মার্কিনশক্তির আফগানিস্তান ত্যাগ

 

অবশেষে আপদ বিদায় হয়েছে। কিন্তু গোটা আফগানিস্তানকেই ভিখারি বানিয়ে তবেই দেশটা ছেড়েছে। যদিও আফগানদের ভাগ্যনিয়ন্ত্রণের অধিকার আফগানদের হাতে ছেড়ে যায়নি। আফগানিস্তানকে রেখে গিয়েছে নিজেদের হাতে গড়ে তোলা মধ্যযুগীয় চিন্তাধারার তালিবানদের হাতেই। এবং সেটাও পিছনের দরজা দিয়ে। সরাসরি তালিবানদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে পর্দার পিছন থেকেই তালিবানদেরকে ক্ষমতায় বসিয়ে তবেই দেশটা ছেড়েছে। এবং আগামী বেশ কয়েক প্রজন্মের আফগানরা যাতে তালিবানী শাসনের নিয়ন্ত্রণেই থাকতে বাধ্য হয়। সেইরকম বন্দোবস্ত করে রেখে তবেই গিয়েছে। এই যে মধ্যযুগীয় চিন্তাধারার তালিবানী সংস্কৃতি। আজকে গোটা আফগানিস্তান জুড়ে জাঁকিয়ে বসে রয়েছে বিগত প্রায় তিন দশক ধরে। এটাই আফগানিস্তানে মার্কিনশক্তির সবচেয়ে বড়ো সাফল্য। সোভিয়েতের সাহায্য নিয়ে আফগানিস্তানের যে সমাজ আধুনিক বিশ্ববন্দোবস্তের সাথে সংযুক্ত হওয়ার লক্ষ্যে আধুনিক জীবনযাপনের সংস্কৃতিকে আফগানিস্তানে কায়েম করতে চেয়েছিল। সেই গোটা সামাজধারাটিকেই সমূলে বিনাশ করতে সফল হয়েছে মার্কিনশক্তি। সফল হয়েছে এই তালিবানী শক্তির জন্ম দিয়ে। তালিবানদেরকে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির একেবারে উপযুক্ত করে তিলে তিলে তৈরী করে, আধুনিকপন্থী আফগান সমাজের শিকড়সুদ্ধ উপড়িয়ে ফেলে দিয়েছে। আর সেখানেই বসিয়ে দিয়েছে এই তালিবানী সংস্কৃতি। আবিশ্ব মার্কিনশক্তির স্বার্থরক্ষায় যে সংস্কৃতি কাজ করে চলেছে বিগত প্রায় তিন দশক ধরে। কাজ করে চলবে আরও বেশ কয়েক দশক জুড়ে। যতদিন মার্কিন স্বার্থরক্ষায় এই সংস্কৃতির প্রয়োজন থাকবে। ততদিনই আফগানিস্তান জুড়ে দাপিয়ে বেড়াবে তালিবানী সংস্কৃতি। আর ততদিনই মধ্যযুগীয় অন্ধকারে পড়ে থাকবে গোটা আফগানিস্তান। যার ফলে সবচেয়ে বেশি মূল্য দিতে হবে আফগানিস্তানের নারী সমাজকেই। আর সবেচেয়ে বেশি মূল্য দিতে হয়েছে আফগানিস্তানের সেই নারী সমাজকেই। বিশ্বজুড়ে জাঁকিয়ে অস্ত্রব্যবসা করার জন্য যে বিশ্বরাজনীতির সৃষ্টি করেছে মার্কিনশক্তি। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের হাত ধরে। আফগানিস্তান ইরাক লিবিয়া সিরিয়া সেই রাজনীতিরই সরাসরি বলি হয়েছে। না, পাশ্চাত্য মিডিয়ার পাঠশালার সুবোধ ছাত্রছাত্রী যারা বিগত তিন চার দশক জুড়ে ঝাড়েবংশে বেড়ে উঠেছে। তারা এই ইতিহাস কোনদিনই স্বীকার করতে রাজি নয়। ইতিহাসের বদলে তাদের কাছে মিডিয়ার তৈরী মিথ আর গল্পগাথাই বেশি বিশ্বাসযোগ্য। ভরসাস্থল।

 

আফগানিস্তানকে যে নরক বানিয়ে রেখে গেল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার থেকে পরিত্রাণ পেতে হয়তো কয়েক শতকও লেগে যেতে পারে। কেননা একটা জাতির শিক্ষা সংস্কৃতির সব কয়টা জানলা দরজা বন্ধ করে দিয়ে তাকে যদি এক হাতে ধর্মগ্রন্থ আর এক হাতে ভিক্ষার বাটি ধরিয়ে দেওয়া যায়। তবে সেই জাতিকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম বিকলাঙ্গ ও জরভরত করে রেখে দেওয়া যায়। আফগানিস্তানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ঠিক এই কাজটিই করেছে। বিগত আড়াই দশকে আফগানিস্তানের অর্থনীতির পঁচাত্তর শতাংশই নির্ভরশীল ভিক্ষার উপরে। তালিবান কেন। কোন শক্তির পক্ষেই সেই গভীর কুয়ো থেকে আফগানিস্তানকে উদ্ধার করা সম্ভব নয়। তালিবানীদের পক্ষে তো বিশেষভাবেই নয়। কারণ যারা নারী সমাজকেই সম্মান দিতে পারে না। যারা সমাজে নারীকে দাসত্বের শৃঙ্খলে বেঁধে রাখে। তাদের পক্ষে দেশকে আত্মনির্ভর করে তোলা কোনভাবেই সম্ভব নয়। এবং মার্কিনশক্তিও ঠিক এটাই চায়। আর সেই কারণেই মার্কিনদের অবর্তমানে পাছে আফগানিস্তানের শাসন ক্ষমতায় কোন প্রগ্রেসিভ শক্তি উঠে আসে। তাই আগে ভাগেই সেই তালিবানদেরকেই শাসন ক্ষমতায় বসিয়ে দিয়ে গেল। দুই দশক আগে যে তালিবানদেরকেই পৃথিবীর বুক থেকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার গল্প বলে আফগানিস্তানের দখল নিয়েছিল। বিশ্বের সবচেয়ে বড়ো যুদ্ধবাজ দেশটি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর থেকে একমাত্র দেশ, যে দেশ প্রায় প্রতিটি দশকেই কোথাও না কোথাও যুদ্ধ বাধিয়ে রেখে চলেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই সেই দেশ। যাদের অর্থনীতির চালিকা শক্তিই হলো বিশ্ব জুড়ে যুদ্ধ বাধানো ও যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার উপরে। অনেকেই এই কথার বিরোধীতায় নির্লজ্জতার পরিচয় দিতেই বেশি উৎসাহী হবেন সন্দেহ নাই। কিন্তু সত্য ইতিহাসের প্রতিটি পাতাতেই আসল সত্য এটাই। এখন প্রশ্ন। তাহলে মার্কিনশক্তি আফগানিস্তান ত্যাগ করলো কেন। তার আসল সত্য এখনই বলার সময় আসেনি। কেননা মার্কিনরা বাকি বিশ্বের থেকে যে জায়গাটায় সবচেয়ে বেশি এগিয়ে। সেটা হলো তাদরে আগাম চিন্তা করার ক্ষমতা প্রশ্নাতীত ভাবেই তুলনাহীন। তারা আজকে যে কথা চিন্তা করতে পারে। বাকি বিশ্বের পক্ষে সেই কথা অনুধাবন করতেই কয়েক দশক সময় লেগে যায়। ফকে আপাতত এইটুকুই বলা চলে, আফগানিস্তানে সৈন্য রাখার প্রয়োজন শেষ হয়ে গিয়েছে বলেই মার্কিনরা সে দেশ ত্যাগ করেছে। সেই সৈন্য এখন অন্য কোথায় ডিউটি করবে। সেটা মার্কিনদের নিজস্ব বিষয়। নিজেদের হাতে তৈরী তালিবানদেরকে তারা এখন যে কাজের ভার দিয়ে চলে গেল। সেই কাজ কিভাবে তালিবানদেরকে দিয়েই চালিয়ে নিয়ে যাবে। সেটা পেন্টাগনের স্ট্র্যাটেজিক বিষয়। কিন্তু এটা বুঝতে বেশি জ্ঞান লাগে না। যে কাজের উদ্দেশে মার্কিনরা আফগানিস্তানের দখল নিয়েছিল গুলি বোমা মিসাইল কামান বন্দুকের ডগায়। সেই কাজ তাদের ফুরিয়েছে। আফগানিস্তানের মাটিতে যে কাজ তারা গত দুই দশকে করে এসেছে। তাতেই তালিবানদেরকে দিয়ে তাদের বাকি কাজ সম্পন্ন করতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।

 

এখানে অবশ্য আরও একটা সম্ভাবনার কথা উড়িয়ে দেওয়াও যায় না। এমনও হতেই পারে। মার্কিনশক্তির অর্থনৈতিক স্বার্থে আফগানিস্তানের আর কোনই প্রয়োজন নাই। ফলে আঁখ খেয়ে তার ছিবড়ে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়ার মতোনই হয়তো তাদের এই আফগানিস্তান ত্যাগ করে যাওয়া। ঠিক যেমন কাবুল বিমানবন্দর ত্যাগের আগে তারা বিমানবন্দরের সমস্ত সুরক্ষা বন্দোবস্ত ধ্বংস করে দিয়ে গিয়েছে। বিমানবন্দরের সুরক্ষায় ব্যবহৃত সকল বিমান হেলিকপ্টার সাঁজোয়া গাড়ী, এন্টি মিসাইল ডিফন্স সিস্টেম সব কিছুই অকেজো করে রেখে দিয়ে গিয়েছে। এটাই মার্কিন সংস্কৃতি। ট্রাম প্রশাসন যখন তালিবানদের সাথে গত বছর আফগানিস্তান ত্যাগের চুক্তি সম্পন্ন করেছিল। তখন নিশ্চয় সেই চুক্তির ভিতরে এইরকম কোন শর্ত ছিল না। কিন্তু তবুও বিমানবন্দর ত্যাগের পূর্বে তারা তাদের স্বভাবধর্ম বদলাতে পারেনি। এটাই মার্কিনসংস্কৃতি। তারা বিমানবন্দরের যাকিছু ধ্বংস করে গিয়েছে। সেইগুলি দিয়ে আর যাই হোক আমেরিকায় গিয়ে মার্কিনদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা যেত না। কিন্তু তবুও ছুঁচো মেরে হাত গন্ধ করতে মার্কিনদের জুড়ি মেলা ভার। হ্যাঁ এটাও ঠিক। পাশ্চাত্য মিডিয়ার পাঠশালার বাধ্য ছাত্রছাত্রীরা এটাকেই উচিত কাজ বলে ঢাক পেটাতে থাকবে। না হলে তালিবানদের হাতে পড়ে এইসব সামরিক যানবাহন সন্ত্রাসের কাজে ব্যবহৃত হতে পারতো। মার্কিনরা সেই ভুলটি না করে বাকি বিশ্বের মানুষকেই নাকি নিরাপদে রেখে গেল। দীর্ঘ চার দশকের বেশি সময় ধরে এখানেই পাশ্চাত্য মিডিয়ার সবচেয়ে বড়ো সাফল্য। মানুষ কখন কিভাবে কোন যুক্তিতে ভাবনা চিন্তা করবে সেটি নির্দিষ্ট ভাবে ঠিক করে দেওয়া এবং নিঁখুত ভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারা। বাকিটা আর দেখতে হবে না। হয়ও নি। হচ্ছেও না।

 

মার্কিনশক্তির স্বার্থ যাই হোক না কেন। আফগানিস্তানকে আরও কয়েক দশক মধ্যযুগীয় অন্ধকারে মুড়ে রাখার উদ্দেশেই তালিবানদের বিনা বাধায় কাবুল দখল করতে দেওয়া। ফলে সাধারণ আফগানবাসীর ভাগ্য যে তিমিরে ছিল সেই তিমিরেই পড়ে রইল। অনেকেই যারা মার্কিনদের আফগানিস্তান ত্যাগকে আফগানিস্তানের স্বাধীনতা অর্জন বলে ধরে নিচ্ছেন। তাদের স্মরণে রাখা দরকার। পূর্ববঙ্গের মুসলিম সমাজও ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশের বাংলা ছেড়ে চলে যাওয়াকেও পূর্ববঙ্গের বাঙালির স্বাধীনতা অর্জন বলে ধরে নিয়েছিল। যে ভুল ভাঙতে প্রায় তিরিশ লক্ষ বাঙালিকে প্রাণ দিতে হয়েছিল। ইতিহাসে বারে বারেই একই ভুলের পুনারাবৃত্তি হতেও দেখা যায়। আশার কথা একটাই। আফগানদের সকলেই কিন্তু মার্কিনসৈন্যের আফগানিস্তান ত্যাগকেই স্বাধীনতা অর্জন বলে মনে করতে পারছে না। তারা খুব ভালো করেই জানে আফগানিস্তানের প্রকৃত স্বাধীনতা সেই দিন অর্জিত হবে। যেদিন কোন বিদেশী শক্তির স্বার্থে চালিত হতে থাকবে না দেশটি। কিন্তু আফগানিস্তানের সমাজ যতদিন তালিবানদের কব্জায় থাকবে। ততদিনই আড়ালে আবডালে তলায় তলায় মার্কিনশক্তির স্বার্থেই পরিচালিত হতে থাকবে গোটা আফগানিস্তান। আঁখের রস ফুরিয়ে গেলেও আঁখের ছিবড়ে দিয়ে যে আরও কিছুদিন জ্বালানীর কাজও চালানো যেতে পারে। সেকথা ভুলে গেলে ভুল হয়ে যাবে আরও একটা।

 

৩১শে আগস্ট’ ২০২১

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত