এমন বন্ধু আর কে আছে তোমার মতো করোনা


আর যদি না বাঁচি, ধন্যবাদ দিতে হবে দেশের সরকারকে। যে সরকার করোনার ভাইরাসকে নিমন্ত্রণ করে দেশে নিয়ে এসেছে। সারা বিশ্বে যখন করোনা ছড়িয়ে পড়ছিল, তখনই যদি দেশের সব সীমানা বন্ধ করে, প্রতিটি এয়ারপোর্ট, নৌ ও স্থল বন্দর অন্তত একমাস বন্ধ করে দেওয়া হতো তাহলে কিন্তু করোনা যাত্রীবাহী হয়ে দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে পারতো না। এখন অনেক বিশেষজ্ঞরা সোশ্যাল আইসোলেশনের বিধান দিয়ে বলছেন অন্তত চৌদ্দ দিন ভাইরাসের সংক্রমণকে ঠেকিয়ে রাখতে পারলে তবেই এই মহামারী প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে। অথচ এই সোজা কথাটি তারা কেউ দেশের নির্বাচিত সরকারকে বলেন নি সময় মতো। বা বললেও সরকার শোনার দরকার বোধ করে নি। করলে গোটা দেশটাকেই বিশ্ব থেকে আইসোলেট করে রাখা যেত। আজকের আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার যুগে আস্ত একটা দেশকে বিশ্ব থেকে আইসোলেট করে ফেলা কোন কঠিন কাজ নয়। সময় মত সেই কাজটা করলেই, দেশের অভ্যন্তরীন জনজীবন ব্যহত না করেও বিপর্যস্ত না করেও করোনার আক্রমণকে প্রতিহত করা যেত হয়তো। কথায় বলে সময়ের এক ফোঁড়! না সে কথা দেশের সরকারের জানার কথা নয়। তাই সরকার সেই পথে হাঁটেনি। যে পথে হাঁটতে গেলে প্রতিপদেই বিপদের সমূহ সম্ভাবনা, সরকার হাঁটে সেই পথেই। ইতি মধ্যেই বিদেশ প্রত্যাগত হাজার হাজার মানুষ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছেন। যাঁদের ভিতর বেশ অনেকেই করোনা ক্যারি করে এনেছেন বিশ্বের নানান দেশ থেকে। আমাদের দেশে চিরকালই ইমপোর্টেড জিনিসের কদর বেশি। তাই হয়তো সরকার করোনা ক্যারিয়ারদের প্রতি এত সদয়!


আর আজকে সরকার সেই ইমপোর্টেড করোনার আতঙ্কেই সারা দেশকে মুড়ে ফেলতে চাইছে। তার পিছনে রাজনৈতিক অভিসন্ধি যাই থাকুক না কেন, আপাতত সরকার সারা দেশকে এক ছাতার তলায় নিয়ে আসতে বদ্ধ পরিকর। সকলকে করোনার আতঙ্কে গৃহবন্দী করে করোনার প্রকোপ ঠেকানো যাবে কিনা ঠিক নাই, তবে প্রথম বিশ্বের দেশগুলির অবস্থা পর্যবেক্ষণ করলে বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়, এদেশেও একই পর্যায়ের সংক্রমণ শুরু হয়ে গেলে, মহামারীর প্রকোপ ও ব্যাপ্তি সব বিশ্ব রেকর্ডকেই ছাপিয়ে যেতে পারে। যে দেশে উপযুক্ত চিকিৎসার পরিকাঠামো আজকেও এত অপ্রতুল। শুধুমাত্র ধনীদেরই আয়ত্তাধীন। এবং সাধারণ মানুষের আয়ত্তাধীন ন্যূনতম চিকিৎসার পরিকাঠামোও দেশের সর্বত্র সহজলোভ্য নয়  সেই দেশে কোটি কোটি মানুষ যে বিনা চিকিৎসায় ঘরে ঘরে মড়ে পড়ে থাকবে সেটা খুব একটা কষ্টকল্পনার বিষয় নয় কিন্তু। ভাবতে অবাক লাগে শাসন ক্ষমতার দায়িত্বপ্রাপ্ত একটা সরকার কি করে কোন কারণে এই সব জেনে বুঝেও করোনা ইমপোর্ট করে নিয়ে আসলো? তবে কি ধরে নিতে হবে, দেশজুড়ে একটা মহামারী বেঁধে গেলেও সরকারের কিছু এসে যায় না? নাকি এই সুযোগে দেশের লোক সংখ্যা কিছুটা কমিয়ে ফেলতে পারলেই সরকারের বেশি সুবিধে?

এই অবস্থার ভিতরে আরও একটি বিষয় লক্ষ্য করার। প্রথম বিশ্বের দেশগুলির সরকার যেভাবে জনগণের দৈনন্দিন জীবনের সুরক্ষায় আপৎকালীন বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করছে, আমাদের দেশের সরকারের সেই বিষয়ে কোন পরিকল্পনা আছে কিনা, সেকথা জনগণের এখনো জানা নাই। সরকারের চলন বলন দেখে একটা কথাই স্পষ্ট, চাচা আপন প্রাণ বাঁচা। যে যেভাবে নিজেকে বাঁচাতে পারবে, সেটাই সরকার তার সাফল্য বলে প্রচার করতে পারবে। আর সেই কারণেই জনগণকে নানান ভাবে আতঙ্কিত করে সোশ্যাল আইসোলেশনের উপদেশ দেওয়া হচ্ছে ঢালাও করে। অর্থটা বেশ পরিষ্কার। মহামারী শুরু হয়ে গেলে সরকারের হাতে, দেওয়ার মতো অজুহাতের কোন অভাব থাকবে না। যার প্রথম কথাই হবে, জনতা সরকারের কথা মতো সোশ্যাল আইসোলেশনে থাকনেনি বলেই এই বিপর্যয়.ইত্যাদি ইত্যাদি।

অনেকেই মনে করছেন, এমন একটা ভয়ঙ্কর ভাইরাসের বিরুদ্ধে সরকারই বা এত অল্প সময়ের ভিতর কি করবে? না। সময় অল্প নয়। প্রথম বিশ্বের দেশগুলির ক্ষেত্রে সেকথা যতটা সত্য, আমাদের মতো দেশের ক্ষেত্রে সেটা নয়। আমরা অনেকটা সময় নাকে তেল দিয়ে ঘুমাচ্ছিলাম। না ঘুমালে চোখের সামনে প্রথম বিশ্বের অপেক্ষাকৃত কম লোকসংখ্যার উন্নত চিকিৎসা পরিকাঠামো যুক্ত দেশগুলিতে এই মহামারীর প্রবেশের পদ্ধতি দেখেই সাবধান হয়ে যেতে পারতাম। এবং এমন ভয়াবহ মারণ রোগের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে সক্ষম হতাম। হাট করে দরজা খুলে রেখে ঘরে ডাকত ঢুকিয়ে এখন জিনিস পত্তরে তালাচাবি দেওয়ার জন্য তালাচাবি খুঁজে বেড়াচ্ছি। এটাই আমাদের জাতীয় প্রকৃতি।

অনেকে মনে করছেন, গতস্য শোচনা নাস্তি, এখন কি কর্তব্য সেই বিষয়ে সরকার যা যা বলছে, সেটাই চোখকান বুঁজে মেনে চলাই অধিকতর বিবেচনার কাজ। তাঁরা ভুলে যাচ্ছেন সরকার সোজা কাজটা সহজে করতে পারতো, সেটি না করে এখন নানান রকম উপদেশ দিয়ে বেড়াচ্ছে। আসলে সরকারের না আছে সদিচ্ছা না আছে সামর্থ্য। তাই সে কালক্ষেপ করে জনগণের মন ব্যাস্ত রাখছে মাত্র। এবং ঠিক এই সময়েই যদি সত্যই করোনা এদেশে মহামারী হয়ে দেখা দেয় তবে তো কথাই নাই। কিন্তু যদি অবস্থা ততটা ভয়াবহ পর্যায় নাও যায়, তবু করোনা আতঙ্করে চাষ করে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্তর থেকে শুরু করে দরকারী ওষুধপত্রের কৃত্রিম অভাব সৃষ্টি করে সরকারের গুডবুকে থাকা একদল- ঠিক মজুতদারীর পথে অতিরিক্ত মুনাফাবাজি করে নেবে। তাদের পক্ষে এটাই পৌষমাস। ফলে করোনায় বেঁচে গেলেও দেশবাসীর কিন্তু মুনাফাবাজদের হাত থেকে বাঁচা সত্যিই মুশকিল।

না এতেও যে শেষরক্ষা হবে তাও নয়। ধরা যাক করোনা গ্রীষ্মপ্রধান দেশে তেমন দাঁত ফোটাতে পারলো না। নিছক তাপমাত্রায় অসহযোগিতায়। তখন আবার ধর্মের ঠিকাদারদের তো আরও পোয়াবারো। ঈশ্বর আল্লার সাথে একেবারে হটলাইনে যোগাযোগ করে দেশবাসীকে বাঁচানো গিয়েছে বলে চারিদিকে ঢোল বাজানো শুরু হয়ে যাবে। দেশকে আরও বেশি করে ধর্মীয় উন্মাদনায় মুড়ে ফেলতে অনেক বেশি সুবিধে হবে। আর ধর্মের ঠিকাদারদের অর্থ ভাণ্ডার উপচিয়ে উঠবে। জনগণকে বেকুব বানিয়ে আরও বেশিদিন রাজনীতি করে দেশের ক্ষমতায় বসে থাকা সম্ভব হবে।

অন্যদিকে দেশের উদ্ভুত রাজনৈতিক অস্থিরতায়, সরকারের নানান জনবিরোধী নীতিমালার বিরুদ্ধে গর্জে ওঠা দেশবাসীর বৃহত অংশকেই করোনার আতঙ্কে আটকিয়ে ফেলতে পারলেই কেল্লাফতে। যদি মহামারী নাও ঘটে, তবে এক ধাক্কায় সরকার বিরোধীদের কয়েক কদম পিছিয়ে দেওয়া যাবে এই সুযোগে। ফলে করোনার মতো এমন বন্ধু সরকারের আর কে আছে?

এরপরেও যদি আপনি ভাবতে থাকেন, এদেশে করোনা মহামারীর রূপ ধরলে সে দায় তো সরকারের উপরেই বর্তাবে, তবে আপনি সত্যই আবোধ শিশু রয়ে গিয়েছেন আজো। না, যে দেশে অর্থনৈতিক শোষণ আর সামাজিক নির্যাতনকে মানুষ বিধির বিধান বলেই মানতে অভ্যস্থ, সেই দেশে করোনা কাণ্ডেও সরকারের অপদার্থতা প্রমাণ করা যাবে না। মহামারী না ঘটলে সেটি সরকারের সাফল্যের জয়ঢাকে বাজনা বাজাবে। আর মহামারী ঘটলে সেটি দেশবাসীর বিধির বিধান বলেই প্রচারিত হতে থাকবে। ফলে সরকার দুই দিক দিয়েই নিশ্চিন্ত। বরং অনেক সমস্যার উপরে আপাতত মেড ইন চায়না করোনার বেডকভার দিয়ে ঢাকা দিয়ে সরকার নিশ্চিন্ত। সব দায় করোনার। সব দায় চীনের। সব দায় অসাবধানি জনগণের। সরকারের তরফ থেকে উপদেশ বিলানোর বিষয়ে কোন ঘাটতি তো আর কেউ দেখাতে পারবে না।

২১শে মার্চ ২০২০

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত