মাস্ক না মুখোশ?



মাস্ক না মুখোশ?

অনেকেরই মাক্স পড়তে অনীহা। সেই অনীহা এতটাও হতে পারে যে খবরে প্রকাশ সম্প্রতি ব্রাজিলের আদালত থেকে অর্ডার দেওয়া হয়েছে, সেদেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে মাক্স পড়তে হবে। জানা যায় নি মার্কীন রাষ্ট্রপ্রধানের জন্য সেদেশের আদালতের হুকুমনামা কি। এই দুটি দেশই বর্তমানে করোনা আক্রান্তের সংখ্যায় ও করোনায় মৃতের সংখ্যায় যথাক্রমে প্রথম ও দ্বিতীয় স্থানাধিকারী। আমাদের ভারতবর্ষও খুব একটা পিছিয়ে নেই। করোনাসভায় শ্রেষ্ঠ আসন নেওয়ার দৌড়ে খুব দ্রুতগতিতে বাকি অনেক দেশকেই পিছনে ফেলে দিয়ে বর্তমান চতুর্থ স্থানে পৌঁছিয়ে শক্তিশালী রাশিয়ার ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছে। তা ফেলুক। ১৩৭ কোটির দেশ বিশ্বের করোনাসভায় শ্রেষ্ঠ আসন না পেলে সে দেশবাসীরই লজ্জা। চিন্তার কিছু নাই, দুই মাস লকডাউনে থেকেও যেরকম দ্রুতহারে আমরা করোনা ছড়িয়ে দিতে সাফল্য অর্জন করেছি, তা সত্যই অভুতপূর্ব।

অথচ দেখুন ইতালী স্পেন ফ্রান্স জার্মানী এমনকি সেই ব্রিটেনও কেমন থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছে। মাঝ পথেই দৌড় থেকে ছিটকে গিয়েছে। আর চীনের কথা কি আর বলবো? সেই খরগোস আর শামুকের দৌড়ের মতো দশা। জগৎ কাঁপিয়ে দৌড়ঝাঁপ দেখিয়ে কবেই কাৎ হয়ে পড়ে রইল। সেই যে আশি হাজারের গণ্ডীতে ঢুকেছিল, সেখানেই আটকিয়ে রয়ে গেল। আর আমরা! এই তো সেইদিন মনে হচ্ছিল এজন্মে বোধহয় আর আশি হাজারের গণ্ডীতে পৌঁছাতেই পারবো না। যেভাবে বাস ট্রেনের চাকা বন্ধ করে পুলিশের যষ্ঠী সঞ্চালন প্রদর্শন করে মানুষকে ঘরবন্দী করে ফেলা হচ্ছিল, তাতে সত্যই শংকিত হওয়ার মতোই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল। বিশ্ব করোনা মিটে ভারত বুঝি অলিম্পিকের মতোই পদকশূন্য হাতেই ঘরে ফিরবে। কিন্তু না আমাদের মাথার উপর ছড়ি ঘোরান যারা, তারা সহজে হাল ছাড়ার পাত্র নন। আমাদের সকল আশংকা অমূলক প্রমাণ করে তাঁরা প্রকৃত দেশপ্রেমীর মতো ভারতবর্ষকে প্রায় চোখের নিমেষে চার নম্বরে তুলে নিয়ে এসেছেন। এই বিষয়ে তাঁদের বিরুদ্ধে দুনম্বরী করার কোন রকম অভিযোগ কেউ করতে পারবেন না। সে সুযোগই তাঁরা দেননি। একনিষ্ঠ একাগ্রতায় তাঁরা ভারতবর্ষকে করোনাসভায় শ্রেষ্ঠ আসনে বসানোর সাধনায় স্থিতসংকল্প।

যাই হোক যে কথা বলছিলাম। মাস্ক পড়ার বিষয়ে রাষ্ট্র প্রধানদের এই অনীহা কেন? দেশবাসীকে মাস্ক পড়িয়ে নিজেরা পড়তে অস্বীকার করেন কেন? সত্যিই কি তাঁদের মৃত্যভয় নাইঁ। দেশসেবার ব্রতে এমন ভাবেই নিজেকে উৎসর্গ করেছেন যে, জীবন মৃত্যু পায়ের ভৃত্য অনুভব করেন। আবার দেখুন এরই ভিতর হটাৎ খবর পাওয়া গেল, বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর রাষ্ট্র প্রধান খোদ ট্রাম্প সাহেব হোয়াইটহাউসের বাঙ্কারে আশ্রয় নিয়েছেন। শুনেই চমকে উঠলাম। তবে কি সাদ্দাম হোসের ভুত আমেরিকায় পরমাণু হামলা চালালো? নাকি লাদেনের হাড়গোড় গেড়ে বসলো সেখানে? অন্তত আমেরিকাবাসীদেরকে প্রায় এক দশক ধরে সেরকমই ভয় দেখানো হয়েছিল। জানি আমরা। ভয় আমাদেরকেও দেখানো হয়েছিল কম না। সে যাই হোক, কিন্তু বিষয়টি কি? বিশ্বের এতবড় ক্ষমতাধর ব্যক্তির শেষে কিনা বাঙ্কারে আশ্রয় গ্রহণ! জানা গেল, পুলিশি জুলুমের প্রতিবাদে শ’খানেক নিরস্ত্র মার্কিণ নাগরিক হোয়াইটহাউসের সামনে জড়ো হয়ে হাতে প্ল্যাকার্ড নিয়ে স্লোগান দিতেই মার্কীণ রাষ্ট্রপ্রধানের বাঙ্কারগমন! কি কাণ্ড! সামান্য এতেই? তাহলে তো মাস্ক না পড়ার পিছনে কারণ অন্য। মৃত্যুভয় জয় করার সাহস নয় আদৌ।

একটু পিছিয়ে বরং আরও একটা খবরের খোঁজ করা যাক আসুন। এই কদিন আগে। লকডাউনের একেবারে প্রথমদিকে হঠাৎ জানা গেল ট্রামসাহেবের হুমকিতে আমাদের ভারতসম্রাট তড়িঘড়ি করে হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন রপ্তানীর অনুমদোনে ছাড়পত্র দিয়ে দিয়েছেন। তাই নিয়ে দেশ জুড়ে নতুন করে তাঁর ছাতির মাপ নেওয়াও শুরু হয়ে গেল। তা যাক। কিন্তু ট্রাম্প সাহবে হঠাৎ করে এমন হুমকিই বা দিতে গেলেন কেন? দিলেন তো দিলেন তাও আবার তাঁর বাধ্য ছাত্রকেই? অবশ্য মাষ্টারমশাইরা চিরকালই বাধ্য ছাত্রদেরই উপরে বেশি হুকুম জারি করে থাকেন। কারণ তাতে আত্মসম্মানে চোট লাগার সম্ভাবনা থাকে না বললেই চলে না। যাই হোক খোঁজ খবর নিয়ে জানা গেল, বিশ্বে এই হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন তৈরীর সর্ববৃহত প্রতিষ্ঠানটি একটি ফরাসী বহুজাতিক কোম্পানী। যে কম্পানীর একটা বড়ো শেয়ার ট্রাম সাহেবের পরিবারের মালিকানাধীন। এখন সারা বিশ্বে রটে গেল করনো মোকাবিলায় নিজের দেশকে রক্ষা করতে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর মানুষটি ভারতসম্রাটকে হুমকি দিয়ে হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন সরবরাহ নিশ্চিত করেছেন। করোনা মোকাবিলায় এই বস্তুটি আদৌ কোন কাজে লাগবে কিনা সেটা পরের প্রশ্ন। আসল কথা বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধরের হুমকি। তার মূল্য আকাশ ছোঁয়া। ফলে এই বস্তুটির দর বেড়ে গেল হু হু করে। ফরাসী সেই প্রতিষ্ঠানের শেয়ার দরও আকাশ ছুঁলো প্রায়। একই সাথে রথ দেখা আর কলা বেচা হলো ট্রাম্পসাহেবের। দেশরক্ষকের মুখোশ পড়ে। আমেরিকাবাসী তাঁদের প্রিয় রাষ্ট্রপ্রধানের জনগণের প্রাণরক্ষায় নিবেদিত প্রাণ ছবি দেখে আপ্লুত। সামনেই ভোট।

ফলে এই’যে দেশসেবার মুখোশ। যা পড়ে সারাদিন কাটাতে হয়। দেশসেবার শপথ নেওয়ার প্রথম দিন থেকে গদিচ্যুত হওয়ার মুহুর্ত পর্য্যন্ত। সেই মুখোশের ভার কি কম? কথায় বলে একে রামে রক্ষে নাই তায় আবার সুগ্রীব দোসর! এরপরেও আবার করোনা মুখোশে মুখ ঢাকতে হলে সত্যিই মুশকিল কি না বলুন! কিন্তু বিধিবাম। ব্রাজিলের রাষ্ট্রপ্রধানের। আদালতের রায়ে তাঁকে এবার হয়তো মুখোশের উপরেও মুখোশ চড়াতে হবে। ঢপের মুখোশের উপরে করোনার মুখোশ পড়ে রাষ্ট্রপ্রধানরা গলদঘর্ম হতে থাকুন বা না থাকুন, তাতে আমাদের কিছু এসে যায় না। আমরা বরং দেখে নি মুখ আয়নায়। নিজেদরকে।  আমাদের মুখোশগুলি ঠিক ঠাক আছে তো? ঝুলেটুলে যায়নি তো?

না রাষ্ট্রপ্রধানরাই যে শুধু ঢপের মুখোশ পড়ে চলাফেরা করেন, বিষয়টা মোটেই তা নয়। আমরা অধিকাংশ মানুষজনই বিশেষ করে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত উচ্চবিত্ত ও বিত্তশালী শ্রেণীর মানুষ, সকলেই কম বেশি ঢপের মুখোশেই নিজেদের সাজিয়ে রেখে সামাজিক শোভায় সুশোভিত করে থাকি। না না, একথায় চটে উঠবেন না বন্ধু। কথায় বলে যস্মিন দেশে যদাচার মুখোশ পড়ে জীবন পার। যে সমাজের যে নিয়ম। আপনি আমি কেউই সকাল হলেই জমিতে লাঙল দিতে নামি না। কিংবা রিক্সা টানতে ঠ্যালা ঠেলতে ছুটিনা। কারখানার ভেঁপু বাজলেই মজুরের লাইনে দাঁড়াই না। তাদের কথা আলাদা। কারণ তারা কেউই আমার আপনার মতো মুখোশজীবী নয়। আমরা স্বতন্ত্র। ভদ্রশ্রেণীর মানুষ। বাড়িতে তোষকের টিকিন ছিঁড়ে গেলেও সাটিনের চাদরে ঢাকা দিয়ে তবেই অথিতি আপ্যায়ন করি। আমাদের একটা সংস্কৃতি রয়েছে। সেই সংস্কৃতিতেই সন্তানের জন্য রচনা লিখে দিই মুখস্থ করে পরীক্ষায় বেশি নম্বর তুলতে পারে যাতে। সেই সব রচনার অধিকাংশতেই একটি বিখ্যাত লাইন থাকে বড়ো হয়ে আমি ডাক্তার হতে চাই মানুষের সেবা করার উদ্দেশে। ঢপের চপ শুধু নবান্ন থেকেই খাওয়ানো হয় না বন্ধু। আমি আপনি সকলেই নিজের ঘর থেকেই এই ঢপের চপ খাওয়ানোর সংস্কৃতির জনক ও জননী। লজ্জা পাচ্ছেন? তাও সম্ভব? পেলেও দরকার কি বলার?

বিস্তর টাকা পয়াসা ঢেলে তদ্বির করে টরে পুত্র কন্যাকে ডাক্তার বানাতে হয়। সে’কি কোনো অজ পাঁড়া গাঁয়ে গিয়ে সরকারী সেবা কেন্দ্রে মাস মহিনায় রুগী দেখার জন্য? নিশ্চয় নয়। কিন্তু দেখুন আমি আপনি কেমন গর্ব অনুভব করি, সন্তান যখন ডাক্তার হয়ে ওষুধ কম্পানীর কমিশনে বিদেশ ভ্রমণে যায় বৌ ছেলে মেয়ে নিয়ে! আমাদের সুভদ্র মুখোশ একটুও ঝুলে পরে না তাতে। পড়বেই বা কেন? এ কি যে সে মুখোশ? বাংলার নবজাগরণের পর প্রায় শতাধিক বছরের তিল তিল করে তৈরী করা বংশকৌলীন্যের মজবুত মুখোশ। এর একটা আভিজাত্য আছে না?

আভিজাত্য তো সত্যিই আছে। থাকবে। থাকারই কথা। না থাকলে এত টাকাকড়ি ঢেলে শিক্ষার আর মূল্য কি? ওকালতিতে দিকপাল সন্তানগর্বে গৌরবান্বিত অভিভাবক কোনদিন খোঁজ নিয়ে দেখেছেন কি? ওকালতির এত অর্থ আসছে কোন পথে? ইঞ্জীনিয়র পাত্রে কন্যা সম্প্রদানের তৃপ্তিই আলাদা। তারপর পথচারীর মাথায় নির্মীয়মান উড়ালপুল ভেঙ্গে পড়লে আর যাই হোক পিতামাতা হিসাবে আমার আপনার তো আর দায় থাকে না। ডাক্তারের মুখোশ পড়ে রুগী শোষণ। উকিলের মুখোশে মক্কলে শোষন। ইঞ্জীনিয়রের মুখোশে ঘুষ খাওয়া। শিক্ষকের মুখোশে শিক্ষার্থীকে নোটমুখস্থ করিয়ে জীবনবোধ-প্রতিবন্ধী করে রাখা। সমাজসেবীর মুখোশে দুপয়সা করে কম্মে খাওয়া। দেশসেবকের মুখোশে ভোটজালিয়াতি করে ক্ষমতার অলিন্দে পা রাখা। নানান মুখোশের নানান জাদু। স্বয়ং পি সি সরকার তিন প্রজন্মেও এমন ভেল্কি দেখাতে পারেন নি। আমার আপনার মতোন। এখন এসেছে ফেসবুক টুইটার ইত্যাদি। আমরাও নতুন একটা মুখোশে লগইন করছি দুইবেলা। সেটা বন্ধুত্বের মুখোশ। তারপর কে যে কার ওপর সিসিটিভি চালাচ্ছে জানতেও পারা যাচ্ছে না। এই মুখোশের আবার একাধিক শেড। কখনো সেটি সমাজসেবী হয়ে দেখা দেয়। কখনো সবজান্তা সর্বজ্ঞ। কখনো শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতি সমাঝদার। কখনো বা জনদরদী। কখনো প্রেমিক প্রেমিকা। আরও কত কি। এই যে মুখোশ সংস্কৃতি, আর সারাদিন কোন না কোন মুকোশে নিজেকে সুরোভিত করে রাখা, তার পরেও যদি আবার করোনার মুখোশ পড়তে বাধ্য হতে হয়, তবে কার না খারাপ লাগে? তিনি রাষ্ট্রের প্রধানই হোন আর হরিপদ কেরানীই হোন। মুখোশের উপরে মুখোশ। কে আর অত ভারবাহী হয়ে জীবন কাটাতে চায়?

২৬শে জুন’ ২০২০

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত