ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক পরিচয়

 

মানুষকে তার ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক পরিচয়ে বিশেষায়িত করার যে সংস্কৃতি। সেটি বাঙালির মজ্জাগত এক অভ্যাস। এই অভ্যাস হতো না যদি না, বাঙালি মূলত দুইটি পৃথক ধর্মীয় সম্প্রদায়ে বিভক্ত হয়ে যেত। এবং দুই সম্প্রদায়ের ভিতরে সামাজিক এবং বিশেষ করে বৈবাহিক মিলনের পথ অবরুদ্ধ না থাকতো। এই অবরুদ্ধ পথ দিয়েই সাম্প্রদায়িক বিভাজনের রাজপথ ক্রমশ বিস্তৃত ও প্রসারিত হতে থাকে। আমাদের বাঙালি জাতিতেও ঠিক সেটিই ঘটেছে। আমরা ভুলে গিয়েছি। মানুষের প্রাথমিক পরিচয় কোনটি। শাশ্বতকাল ব্যাপী সময় সীমায়, মানুষের প্রাথমিক পরিচয় তার ভাষিক পরিচয়ের সূত্রেই গড়ে ওঠে। সেই পরিচয়ে যাঁরই মাতৃভাষা বাংলা। তিনি সেই ভাষা ব্যবহার করুন আর নাই করুন। তাঁর প্রাথমিক পরিচয়, তিনি বাঙালি। এবং সেই পরিচয়ের সূত্রেই তিনি বাঙালি জাতির একজন প্রতিনিধি। সে তিনি বিশ্বের যে প্রান্তেই থাকুন। যে দেশেরই নাগরিক হন না কেন। এই যে সোজা কথাটুকু। এইটিই আমরা আজ ভুলে গিয়েছি প্রায়। ধর্ম একটি ব্যক্তিগত বিশ্বাস এবং চর্চার বিষয়। সেই বিশ্বাস ও চর্চায় কোন জাতি গড়ে ওঠে না। ধর্মীয় সম্প্রদায় গড়ে ওঠ। কিন্তু ভাষিক পরিচয় কোন বিশ্বাসের বিষয় নয়। চর্চার বিষয় হলেও সেটি জন্মগত বিষয়। সেই পরিচয়ই একজন ব্যক্তি মানুষের প্রাথমিক পরিচয়। মাতৃ‌ভাষার মাধ্যমেই আমরা আমাদের জাতির সাথে যুক্ত থাকি। আবার মাতৃভষার মাধ্যমেই আমরা অন্যান্য জাতি থেকে পৃথক থাকি। ফলে একমাত্র জাতিগত পরিচয়েই আমরা কারুর কাছে স্বদেশী। আবার জাতিগত পরিচয়েই আমরা কারুর কাছে বিদেশী। কিন্তু ধর্মীয় সম্প্রদায়ের যে পরিচয়। যেহেতু সেই পরিচয় কোন জাতিগত পরিচয় নয়। সেহেতু সেই পরিচয়ে আমরা করুরই কাছই স্বদেশী নই। কারুর কাছেই বিদেশীও নই। বহু বিদেশী মানুষও যেমন ধর্মীয় পরিচয়ে আমার সম্প্রদায়ের ভুক্ত হতে পারেন। ঠিক সেমনই বহু স্বদেশী মানুষও আমার সম্প্রদায়ের না হয়ে ভিন্ন সম্প্রদায় গোষ্ঠীর হতে পারেন। তাতে আমাদের ভিতরে কোন পার্থক্য সূচিত হয় না। আবার একই সম্প্রদায়ের বিদেশী মানুষের সাথে আমার সাম্প্রদয়য়িক সাযুজ্য থাকা সত্তেও জাতিগত পার্থক্য সবসময়ই বিদ্যমান থেকে যায়, যাবে। 

দুঃখের বিষয় এই বোধ সাধারণ ভাবে বাঙালি জাতির মধ্যে কোনদিন গড়ে ওঠেনি। গড়ে ওঠেনি বলেই, ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের সময় বাঙালি জাতিগত ভাবে অখণ্ড থেকে বাঙালির নিজস্ব অখণ্ড ভুখন্ডকে রক্ষা করতে পারেনি। আমরা আমাদের সাম্প্রদায়িক পরিচয়কেই বড়ো করে ধরেছিলাম। আমাদের মূল পরিচয়কে সম্পূর্ণ ভুলে গিয়ে। ফলে বাঙালি হিন্দু অবাঙালি হিন্দুকে আপন স্বদেশী বলে ভুল করেছিল। যে ভুল বাঙালি হিন্দুর আজেও ভাঙেনি। বাঙালি মুসলিম অবাঙালি মুসলিমকেও আপন স্বদেশী বলে ভুল করে নিয়েছিল। যে ভুল ভাঙতে লক্ষ লক্ষ প্রাণের আহুতি দিতে হয়েছে ১৯৭১ সালে। আর এই দুইয়ের যাঁতাকলে পড়ে বাঙালি আজ হিন্দু মুসলিমে এবং মানচিত্রের বেড়াজালে সংখ্যালঘু আর সংখ্যাগুরু পরিচয়ে পরস্পর বিভক্ত হয়ে বসে রয়েছে। যা সম্পূর্ণ প্রকৃতি বিরুদ্ধ এক ব্যবস্থা। আমাদের ভাষিক পরিচয় আসলেই প্রকৃতি নির্দিষ্ট। সেই পরিচয় কোনদিন মুছে ফেলা যায় না, যাবে না। আমরা আমাদের সাম্প্রদায়িক পরিচয় ইচ্ছা করলে বদলাতেও পারি। কিন্তু আমৃত্য আমাদের ভাষিক পরিচয়কে আমাদের বহন করে নিয়ে যেতে হয়। কারণ সেটি প্রকৃতি নির্দিষ্ট। এইকারণেই মানুষের ভাষিক পরিচয়ই তার মূল পরিচয়। তার আসল পরিচয়। সেই সূত্রেই সে একটি নির্দিষ্ট জাতির অংশ। যে পরিচয় মানুষ কোনদিন মুছে ফেলতে পারে না। কিন্তু তার সাম্প্রদায়িক পরিচয় প্রকৃতি নির্দিষ্ট নয়। সেই পরিচয় যখন তখন বদলিয়ে ফেলা যায়। সেটি মানুষের তৈরী বলে। এই কারণেই কোন মানুষেরই ধর্মীয় পরিচয় সাম্প্রদায়িক পরিচয় তার জাতিগত ভাষিক পরিচয়ের থেকে মূল্যবান নয়। বড়ো নয়। অনিবার্য নয়।

এত কথার অবতারণার কারণ, প্রত্যেক মানুষকে তাঁর পরিচয় পত্রে কিংবা সরকারী বেসরকারী এক বা একাধিক আবেদন পত্রে নিজের পরিচয় ঘোষণার জন্য তাঁর সাম্প্রদায়িক ধর্মীয় পরিচয় জানানোর একটা বাধ্যবাধকতা থাকে। যেমন থাকে তাঁর নাগরিকত্বের পরিচয় ঘোষণার বাধ্যবাধকতাও। এই যে সাম্প্রদায়িক পরিচয় লিপিবদ্ধ করার সংস্কৃতি। এই সংস্কৃতিই সাম্প্রদায়িক বিভাজনের সূত্রপাত স্বরূপ কাজ করতে থাকে। শুধু আমাদের দেশ বলেই নয়। মানুষের ভাষিক পরিচয় তার জাতিগত পরিচয়কে নির্দিষ্ট করে। সেই পরিচয়টি বরং অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় ব্যক্তিমানুষের নাগরিক পরিচয়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার সাম্প্রদায়িক পরিচয় দিয়ে কখনোই তাঁকে নির্দিষ্ট করা উচিত নয়। প্রতিটি মানুষ তাঁর ভাষিক পরিচয়ে তার জাতীয়তার পরিচয়কে ধারণ করবে। এবং তাঁর নাগরিত্বের পরিচয়ে তাঁর রাষ্ট্রীয় পরিচয়কে ধারণ করবে। এই দুটি পরিচয়ই আধুনিক বিশ্ব ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে মানুষের সাম্প্রদায়িক ধর্মীয় পরিচয় আদৌ কোন গুরুত্ব রাখে না। বরং সেই পরিচয় পদে পদে বিড়ম্বনার কারণ হয়েও দাঁড়াতে পারে।

ফলে আজকে সময় এসেছে আমাদের প্রত্যেকের সচেতন হয়ে ওঠার। আমাদের ভিতর থেকে এই দাবিটা ওঠার দরকার যে, আমাদের ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক পরিচয় যেন কোন ব্যক্তিগত ঘোষণা পত্রে বা সরকারী ব্যক্তিগত আবেদন পত্রে ঘোষণা করতে না হয়। সরকারী বেসরকারী সকল ফর্ম থেকেই মানুষের পরিচয় জ্ঞাপক রিলিজিয়নের জায়গাটি যেন তুলে দেওয়া হয়। আমাদের পরিচয় হোক নাগরিক রাষ্ট্রীয় পরিচয়ে। এবং ভাষিক জাতিগত পরিচয়ে, যদি সেটিও একান্তই দরকার হয়। কিন্তু সাম্প্রদায়িক ধর্মীয় পরিচয়ে আমাদেরকে নির্দিষ্ট করে দেওয়ার দরকার নেই আর। এই পথটুকু সকলের আগে বন্ধ হওয়ার দরকার। এই পথেই আমরা মানুষকে সংখ্যালঘু মনে করে অশ্রদ্ধা অবজ্ঞা জ্ঞাপন করি। এমনকি করুণাও করে থাকি। এবং সময় সুযোগে নির্যাতন নিপীড়ন করে থাকি সংখ্যাগুরু হওয়ার ঔদ্ধত্যে। বিশেষ করে ভারতবর্ষের মতো সাংবিধানিক ভাবে ধর্মনিরপেক্ষ একটি রাষ্ট্রে তো কখনোই ভারতীয় নাগরিকদের সাম্প্রদায়িক ধর্মীয় পরিচয়ে নির্দিষ্ট করার কোন প্রয়োজন থাকার কথাই নয়। ভারতবর্ষের সংবিধানেই সেই পরিসর দিয়ে রাখা হয়নি। সেখানে যাবতীয় সরকারী বেসরকারী নথীতে কেন একজন নাগরিকের ব্যক্তিপরিচয়ের ঘোষণায় রিলিজিয়ন জানানোর সুযোগ দেওয়া হবে? এই সুযোগের ছিদ্র দিয়েই তো সারা ভারতে সাম্প্রদায়িক বিভেদ বিদ্বেষ এবং বিভাজনের রাজনীতি চলতে থাকে। চলতে থাকে সংখ্যাগুরু আর সংখ্যালঘু পরিচয়ের অশুভ সংস্কৃতিকে বহন করে নিয়ে চলার উত্তরাধিকার। সেই উত্তরাধিকার থেকে ভারতীয়দের মুক্ত করার সময় কি আসেনি এখনো? ভারতবাসীর মূল পরিচয়, তারা ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। সেই একটি পরিচয়ের বাইরে আর একটি পরিচয়ই মুখ্য হতে পারে। সেটি তার ভাষিক জাতিগত পরিচয়। কেননা ভারতবর্ষ বিভিন্ন জাতির একটি যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো। ভারতবর্ষ কোন একটি জাতির দেশ নয়। কোন একটি ধর্মের দেশ নয়। কোন একটি ভাষাগোষ্ঠীর মানুষেরও দেশ নয়। ভারতবর্ষ একটি যুক্তরাষ্ট্র। যেখানে বিভিন্ন ভাষিক জাতি সমূহ ধর্ম নিরপেক্ষ ভাবে সম্মিলিত অধিকার ও দায়িত্বের অঙ্গীকারে সংঘবদ্ধ। সেই সঙ্ঘবদ্ধতা সাম্প্রদায়িক পরিচয়ের ভেদাভেদে নিরন্তর ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে চলেছে। এর অবসান প্রয়োজন

প্রয়োজন আমাদের বাংলায় বাঙালির পরিচয় তার ভাষিক জাতিসত্তায় নির্দিষ্ট হওয়াও। আমরা যাঁরাই বাংলাভাষায় কথা বলা শিখেছি। তাঁরাই বাঙালি। সেই পরিচয়েই আমরা কো‌ন এক বা একাধিক রাষ্ট্রের নাগরিক। সেই পরিচয়ের সূত্রেই সকল বাঙালিই এক ও অভিন্ন। তার ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক পরিচয় যাই হোক না কেন। সে, বাংলার ভুখণ্ডের যেকোন প্রান্তেই সংখ্যাগুরু। কখনোই সংখ্যালঘু নয়। এইবোধে উদ্বোধিত হলে আর আমাদের বলতে হবে না কে মুসলিম কে হিন্দু। কারণ আমরা যাঁরাই বাঙালি, তাঁরাই এক ও অভিন্ন ঐতিহাসিক ভৌগলিক ও সাংস্কৃতিক সূত্রে আপন। অবিচ্ছেদ্য।

ধর্মীয় পরিচয় যেহেতু প্রকৃতি নির্ধারিত নয়। সেই কারণেই সেই পরিচয়ে মানুষকে কাছে টানাও যেমন অভিপ্রেত নয়। দূরে ঠেলাও তেমনই অনভিপ্রেত। ভাষিক পরিচয়ে আমরা এক একটি জাতির অংশ হলেও অন্য কোন জাতি থেকেই আমরা বড়ো বা ছোটও নই। কিংবা অন্য কোন জাতির বৈরীও নই। বরং সকল জাতিকেই বন্ধু বলে কাছে টানার মতো প্রশস্ত হৃদয় থাকলেই একটি জাতি সত্যিই বড়ো হয়ে উঠতে পারে। জাতিগত বৈরীতাকে দূরে সরিয়ে রেখে যে জাতি বাকি সকল জাতির পাশে গিয়ে দাঁড়াতে পারে হৃদয়ের ঐশ্বর্য্য নিয়ে। সেই জাতিই বাকি বিশ্বকে মানবতার পথে সঠিক নেতৃত্ব দিতে পারবে। ফলে প্রত্যেক মানুষের ভাষিক জাতিগত পরিচয় অবশ্যই মূল্যবান। কিন্তু দেখতে হবে সেই পরিচয়ও যেন বিশ্ব মানবিকতার মূল্যকে ছাপিয়ে না যায়। সাম্প্রদায়িক পরিচয় সেই বিশ্ব মানবিকতার পরিচয়কে ছাপিয়ে যায় বলেই সেই পরিচয় সাম্প্রদায়িক। শুধু যে বিশ্ব মানবিকতার পরিচয়কেই ছাপিয়ে যায়। তাও নয়। ইতিহাসের পাতা উল্টিয়ে আমরা আগেই দেখে নিয়েছি, মানুষের সাম্প্রদায়িক পরিচয় কিভাবে তার ভাষিক জাতিগত পরিচয়কে ছাপিয়ে গিয়ে দেশভাগের মতো কালান্তর অভিশাপ ও বিপর্যয় নামিয়ে আনতে পারে। একটি জাতির জীবনে। ইতিহাসের থেকে শিক্ষা নিয়েই আমাদের এগিয়ে চলা উচিৎ। ঠিক সেই কারণেই আমাদের এবারে সরব হয়ে ওঠার সময় এসেছে। সকল ধরনের সরকারী বেসরকারী নথী ও ফর্ম থেকে রিলিজিয়ন লেখার সুযোগটি অপরারিত করার। এইটি দূর করে দিলেই সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ বিভেদ ও বিভাজন শেষ হয়ে ইতিহাসে মিলিয়ে যাবে, এমনটাও নয়। কিন্তু এই সাম্প্রদায়িক বিভেদ বিদ্বেষ বিভাজন থেকে দেশবাসীকে উদ্ধার করার কঠিন সংগ্রামের শুভারম্ভটুকু হতে পারে। সেই শুরুর কাজটি আর ফেলে রাখা উচিত কি? তাই আজ থেকেই আমাদের স্লোগান হোক, ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক পরিচয় নয়। ভাষিক জাতিগত পরিচয় এবং নাগরিক রাষ্ট্রীয় পরিচয়ই হোক আমাদের মানবিক পরিচয়ের প্রাথমিক এবং প্রধান ধাপ। যে পরিচয়ের সূত্রে আমরা মিলতে পারবো বিশ্বের সকল জাতির মানুষের সাথে। সকল ভাষাভাষির মানুষের সাথে। সমানে সমানে। সামনা সামনি। সমান ভাবে।

২৪শে জুলাই’ ২০২১

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত