ এর বিরুদ্ধে গর্জে ওঠা সাম্প্রতিক গণআন্দোলনের তীব্রতা রাষ্ট্রশক্তিকে যথেষ্টই বিচলিত করেছে। এতটাই বিচলিত করেছে যে, সরকারের প্রধান দুই মুখকে পরস্পর বিরোধী বয়ান দিতে দেখা গিয়েছে প্রকাশ্যে। যেখানে একজনের কথা সত্য ধরলে অন্যজনকে মিথ্যাবাদী বলে ধরে নিতে হয়, সাধারণ যুক্তিতেই। আবার সেই অসঙ্গতি চাপা দিতেও আসরে নেমে পরস্পর বিরোধী  একাধিক বয়ান দিতে দেখা গিয়েছে, শাসক শিবিরের একাধিক নেতৃত্বকে। এরপরেও রাষ্ট্রশক্তিকে দাঙ্গার অজুহাত দিয়ে আন্দোলনকে প্রশমিত করার সুযোগ খুঁজতে হয়েছে। যার জন্যে প্রাণ গিয়েছে অর্ধশতাধিক মানুষের। বুলেটবিদ্ধ শতাধিক আহতসহ দুই শতাধিক মানুষ আহত হয়েছে। নষ্ট হয়েছে প্রায় চব্বিশ হাজার কোটি টাকার সম্পত্তি। এমন বিপুল ক্ষয় ক্ষতিও যে কাজটি সহজে করতে পারেনি, সরকার পক্ষের আশা এবার করোনা আতঙ্ক সেই কাজটি করতে সক্ষম হবে। মানুষকে এই আতঙ্কে স্বেচ্ছা অন্তরিন করে রাখা যাবে। ফলে সরকারের হয়ে মিডিয়া সেই দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছে সাফল্যের সাথে। দুর্বার বেগে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে দিকে দিকে। রাষ্ট্রশক্তিও জনস্বার্থকে রক্ষাকবচ হিসাবে ঢাল করে একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছে করোনা মোকাবিলার। ফলে সাপও মরবে লাঠিও ভাঙ্গবে না। রাষ্ট্রশক্তির জনদরদী মুখকেও তুলে ধরা যাবে, আবার মানুষকেও আতঙ্কিত করে স্বেচ্ছা গৃহবন্দী করে রেখে উত্তাল গণ আন্দোলনের রাশ টানা যাবে। অন্তত প্রাথমিক ভাবে হলেও।

কিন্তু এতো গেল, ঝোপ বুঝে কোপ মারার গল্প। মিডিয়ার কাঁধে ভর করে আতঙ্ক যতই ছড়াক, বিশ্বব্যাপি করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ও তাতে মৃত্যুর পরিসংখ্যান যে লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েই চলেছে, সেটি তো আর মিথ্যা নয়। নয় কোন বিশেষ রাষ্ট্রশক্তির বিশেষ চক্রান্ত। সাম্প্রতিক কালে কোন একটি ভাইরাসের এমন দুর্বার গতি আর দেখা যায়নি। করোনা নিয়ে মানুষের আতঙ্কেরও তাই যথার্থ কারণ রয়েছে। মানুষের সেই আতঙ্ক থেকে কে কেমন ভাবে কোন স্বার্থের ফয়দা তুলতে স্বচেষ্ট হবে সেটি পরের বিষয়। প্রাথমিক ভাবে এই ভাইরাসের মোকাবিলা করতে পারাই আসল কথা। অসমর্থিত খবরে জানা যাচ্ছে কিউবায় নাকি এর টিকা বা ওষুধ আবিষ্কার করা সম্ভব হয়েছে। হলে তো ভালোই। কিন্তু সেই প্রতিষেধক বা ওষুধ বিশ্বব্যাপি সহজলোভ্য হবে কি উপায়ে জানা নেই।

অসমর্থিত আরও একটি চমকপ্রদ খবর পাওয়া গিয়েছে। করোনার উৎপত্তিস্থল চিনের কোন এক সরকারী আধিকারিকের বয়ানে নাকি জানা গিয়েছে, মার্কিনশক্তিই চিনে এই ভাইরাস ছড়িয়ে দিয়েছে। যদিও সরকারী ভাবে চিন সরকারের পক্ষ থেকে এখনো এমন কথা বলা হয় নি। বাজারে আরও গুজব, চিনের কমিউনিস্ট সরকার নিজেই নাকি মারাত্মক ভাইরাস তৈরীর প্রকল্প শুরু করেছিল। করোনা তারই ফলাফল। সম্ভবত অসাবধানতা বশত সেটি গবেষণাকেন্দ্র থেকে ছড়িয়ে পড়ে এই ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। অসমর্থিত এই সব খবরে একটি বিষয় সুস্পষ্ট, মানুষ এখন বিশ্বাস করতে শুরু করে দিয়েছে যে, মানুষ মারার কল হিসাবে কৃত্রিম উপায়ে ভাইরাসের উৎপাদনে বিশ্বের বড়ো বড়ো শক্তিগুলি বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করে থাকে। অবশ্যই এই বিশ্বাস যদি সত্য হয়, তাহলে এই বিষয়ে ইঙ্গমার্কিন শক্তিই যে পথপ্রদর্শক সে বিষয়ে সন্দেহ থাকার কথা নয়। কারণ এটোম বোম থেকে শুরু করে মানুষ মারার নানাবিধ ভয়াবহ কলের উদ্ভাবক হিসাবে এরাই বিশ্বে পথপ্রদর্শকের ভুমিকা নিয়ে এসেছে এযাবৎ কাল ব্যপি। অন্যান্য দেশ এদের অনুসরণ করার চেষ্টা করেই নিজের শক্তি বৃদ্ধি ও প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে আত্মরক্ষার উপায় বের করতে স্বচেষ্ট হয়। হবে। সেটাই স্বাভাবিক। বিশেষত যে দেশ এটোম বোমার মতো মানুষ মারার কল প্রয়োগ করার পরেও আজও লজ্জিত নয়, ক্ষমাপ্রার্থী নয়, সেই দেশের পক্ষে কৃত্রিম উপায়ে ভাইরাস উৎপাদন প্রকল্প হাতে নেওয়া বিচিত্র নয় আদৌ। কিন্তু পথপ্রদর্শক যেই হোক না কেন, অন্যান্য দেশও সেই একই পথ অনুসরণ করতে থাকলে সেটি এক ভয়ঙ্কর প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়ে উঠতে পারে। এটোম বোমের ক্ষেত্রেই যেটা হয়েছে।

ফলে কৃত্রিম উপায়ে ভাইরাস উৎপাদনের বিষয়ে চিনও যে হাত গুটিয়ে বসে থাকবে, বিষয়টি এমন নাও হতে পারে। শুধু চিন কেন রাশিয়া ফ্রান্স ইজরায়েল বৃটেন, সমরাস্ত্র উদ্ভাবনে প্রথম সারির এই দেশগুলিও নিশ্চয় এমন মারাত্মক প্রতিযোগিতায় সামিল তলায় তলায়। সরাসরি ভাবে মুখে সেই কথা কেউই স্বীকার করবে না। তাই ছড়িয়ে পড়া গুজবগুলিকে আজগুবি বলে উড়িয়ে দেওয়াও সহজ নয় আদৌ।

এখন ঘটনা যাই ঘটুক না কেন, আর যেভাবেই ঘটুক না কেন, দেখা যাচ্ছে বিশ্বজুড়ে বিশেষত ইউরোপ আমেরিকায় চিনের তৈরী দ্রব্যের উপর মানুষের মনে একটি ভীতির সঞ্চার শুরু হয়েছে। চিন থেকে আসা দ্রব্য মানেই যেন করোনা ফ্রী! এতে বিশ্ব বাজারে চিনের বদনাম হতে থাকলে চিনের রফতানী বাণিজ্য যে বিপুল পরিমাণ ক্ষতির সম্মুখীন হবে সে কথা বলাই বাহুল্য। অপর দিকে চিনের এই ঘোর বিপর্যয়ে, সে দেশে এমনিতেই নানান কলকারখানায় উৎপাদন ব্যহত হচ্ছে বিপুল ভাবে। যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিশ্ব বাজারে। বিশেষত আমেরিকায়, যেখানে দৈনন্দিন নিত্য প্রয়োজনীয় নানান জিনিসের বেশির ভাগটাই নির্ভর করে চিন থেকে আমদানির উপরে। ফলে চিনের কলকারখানায় উৎপাদন কমে গেলে আমেরিকায় অনেক জিনিসেরই হাহাকার পড়ে যাবে। আমেরিকায় জনমানসে এই উপলক্ষ্যে এমন প্রশ্নও উঠে পড়েছে যে, চিনের উপর এই পরিমাণ নির্ভরতা কমিয়ে নিজেদের স্বনির্ভর হয়ে উঠতে হবে বেশি করে। যাতে বেশির ভাগ দ্রব্যই আমেরিকায় প্রস্তুত করা যায়। করোনার এমনই মারাত্মক প্রভাব। ভাইরাস যে দেশেই উৎপন্ন করা হোক না কেন, এর সাথে বিশ্ব বাণিজ্যের ভারসাম্য জড়িত। সেই ভারসাম্যে টাল খেলে এক পক্ষ পথে বসলে, ফুলে ফেঁপে উঠবে অন্য পক্ষ। অন্তত প্রাথমিক ভাবে সেটাই অনুমান করা যায়।

ফলে করোনা যে, যে সে ভাইরাস নয় যে সেই বিষয়ে বোধহয় বিতর্ক থাকা উচিত নয়। এর প্রভাব বিশ্ব জনসংখ্যার উপরে পড়ুক না পড়ুক, মানুষের দৈনন্দিন জীবনে পড়তে বাধ্য। এখনই বিশ্ব অর্থনীতির বাজারে করোনা জনিত অনিশ্চয়তার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। বিশেষ করে ভারতের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক মন্দা দশার উপরে সেটি হবে মড়ার উপরে খাঁড়ার ঘা। করোনা আতঙ্ক রাষ্ট্রশক্তির পক্ষে সাময়িক ভাবে যে সুযোগ রূপে উপস্থিত, ভবিষ্যতে সেটিই যে রাষ্ট্রশক্তিগুলির পক্ষে দুর্যোগ স্বরূপ হয়ে উঠবে না, সে বিষয়ে নিশ্চিত করে বলা যায় না এখনই। কিন্তু করোনার মত মারাত্মক ভাইরাস যদি সত্যই কৃত্রিম উপায়ে উৎপাদিত হয়ে থাকে, তবে এই প্রবণতা মানুষের সভ্যতাকে ভয়াবহ ভভিষ্যতের দিকে ঠেলে দেবে, বলাই বাহুল্য। তখন কিন্তু পৃথিবীর কোন প্রান্তই সুরক্ষিত থাকবে না আর। মানুষের হাতেই মানুষ মারা যায় চিরকাল। কিন্তু এমনও সময় আসতে পারে মানুষের হাতে মারা যাওয়ার মতো মানুষই আর এই গ্রহে নেই। সেদিন মানুষের সভ্যতার পক্ষে শেষদিন হলেও, পৃথিবীর পক্ষে জন্মের প্রথম শুভক্ষণের মতোই নতুন দিনের ভোর হিসাবে দেখা দেবে। পৃথিবীর রক্ষা পাবে এক ভয়ঙ্কর ভাইরাসের হাত থেকে, যে ভাইরাসের নাম মানুষ।

১৫ই মার্চ ২০২০

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত