ফলস ন্যারেটিভ ও সাম্প্রতিক সময়


ইংলিশে একটি কথা খুবই প্রচলিত। ফলস ন্যারেটিভ। রাজনীতিতে, যুদ্ধে এবং বাণিজ্যে এইটির বহুল ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। যে কোন গোষ্ঠী বা শক্তি যখন এই ফলস ন্যারেটিভের প্রচারের উপরে সর্বাত্মক জোর দেয়, তখন বুঝতে হবে তাদের সামনে বিশেষ কোন শর্টটার্ম লক্ষ্য রয়েছে। কেননা যেকোন উপায়ে কার্যসিদ্ধির বিষয়ে ফলস ন্যারেটিভের জুড়ি মেলা ভার। ধরা যাক হেল্থ ড্রিঙ্কের বিজ্ঞাপনগুলি। যেগুলি না খেলে নাকি শিশু কিশোরদের মস্তিষ্কের বিকাশ ও শারীরীক বৃদ্ধি ব্যহত হতে পারে। সেই বিখ্যাত ডায়লোগ। দেখ আমি বাড়ছি মামি। হাতে ধরা মায়ের গুলে দেওয়া হেল্থ ড্রিঙ্ক খেয়েই ঘরে ঘরে শিশু কিশোররা বড়ো হচ্ছে আর কি। এবং ঘরে ঘরে অভিভাবকদের এই যে বিশ্বাস, বিশেষ প্রতিষ্ঠানের বিশেষ হেল্থড্রিঙ্ক নিয়মিত খাওয়াতে পারলেই ছেলে মেয়েদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও বুদ্ধির বিকাশ ত্বরান্বিত হবে। এই ফলস ন্যারেটিভের সফল প্রয়োগের উপরেই প্রতিষ্ঠানের শ্রীবৃদ্ধি ও আর্থিক ক্ষমতার বিকাশ নির্ভর করে।

বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মতোই রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠী থেকে শুরু করে রাষ্ট্রযন্ত্র শাসক সৈন্য বাহিনী প্রভৃতি সকলেই এই ফলস ন্যারেটিভের উপরে খুব বেশি করে নির্ভরশীল। বর্তমান শতকের শুরুতেই ফলস ন্যারেটিভের যুগান্তকারী শক্তির নমুনা দেখতে পেয়েছিলাম আমরা। মার্কিন মুলুকে টুইন টাওয়ার ধ্বংসের ঘটনায়। গোটা বিশ্বকে কেমন বেকুব বানিয়ে রেখে মাখনের মধ্যে ছুরি চালানোর মতো মসৃণ ভাবে মধ্য প্রাচ্যের তেল নিজেদের কব্জায় নিয়ে এসে আবিশ্ব সামরিক অস্ত্রের বাণিজ্যে একাধিপত্য বিস্তার করে নিল ইঙ্গমার্কিন গোষ্ঠী। এবং তারাই বর্তমানে আবার কোভিড ১৯কে চীনা ভাইরাস তকমা দিয়ে আর একটি ফলস ন্যারেটিভ প্রতিষ্ঠিত করে দিচ্ছে দুই বেলা। ফলস ন্যারেটিভ প্রতিষ্ঠায় মিডিয়ার বিশেষ বাহাদুরী থাকে। পাশ্চাত্য মিডিয়া এই বিষয়ে তুলনাহীন উৎকর্ষতার অধিকারী। এবং তাদের সাফল্যের হার প্রায় একশ শতাংশ। একমাত্র সত্তর দশকে ভিয়েতনামেই যেটুকু হোঁচট খেতে হয়েছিল। তারপর থেকে তাদের অশ্বমেধ ঘোড়ার দৌড় সর্বাত্মক ভাবে সফল।  বর্তমান যুগে টিভি এবং স্যোশাল সাইটের কল্যাণে ফলস ন্যারেটিভ প্রতিষ্ঠা করা ও তার সর্বাত্মক প্রচার আরও বেশি সহজ হয়ে উঠেছে। এবং মানুষ, সাধারণ মানুষ নিজের অজান্তেই ফলস ন্যারেটিভের এই প্রচারে বিপুল ভাবে সহায়ক হয়ে উঠছে। একটা লাইক, একটা শেয়ার। এক দুই সেকেন্ডের বিষয়। কিন্তু বিষের প্রতিক্রিয়া ও তার সংক্রমণ দুর্বার গতিতে ছুটতে থাকে সর্বত্র।

সম্প্রতি এই রকমই একটি ফলস ন্যারেটিভ অত্যন্ত সাফল্যের সাথে সারা ভারতে সত্য করে তোলা হয়েছে। ১৩ই মার্চ ২০২০’তে দিল্লীর নিজামুদ্দিন থেকেই ভারতে করোনা ছড়ানোর গল্পটি ভারতবর্ষের সংখ্যাগুরু সম্প্রদায় অত্যন্ত সমাদরে বরণ করে নিয়েছে। এই ফলস ন্যারেটিভের সাথেই পশ্চিমবঙ্গের আগামী বছরের বিধানসভা নির্বাচনে রাজ্যে ক্ষমতা দখলের লক্ষ্যকে পাখির চোখ করে আরও একটি ফলস ন্যারেটিভকে প্রতিষ্ঠা করার কাজ শুরু হয়ে গিয়েছে। রাজ্যের সংখ্যাগুরু সম্প্রদায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের হাতে রাজ্যেই আর নিরাপদ নয়। এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায় নাকি এতই দ্রুতহারে বংশবৃদ্ধি করে ফেলছে যে, সেদিন আর বেশি দূরে নাই, যেদিন পশ্চিমবঙ্গ পশ্চিম বাংলাদেশ হয়ে যাবে। ফলে সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়কে বাঁচতে হলে ভোট দিতে হবে বিশেষ একটি চিহ্নেই। এইখানেই ফলস ন্যারেটিভের মূল গুরুত্ব। কিন্তু তাতেও ফলস ন্যারেটিভের প্রবক্তাদের রাতের ঘুম নিশ্চিন্তের হচ্ছে না। কেননা যে কোন ফলস ন্যারেটিভকে নিরঙ্কুশ ভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে কোন না কোন ব্যাকআপের ব্যবস্থা করে রাখতে হয়। বিশ্বব্যাপী ইসলামোফবিয়া ছড়ানোর জন্য যেমন ধ্বংস করতে হয়েছিল টুইন টাওয়ার। তেমনই কিছু।

রাজ্যের আগামী বছরের বিধানসভা নির্বাচনকে মাথায় রেখে সেই ব্যাকআপের ব্যবস্থা করা শুরু হয়ে গেল সম্প্রতি। রাজ্যে সংখ্যাগুরু সম্প্রদায় আর নিরাপদ নয়। এই ফলস ন্যারেটিভটা তখনই দৃঢ় ভিত্তির উপরে প্রতিষ্ঠিত হবে যখন রাজ্যের যেখানে সেখানে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার আঁচ ছড়াতে শুরু করবে। সেই পরিকল্পনারই  সলতে পাকানোর কাজ শুরু হয়ে গেল এই সপ্তাহতে। হুগলীর তেলেনিপাড়ার ঘটনায়। সংবাদসূত্রে প্রকাশ, তেলেনিপাড়ায় সংখ্যালঘু বস্তি এলাকায় কয়েক জনের করোনা হয়েছে রটিয়ে দিয়ে গোটা সংখ্যলঘু সম্প্রদায়ের কাউকে দেখলেই করোনা নামে ডাকা শুরু হয়ে যায়। এবং এই নিয়েই একটি অসন্তোষের জন্ম হতে থাকে দুই সম্প্রদায়ের ভিতর। যার সরাসরি প্রভাবে অঞ্চলের একটি পাবলিক টয়লেট ব্যাবহার করা নিয়ে দুই সম্প্রদায়ের ভিতর পারস্পরিক বাদানুবাদ ঘটে স্বাভাবিক ভাবেই। পুলিশের মধ্যস্থতায় বিষয়টি অল্পের উপরে মিটেও যায়। কিন্তু তারপর সংবাদ সূত্রে যেমনটা জানা যাচ্ছে, হুগলী নদীর পূর্ব পার থেকে নৌকাযোগে এক দঙ্গল দুস্কৃতী তেলেনিপাড়ায় ঢোকে। ১২ই মে ভর দুপুরে তারা মুসলিম বস্তি এলাকায় চড়াও হয়। এবং স্থানীয় কিছু দুষ্কৃতীর সাহায্য নিয়ে বেছে বেছে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বাড়ি বাড়ি ঢুকে তাণ্ডবলীলা চালায়। লুঠপাঠ অগ্নিসংযোগ কিছুই বাদ যায় না।  পাশাপাশি দুই সম্প্রদায়ের দোকান থাকলেও শুধুমাত্র সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের দোকানেই লুঠপাট চালিয়ে অগ্নিসংযোগ করা হয়। কোথাও কোথাও বাড়ির উপর থেকে পেট্রলবোমা ছোঁড়া হয়। অত্যন্ত ঘিঞ্জি বস্তি এলাকা হওয়ায় পেট্রোল বোমার আঘাতে কোন কোন বাড়ির রান্নার গ্যাস সিলিণ্ডার ফেটে পাশের অন্য সম্প্রদায়ের বাড়িও কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সংবাদ সূত্রে প্রাপ্ত ছবিগুলি ভয়াবহ তাণ্ডবের নিদর্শন। বাড়িঘর দোকানপাট গাড়ি ভেঙ্গে তছনছ। অগ্নিদগ্ধ হয়ে দগদগে পোড়া ক্ষত নিয়ে পড়ে রয়েছে। হতাহতের সংখ্যা এখনো জানা যায় নি। কিন্তু সম্পত্তির ক্ষতি প্রায় সর্বাত্মক।

তেলেনিপাড়ার ঘটনা প্রমাণ করে, রাজ্য সরকারের সার্বিক অপদার্থতার। সার্বিক অপদার্থতার কথা এই কারণেই বলতে হচ্ছে, এই যে ফলস ন্যারেটিভের প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা, রাজ্য সরকার এই বিষয়ে অভিহিত নয়, এমনটা তো হতে পারে না। বিশেষ করে গোটা রাজ্য যখন লকডাউনে। তখন রাজ্য সরকারের নাকের ডগায় এমন বীভৎস তাণ্ডবলীলা চালিয়ে যাওয়াও তো সহজ কথা নয়। সংখ্যালঘুদের বড়িঘর দোকানপাট জ্বালিয়ে লুঠপাটের ঘটনার আগে থেকেই যখন সেখানে দুই সম্প্রদায়ের ভিতর একটি অসন্তোষের পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল, তখন অঞ্চলে আরও বেশি করে পুলিশবাহিনী মোতায়ন করা উচিৎ ছিল নিশ্চয়। সরকার সেটি করলে দুষ্কৃতী পাঠিয়ে এমন সহজে কাজ হাসিল করে যাওয়াও সহজ ছিল না। ফলে সরকারে অপদার্থতা ঢাকার কোন উপায় নাই এই ব্যাপারে।

সরকার তেলেনিপাড়ার ঘটনাটিকে প্রচারের আওতায় নিয়ে আসতে চাইছে না। সরকার মনে করছে, এইসব ঘটনার খবর যত ছড়াবে, অনুরূপ ঘটনার সংখ্যা ততই বৃদ্ধি পাবে। তাই মুখ্য সংবাদ শিরোনামে তেলেনিপাড়া এখনো ব্রাত্য। কিন্তু সরকার পরিচালনার দায়িত্ব যাঁদের হাতে, তাঁদের জানা থাকা উচিৎ, সচারচর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা কখনোই স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে সংঘটিত হয় না। দাঙ্গা লাগানো হয়। দাঙ্গা লাগাতে হয়। না লাগালে দাঙ্গা লাগে না। তাই তেলেনিপাড়ায় দাঙ্গা লাগাতে নৌকাযোগে দুস্কৃতী ঢোকাতে হয়। ফলে খবর ছাড়াক আর নাই ছড়াক। দাঙ্গা তখনই লাগবে, যখন ভাড়াটে দুস্কৃতী দিয়ে দাঙ্গা লাগানো হবে। এখন কখন কোথায় দাঙ্গা লাগানো হবে, সেটিতো রাজনৈতিক বিষয়। সংবাদ শিরোনামে দাঙ্গার খবরকে ব্রাত্য করে রাখলেই কি লাভ হবে? লাভ তো হবেই না, উল্টে ফলস ন্যারেটিভের প্রবক্তাদের কাজটা আরও সহজ হয়ে যাবে। জনগণ সঠিক তথ্যের বদলে মিথ্যা তথ্য গিলতে বাধ্য হবে। তেলেনিপাড়ার ঘটনাতেও যেমনটি হয়েছে, হচ্ছে। খবরে প্রকাশ রাজ্যের বিখ্যাত সংবাদপত্রের নামে ফেক ওয়েব পোর্টাল খুলে তাতে পাকিস্তানের দাঙ্গার ছবি লাগিয়ে তেলেনিপাড়ায় সংখ্যাগুরুদের বাড়িঘর লুঠপাট করে অগ্নিসংযোগের খবর প্রকাশ করে নেটজুড়ে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ সংখ্যাগুরুরাই রাজ্যে নিরাপদ নয়, এই ফলস ন্যারেটিভটাই দ্রুতবেগে ছড়িয়ে দেওয়া হল রাজ্যব্যাপী। এদিকে রাজ্য সরকার আসল খবর চেপে গিয়ে দুস্কৃতীদেরই লাইসেন্স দিয়ে দিল।

রাজ্যের রাজনৈতিক হিসাব নিকাশে ‘সংখ্যাগুরুরাই রাজ্যে আর নিরাপদ নয়’, এই ফলস ন্যারেটিভ যত বেশি প্রতিষ্ঠা পেয়ে যাবে, সমস্ত সংখ্যাগুরু ভোট তত বেশি পরিমাণে একজোট হতে থাকবে এই ফলস ন্যারেটিভ প্রবক্তাদের পক্ষে। অঙ্কটা খুব একটা জটিল নয়। ফর্মূলাটাও সরল। যত বেশি দাঙ্গা লাগানো যাবে তত বেশি করে ফলস ন্যারেটিভকে সুদৃঢ় ভাবে প্রতিষ্ঠা করা সহজ হবে। এটি পরীক্ষিত সত্য। বর্তমান রাজ্যসরকারের এটি জানা থাকারও কথা। বাংলায় একটি প্রবাদ প্রচলিত আছে নিজের নাক কেটে পরের যাত্রা ভঙ্গ। বর্তমান রাজ্যসরকারেও আজ সেই দশা হয়েছে। যার সরাসরি প্রতিফলন দেখা যাবে আগামী বিধানসভা নির্বাচনে। হুগলীর তেলেনিপাড়ার ঘটনা সেরকমই ইঙ্গিত দিচ্ছে। রাজ্যে ক্ষমতায় এসে পিছনের দরজা দিয়ে একে একে পুরসভাগুলির ক্ষমতা দখল করতে করতে, রাজ্যের রাজনীতিতে ভুতপূর্ব শাসকগোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক করার পরিকল্পনায় খাল কেটে যে কুমীরের আমদানী করা হয়, আজ সেই কুমীরের ক্রমশ চওড়া হতে থাকা হাঁ’তে বর্তমান শাসকদলের প্রায় পুরোটাই কুমীরের খাদ্য হয়ে গেলেও অবাক হওয়ার কিছুই নাই। বরং বর্তমান শাসকদল কুমীরের খাদ্য হতে হতে কি পরিমাণে পুষ্টি জুগিয়ে চলেছে, হুগলীর তেলেনিপাড়ার ঘটনাই তার জ্বলজ্যান্ত প্রমাণ।

আজকের এই ফলস ন্যারেটিভের সাফল্য শুধু যে বর্তমান শাসকদলের নিয়তি হয়ে দেখে দিতে পারে তাই নয়। রাজ্যবাসীর নিয়তি হয়ে দেখা দিয়েও ঘরে ঘরে ভিটেতে ঘুঘু চড়ানোর দিন আগত ঐ। সরকার প্রস্তুত কিনা জানি না। রাজ্যবাসীর অন্তত প্রস্তুত থাকা দরকার।

১৭ই মে’ ২০২০

কপিরিট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত