সংস্কৃতি অপসংস্কৃতি


অনেকেই কলকাতাকে বঙ্গসংস্কৃতির পীঠস্থান বলে থাকেন। আরও অনেকে সেকথা বিশ্বাস করেন একান্ত আন্তরিক ভাবেই। এবং কলকাতার সাংস্কৃতিক দিগন্তের দিকে উন্মুখ আগ্রহে চেয়ে থাকেন আরও অনেকেই। এদের অনেকের ভিতরেই সংস্কৃতির সেই পীঠস্থানকে অনুসরণ করার প্রবণতাও দেখা যায়। সম্প্রতি কলকাতার রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত বসন্তউৎসবে বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন ছাত্রীর খোলা পিঠে রবীন্দ্রসঙ্গীতের কথায় অশ্লীল শব্দের প্রয়োগ নিয়ে এঁরা সকলেই সাংস্কৃতিক অবক্ষয় নিয়ে আন্দোলিত হয়েছেন ঘরে বাইরে। অনেকেই সংশ্লিষ্ট ছাত্রছাত্রীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি প্রয়োগের দাবিতে মুখর। সন্দেহ নাই, রবীন্দ্রনাথের নামে গড়ে ওঠা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের হাতেই এই ভাবে রবীন্দ্রনাথকে ধর্ষিত হতে দেখলে সাধারণ রবীন্দ্র অনুরাগী মাত্রেই বিচলিত বোধ করবেন। করারই কথা। শুধু রবীন্দ্র অনুরাগী কেন, বঙ্গসংস্কৃতি প্রেমী যে কোন মানুষের ভিতরেই একটা বিরুদ্ধ প্রতিক্রিয়া হতে বাধ্য। হয়েওছে তাই। আবার সংশ্লিষ্ট ছাত্রছাত্রীদের কৃতকর্মকে কেউ কেউ নিছকই বয়সের ছেলেমানুষি বলে উড়িয়ে দিতেও চাইছেন। সমাজে এর থেকেও অনেক বড়ো ও গভীরতর সমস্যা রয়েছে। এমন ছোটখাটো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নিয়ে অধিক মাতামাতি করতেও অনেকে গররাজি।

একথা সত্যি এরকম ঘটনা যে সচারচর ঘটেই চলেছে, অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিকে নিয়ে বিকৃতরুচির মানসিকতায় অশ্লীলতার চর্চা, সেটাও পুরোপুরি সত্য নয়। কিন্তু একথাও সত্য, সমাজের সর্বত্র রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে সদর্থক চর্চার পরিসর বিস্তৃততর করতে না পারলে, এই ধরণের অপসংস্কৃতি কালক্রমে রবীন্দ্রনাথকেও অপ্রাসঙ্গিক করে তুলতে পারে বঙ্গসংস্কৃতিতে। অনেকে হয়তো এই কথায় আদৌ সায় দেবেন না। মনে করতে পারেন, রবীন্দ্র প্রতিভা এত ঠুনকো নয়, যে বঙ্গসংস্কৃতির দিগন্তে অশ্লীলতার চর্চায় তা কোনদিন অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যেতে পারে। তাদের এই কথা মনে করার সঙ্গত কারণও রয়েছে। আজকের আধুনিক বঙ্গসংস্কৃতি বা আরও নির্দিষ্ট করে বললে শিক্ষিত নাগরিক বঙ্গসংস্কৃতি, বিগত প্রায় একশ বছর ধরে রবীন্দ্র প্রতিভার ভিতের উপরেই দাঁড়িয়ে রয়েছে। সেই প্রেক্ষিতে অনেকেই মনে করেন এই সব ছোটখাটো বিষয় বঙ্গসংস্কৃতিতে রবীন্দ্র প্রভাবকে ম্লান করে দিতে পারবে না কোনদিন। কিন্তু বিষয়টি এত সরলীকরণ করে বিচার করলে ভুল হওয়ার সম্ভাবনাই সমধিক। বস্তুত আমরা এখনো রবীন্দ্রনাথের প্রয়াণের পরবর্তী প্রথম শতকেই আটকিয়ে আছি। এই সময় কালের কষ্ঠী পাথরে একেবারেই কিছু নয়। এবং সবচেয়ে বড়ো কথা, একজন প্রতিভাধর মনীষীর প্রভাব যত অমোঘই হোক না কেন, একটি জাতির সংস্কৃতি সেই মনীষী ও তাঁর প্রভাবের থেকেও অনেক বৃহৎ বিষয়। রবীন্দ্রনাথের থেকে অনেক বৃহৎ বিষয় বঙ্গসংস্কৃতি। কবি সেই সংস্কৃতির আধুনিক পর্বের এক যুগান্তকারী পুরোহিত। তার বেশি কিছু নন। তিনি তাঁর সারাজীবনের কর্ম ও সাধনায় বঙ্গসংস্কৃতিকে দুই হাতে পুষ্ট করে গিয়েছেন যেমন সত্য, তেমনই সত্য এই যে, বঙ্গসংস্কৃতি মানেই তা কিন্তু রাবীন্দ্রিক নয়। ফলে আমাদের ভাবতে হবে বুঝতে হবে সেই সত্যের বেদীতে দাঁড়িয়েই। তাই আজকের শিক্ষিত নাগরিক সমাজসংস্কৃতির দিগন্তে রবীন্দ্রনাথের প্রভাব যত অমোঘই হোক না কেন, সেই প্রভাবকে সযত্নে লালন করতে না পারলে, একদিন তা কালের গহ্বরে হারিয়ে যেতে দেরি নাও হতে পারে।

আবার একথার উদ্দেশ্য আদৌ এই নয় যে, রবীন্দ্রনাথকে দুই বেলা জপ করতে করতে পুজো করতে হবে প্রায় ঈশ্বরসাধনার মতো করে। না সেটি কোন কাজের কথা নয়। উল্টে বরং একথাই সত্য, যদি বাঙালি সেই পথই ধরে, তবে প্রথমেই অসম্মান করা হবে ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথ ও তাঁর সারা জীবনের কর্ম ও সাধনাকেই। এবং শেষে রবীন্দ্রনাথকেই উপড়িয়ে ফেলা হবে বঙ্গসংস্কৃতির আধুনিকতার ভিত থেকেই। অর্থাৎ এখনই যাঁরা গেল গেল রব তুলেছেন, আর যাঁরা ভাবছেন, এ আর এমন কি? এই দুই পথের বাইরেও আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ রয়েছে। আমাদের লক্ষ্য রাখতে হবে সেই পথের দিকেও।

রবীন্দ্রনাথের জীবদ্দশাতেই কবির আক্ষেপ ছিল, তাঁর পথ সর্বত্রগামী হয়ে উঠতে পারে নি বলে। অর্থাৎ জীবন ও সমাজের সর্বত্র তিনি নিজেই পৌঁছাতে পারেন নি। এই সত্য তিনিও জানতেন। বস্তুত কোন দেশেই কোন কালেই কোন মনীষীর পক্ষেই সর্বত্রগামী হয়ে ওঠা সম্ভব হয় না। কবির পক্ষেও হয় নি। কিন্তু কবির তাই নিয়ে একটা আক্ষেপও ছিল। এটাই একজন প্রকৃত শিল্পীর মহৎ পরিচয়। এই আক্ষেপটুকু। কিন্তু তিনি যে সমাজে জন্মেছেন। যে সমাজ ও তার সংস্কৃতিকে পুষ্টি যুগিয়ে গিয়েছেন আমৃত্যু জীবন সাধনার মধ্যে দিয়ে, সেই সমাজের একটি দায় থেকে যায়। দায় থেকে যায় পরবর্তী প্রজন্মের উত্তরাধিকারের পরম্পরায়। রবীন্দ্রনাথকে শুধুমাত্র শিক্ষিত শ্রেণীচেতনার পরিসরে আটকিয়ে না রাখার। সমাজের সকল স্তরের মানু্ষের চেতনাকে শিক্ষার শক্তিতে বলিয়ান করে তুলতে তুলতেই রবীন্দ্রনাথের জীবন সাধনার একটি মূল্যবান সত্যকে সমাজের বৃহত্তর অংশের মধ্যে প্রাণবন্ত করে তুলে দেওয়া যেত। সেটি হল, কবি চেয়েছিলেন বৃহত্তর সমাজ অর্থাৎ সমগ্র জাতিকে শিক্ষার আলোর বৃত্তে নিয়ে আসতে। যেটা করতে গেলে শিক্ষার অধিকার ও সুযোগকে সমাজের সর্বত্র পৌঁছিয়ে দিতে হয়। সম্পূর্ণ ব্যক্তি সাধনায় তাঁর জীবনের বেশিরভাগটাই সেই প্রয়াসে অতিবাহিত করে ছিলেন সীমাবদ্ধ সামর্থ্যের ভিতরেও। কিন্তু তারপর তাঁর সেই প্রয়াসকে পরবর্তী প্রজন্ম পরম্পরা আজও সার্থক করে উঠতে পারে নি। বা সত্য করে বললে বলতেই হয় করতে চায় নি। তাই আজও বঙ্গসংস্কৃতিতে সমাজের অধিকাংশ মানুষই প্রকৃত শিক্ষার সুযোগ ও অধিকার থেকে বঞ্চিত। রবীন্দ্রনাথ অনেক আগেই বুঝতে পেরেছিলেন, সমাজের সকল স্তরের মানুষের কাছে শিক্ষার অধিকার ও শিক্ষার সুযোগ পৌঁছিয়ে দিতে না পারলে, সমগ্র জাতিকে শিক্ষিত করে তোলা সম্ভব হবে না। আর যে কোন জাতির উন্নতি নির্ভর করে তার শিক্ষিত সমাজের ভিতের উপরেই। এই ভিতেই জাতির আপন সংস্কৃতি রূপ নিতে থাকে। ভিত যত বেশি সুদৃঢ় হবে জাতির সংস্কৃতি তত শক্তিশালী সমৃদ্ধশালী হয়ে ওঠার পথ খুঁজে পাবে। ভিত যত দুর্বল থাকবে সমৃদ্ধির সেই পথ তত অবরুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে। আর দিশাহারা জাতি তার সমাজের অলিন্দে নিলয়ে জন্ম দিতে থাকবে নানান ধরণের অপসংস্কৃতির।

আমরা বাঙালিরা এই সহজ সত্য আজও সোজা কথায় বুঝতে চাইনি। এমন নয় যে বুঝতে পারার ক্ষমতা নাই আমাদের। না বিষয়টি তাও নয়। এই সামন্য কথা অনুধাবনের মত বুদ্ধি ও মেধা বাঙালির আছে। কিন্তু বাঙালি বুঝতে চায় নি। সে নিজে শিক্ষিত হয়ে উঠতে চায়, অশিক্ষিতদের উপরে ছড়ি ঘোরাবার উদ্দেশ্য নিয়ে। ফলে শিক্ষিত সমাজ, তার আপন গোষ্ঠী বা শ্রেণীচেতনার স্বার্থেই শিক্ষার অধিকার ও সুযোগকে প্রতিটি দেশবাসীর কাছে পৌঁছিয়ে দেওয়ার পথ অবরুদ্ধ করে দাঁড়িয়ে রয়েছে। এই পথরোধ করে দাঁড়িয়ে থাকাটাই বাংলার রাজনীতি। ধর্ম ও সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ যে রাজনীতি চর্চার প্রধান হাতিয়ার। সেই ধর্ম ও সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ চর্চার রাজনীতিতে বাঙালি অনেক বেশি সিদ্ধহস্ত এবং দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। কারণ এই দুটি বিষবৃক্ষের লালন পালনেই বৃহত্তর জনসমাজকে শিক্ষার অধিকার ও সুযোগ থেকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম বঞ্চিত করে রাখা সহজ হয়। বাঙালির এই ঐতিহ্য নতুন নয়। শত শত বছরের এই ঐতিহ্য আমরা উত্তরাধিকার সূত্রে বহন করে চলেছি। এখানে যাঁদের মনে হচ্ছে; কেন, আজকে এত এত সরকারী স্কুল। এত এত পাঠক্রম। নানান ধরণের সরকারী প্রকল্প। বৃহত্তর সমাজকে শিক্ষার আলোর বৃত্তে নিয়ে আসার উদ্দেশেই তো! না। আদৌ নয়। আমাদের শিক্ষার এই পরিকাঠামো আদৌ দেশের অধিকাংশ মানুষকে শিক্ষিত করে তুলতে নয়। এই পরিকাঠামো মানুষের চোখে ধুলো দিয়ে মানুষকে অশিক্ষিত অর্ধ শিক্ষিত এবং ক্ষেত্র বিশেষে কু শিক্ষিত করে রাখার উদ্দেশেই। দেশ ও জাতি গড়ার জন্য শিক্ষার যে পরিকাঠামো গড়ে তোলার দরকার, আমরা অত্যন্ত সচেতন ভাবেই সেটি করি নি। এবং করবও না সহজে। অন্তত যতদিন না প্রকৃত সমাজ বিপ্লব হচ্ছে। যার সুদূর প্রসারী কোন সম্ভাবনাও আমাদের সমাজে নাই। ছিলও না কোনদিন। তাই আমাদের শিক্ষার পরিকাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে সুযোগ সন্ধানী দুর্নীতিগ্রস্ত আসাধু নাগরিক গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়েই। আর সেই কারণেই নোট মুখস্থ করে পরীক্ষায় বেশি নম্বর তোলাকেই আমাদের সমাজে শিক্ষার পরিচয় ও রাজপথ বলে চিহ্নিত করা হয়ে থাকে। সমাজে তাই মুখস্থবিদ পণ্ডিতদের এত বেশি কদর। প্রকৃত শিক্ষিত জ্ঞানীদের কদর নাই।

অর্থাৎ এই ভাবে সম্পূর্ণ সচেতন বুদ্ধিতে সুচারু পরিকল্পনায় সমাজকে সর্বতো ভাবে খোঁড়া করে রাখার যে সংস্কৃতি কাঁটাতারের উভয় পারের দুই বাঙলায় চলে আসছে, সেটাই অপসংস্কৃতি। এই অপসংস্কৃতির চর্চা চলছে একেবারে সমাজের উপর তলা থেকে। এই অপসংস্কৃতির প্রভাব এমনই ভয়াবহ যে আজ আমরা অধিকাংশ মানুষই এই অপসংস্কৃতির বিষয়ে সম্পূর্ণ উদাসীন। এবং এই উদাসীনতাও আর একটি অপসংস্কৃতি। যে সমাজে অপসংস্কৃতির চেহাড়া এমন ভয়াবহ রকমের কদর্য এবং সর্বব্যাপ্ত, সেখানে কার খোলা পিঠে রবীন্দ্রনাথের কোন গানে কোন অশ্লীল শব্দ বসানো হলো সেটি আদৌ কোন বড় বিষয় নয়। এর থেকে অনেক বেশি অশ্লীল একটি জাতির শিশু কিশোর তরুণদেরকে নোট মুখস্থ করিয়ে বেশি নম্বর তোলানোর কুশিক্ষার পরিকাঠামোয় আটকিয়ে ফেলা। অনের বেশি অশ্লীল, বৃহত্তর জনসমাজের উপরে ছড়ি ঘোরানোর উদ্দেশে তাদেকে ধর্ম ও সাম্প্রদায়িকতার বিষপ্রয়োগে আধমরা করে রেখে দেওয়া। অনেক বেশি অশ্লীল শিক্ষার পরিকাঠামোকে কিছু সুযোগসন্ধনী স্বার্থপর দুর্নীতিগ্রস্ত মানুষ তৈরীর কারখানায় পরিণত করে তোলা। যে সমাজ বংশ পরম্পরায় এই সব অশ্লীলতা মেনে নিয়ে মহানন্দে দিন কাটায়, সেই সমাজের পক্ষে কার পিঠে রবীন্দ্রনাথের কোন গানে কটা অশ্লীল শব্দ বসানো হলো, তার বিচার করা সাজে না। এর থেকে বড়ো প্রবঞ্চনা আর কি হতে পারে?

১৯শে মার্চ ২০২০

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত