স্ত্রীলিঙ্গ অবরোধ

 

আমাদের আটপৌরে জীবনের চৌহদ্দীতে পুরুষতান্ত্রিক জীবনবোধের পরিসরে কেমন নারীকে জীবনসঙ্গী হিসেবে পেতে চাই আমরা?  উচ্চশিক্ষিত, শিক্ষিত, আধাশিক্ষিত, অশিক্ষিত পুরুষ প্রজাতির ব্যক্তিরা? অবশ্যই আমাদের শিক্ষা দীক্ষা রুচি আর্থসামাজিক প্রেক্ষিতের ভিত্তিতে এই চাহিদা বিচিত্ররকম ভাবেই ভিন্ন রকমের হবে ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে তার একটা শ্রেণী চরিত্রের বিন্যাসও খুঁজে পাওয়া যেতে পারে নিবিড় বিশ্লেষণের উদ্যোগে এবং এই ভিন্নধর্মী প্রত্যাশার মাপের মধ্যে পছন্দের নারীর কাছ থেকে কত কি পাওয়ার স্বপ্নে আমাদের যাবতীয় উদ্যোগ উদ্বোধিত হয়ে থাকে কিন্তু সেই স্বপ্নের অন্তর্বাসের আড়ালটুকু মুক্ত করলে দেখি, নারীকে আমরা বশ করতেই চাই হ্যাঁ, আবহমান কাল ধরে নারীর কাছে আমরা বশ্যতাই আশা করে এসেছি নারীর প্রতি আমাদের প্রেম প্রীতি ভালোবাসা, অন্তর্লীন সেই আশার প্রেক্ষিতেই আমাদের চেতনার অলিন্দে জায়মান হয় নারীকে অধিকার করার প্রয়োজনেই বিবাহপ্রথার উৎপত্তি নারীকে নিজের বশে আনার মধ্যেই  পৌরুষের সার্থকতা আর তাই পুরুষমনের আশা আকাঙ্খাগুলি সেই প্রেক্ষিতেই নারীকে ঘিরে আবর্তিত হয় যে নারীকে বুকের মধ্যে আলিঙ্গনাবদ্ধ করে তার নরম ওষ্ঠে ওষ্ঠ ডুবাই, ঠিক নিবিড় চুম্বনের সেই নীরব নিভৃত মাহেন্দ্রক্ষণে মন তৃপ্ত হয় সেই অধিকার বোধেরই সক্রিয় পরিতৃপ্তিতে নারীর ভালোবাসায় নয় নয় তার চুম্বনের আস্বাদনে তৃপ্তি আমার অধিকারবোধের চৌহদ্দীতে নারীর আত্মসমর্পণে

কন্ঠরোধের গল্প

রাষ্ট্রশক্তি আর ব্যক্তি মানস কোথাও কি একটা মিল দেখা যাচ্ছে? অন্তত বর্তমান ভারতবর্ষের রাজনীতি ও সমাজিক পরিসরে। রাষ্ট্র পরিস্কার বলে দিতে চাইছে, হয় আমার স্তাবকতা কর। আর নয়তো নিশ্চুপ থাকো। কিন্তু কোনভাবেই রাষ্ট্রের সমালোচনা করা চলবে না। রাষ্ট্রকে তার কোন কাজের জন্য প্রশ্ন করা যাবে না। রাষ্ট্রের জবাবদিহির কোন দায় নেই জনতার কাছে। রাষ্ট্র হয়তো একটি বিমূর্ত সত্তা। কিন্তু রাষ্ট্রকে পরিচালনা করার অধিকার প্রাপ্ত প্রশাসন কোন বিমূর্ত সত্তা নয়। প্রশাসনকে চোখের সামনে দেখা যায়। তার কাজকর্মের ফলে আমাদেরকে ভুগতে হয়। কিন্তু বর্তমান সংস্কৃতিতে সেই প্রশাসনকে তার কাজকর্ম সম্বন্ধে কোন প্রশ্ন করা চলবে না। প্রশাসন ও তার কর্তাব্যক্তিদের কাজের জন্য, তাদের কাছ থেকে কোন জবাবাদিহি চাওয়া যাবে না। অর্থাৎ সহজ কথায়, প্রশাসনের স্তাবকতা করতে অসুবিধে হলে, নীরব থাকাই শ্রেয়। মুখ খুললেই বিপদ। সম্প্রতি চালু হয়েছে নতুন তথ্য প্রযুক্তি আইন। ছাব্বিশে মে বুধবার থেকে। আমরা এখনো এই আইনের খুঁটিনাটি বিষয়ে ওয়াকিবহাল নই। কিন্তু প্রকাশিত খবরের সূত্র ধরে একথা বুঝতে অসুবিধে হচ্ছে না, সামাজিক মাধ্যমগুলিতে রাষ্ট্র অর্থাৎ প্রশাসনের বিরুদ্ধে মুখ খুললে, সমালোচনা করলে, প্রশ্ন তুললে এবার থেকে আইনের নাগালে নাকানিচোবানি খেতে হতে পারে। কয়েকটি সামাজিক মাধ্যমের সাথে এই বিষয় নিয়ে প্রশাসনের টাগ অফ ওয়ার চলছে। এমনকি দিল্লী হাইকোর্টে সরকারী ফরমানের বিরুদ্ধে মামলাও দায়ের হয়েছে। বহুজাতিক সংস্থার তরফ থেকে। তাদের বক্তব্য এই আইনের অন্যতম ধারা ‘তথ্যের উৎসমূল চিহ্নিতকরণ’ আসলেই অসাংবিধানিক। কারণ ভারতীয় সংবিধান অনুসারে মানুষের ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা মানুষের মৌলিক অধিকারের বিষয়। কিন্তু নতুন এই আইন সাংবিধানিক মৌলিক অধিকার রক্ষার পরিপন্থী।

সাপে নেউলে

 

বই আর বাঙালি। সম্পর্কটা কি অনেকটা সাপে নেউলের মতোন? জানি, এমন কথায় বাঙালি মাত্রেই চটে উঠবেন। সেটাই স্বাভাবিক। ঢাকা আর কলকাতা। একুশের গ্রন্থমেলা আর কলিকাতা পুস্তকমেলা। দুটিই আন্তর্জাতিক স্তরে প্রখ্যাত। ঢাকার বাংলা বাজার। কলকাতার কলেজস্ট্রীট। বাঙালি লেখক ও পাঠকের তীর্থক্ষেত্র। এবং রবীন্দ্রনাথ। সাহিত্যে বাঙালির নোবেল প্রাপ্তি। সেই একবার। তারপর এক শতাব্দী সময় চলে গেলেও ঐ একটি নোবেলের ওজনেই আমরা এখনো করে খাচ্ছি। সেই বাঙালির বই প্রীতি নিয়ে প্রশ্ন তুললে পাবলিক ছেড়ে দেবে নাকি? কিন্তু বাঙালির বই প্রীতির কথা বলতে গেলে। প্রথমেই বলতে হয়, কারুর কাছ থেকে বই চেয়ে নিয়ে এসে সেই বই তাকে ফেরত দেওয়ার বিষয়ে আমাদের ঐতিহাসিক অনীহার কথা। পদার্থ বিজ্ঞানের সূত্রের মতোন এই অনীহা সর্বাত্মক হলে বই প্রীতিও মারাত্মক হওয়ারই কথা। কিন্তু অধিকাংশ সময়েই দেখা যায়, আমরা যত বই কিনি তত বই পড়ি না। যত বই সংগ্রহ করি তত বই খুলে দেখি না। যত বই পড়তে শুরু করি তত বই শেষ অব্দি পড়ি না। যত বই শেষ অব্দিও বা পড়ি, তত মনে রাখতে পারি না। যতখানি মনেও রাখতে পারি ততখানি আন্য কারুর সাথে আলোচনাও করি না। ফলে আমাদের বই প্রীতির বিষয় যত কম বলা যায়। তত বেশি ভালো। জাতিগত মর্য্যাদা রক্ষা হয়। নাহলে বড় বিব্রত বোধ করতে হয়।

বাংলার মাটি বাংলার জল

 

বরাৎ জোর তিনি আজ জীবত নেই। থাকলে চমৎকৃত হতেন খুব। একই মানুষের দুদিন পঁচিশে বৈশাখ। ঠিক। আজ বাংলাদেশে পালিত হচ্ছে পঁচিশে বৈশাখ। আগামী কাল পশ্চিমবঙ্গ সহ অন্যান্য বঙ্গভাষী অঞ্চলে পালিত হবে সেই পঁচিশে বৈশাখ। কবি বেঁচে থাকলে তার স্বপ্নের সোনার বাংলার এই হাল দেখে কি লিখতেন জানি না। কিন্তু খুব কি অবাক হতেন? মনে হয় না। সেই ১৯০৫ এর বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের কেন্দ্রে থেকে শতভঙ্গ বাংলা দেশের চিত্র দেখে নিয়ে ছিলেন। দেখে নিয়েছিলেন বংশ পরম্পরায় বাঙালির সাম্প্রদায়িক মন মনন ও চেতনার প্রকৃতিগত স্বরূপ। হ্যাঁ হিন্দুমুসলিম সম্প্রীতির সমাজ বাস্তবতাও যেমন সত্য ছিল। ঠিক একই রকম সত্য ছিল জাতপাত ভিত্তিক সামাজিক ভেদাভেদের সমাজ বাস্তবতা। সেই ভেদাভেদের সমাজ সংস্কৃতির উপরেই ব্রিটিশের আনুকূল্যে গড়ে উঠছিল এক রাজনৈতিক পরিসর। কবি সেই রাজনৈতিক পরিসরের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে তাঁর নিজের কাজ চালিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন নিজের মতোন করে। আর নিজের মতো করে চালাতে হয়েছিল বলেই, নিজেই নিজেকে প্রবোধ দেওয়ার প্রয়াস করেছিলেন। ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে, তবে একলা চলো রে’। একলাই চলতে হয়েছিল কবি কে। তাঁর ডাক হাতে গোনা কয়েকজন নিশ্চয় শুনেছিলেন। কিন্তু জাতি হিসাবে বাঙালি কবি’র ডাক শোনেনি কোনদিন। আজ পঁচিশে বৈশাখে যদি সত্য অর্থেই কবিকে স্মরণ করতে হয়। তবে স্বীকার করে নিতে হবে সেই সত্যটুকুও। যদি আজও সেই সত্য স্বীকারে ব্যার্থ হই। তবে বুঝতে হবে আত্মপ্রবঞ্চনার সকল সীমাই লঙ্ঘন করে ফেলেছি।

ফ্রেমের ছবি ছবির ফ্রেম


না, আমার শঙ্খ ঘোষের সাথে কোন সেল্ফি নাই। কোন ছবি নাই। মানুষটির সাথে কোনদিন মুখোমুখি দেখাও হয় নি। শুনিনি কোনদিন তাঁর কোন বক্তৃতা প্রকাশ্য জনসভায় কিংবা বৌদ্ধিক সেমিনারে। কোন সাহিত্যসভাতেও দেখা হয়নি তাঁর সাথে। কিন্তু কথা হয়েছে নিরন্তর। না দূরাভাষে নয়। দূর আভাসেও নয়। কথা হয়েছে নিরবে নিভৃতে। একান্তে তাঁর লেখার ভিতর দিয়ে। যেমন কথা হয় আমাদের অনেকেরই, রবি ঠাকুরের সাথে। যেমন কথা হয় কারুর কারুর কার্ল মার্কসের সাথে। কিংবা লেলিনের সাথে। কখনো সখনো গ্রামশীর সাথে। ফ্রয়েডের সাথে। স্বামী বিবেকানন্দ কি ঋষি অরবিন্দের সাথে। রাসেলের সাথে, বার্নাড শ’র সাথে। রোমা রোঁলা কিংবা মানবেন্দ্র রায়ের সাথে। ঠিক তেমনই শঙ্খ ঘোষের সাথেও অন্য অনেকের মতোই আমারও কথা হয়েছে। হয় এবং আরও হবে। নিরন্তর হবে। যতদিন আয়ু সাহায্য করবে ততদিন।

অরাজনৈতিক নয়

 

সোশ্যালসাইটে বিশেষ করে ফেসবুকে, অনেকেরই সাম্প্রতিক রাজনীতির বিষয় নিয়ে আলাপ আলোচনায় অংশগ্রহণে আপত্তি রয়েছে। আপত্তি থাকা না থাকা, একজন ব্যক্তির মৌলিক অধিকারের বিষয়। সেই বিষয় নিয়ে আপত্তি করার কোন জায়গা থাকে না। এবং আপত্তি থাকার এই সামাজিক প্রবণতা কয়েকজনের ভিতরে সীমাবদ্ধ থাকলে সেই বিষয়ে আলোচনাও অর্থহীন। কিন্তু সেই একই প্রবণতা যখন একটা গোটা সমাজের প্রকৃতি হয়ে উঠতে থাকে। তখন সেই বিষয়ে আলাপ আলোচনার আশু প্রয়োজন রয়েছে বই কি। গণতান্ত্রিক নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় কে কোন দলের কোন প্রার্থীকে ভোট দেবেন, সেটি ব্যক্তি মানুষের একান্ত নিজস্ব একটি বিষয়। কিন্তু সমাজ রাজনীতির ঘূর্ণীতে সাধারণ মানুষ কিভাবে আবর্তিত হচ্ছে, এবং হতে বাধ্য হচ্ছে সেটি সর্বজনীন আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠাই বাঞ্ছনীয়। কিন্তু সাধারণ মানুষ সেই আলোচনায় আগ্রহী নন আর ইদানিং। তার একাধিক কারণ বর্তমান। কিন্তু প্রধানত যে কারণগুলি মানুষকে মুখে কুলুপ আঁটতে বাধ্য করে সেগুলির দিকে লক্ষ্য রাখলেই বর্তমান রাজনীতির মূল ব্যাধির হদিশ পাওয়া যেতে পারে।

রিলিজিয়নের ধর্ম

রিলিজিয়নের প্রধান কাজই হলো মানুষে মানুষে বিভেদ সৃষ্টি করা। অনেকেই সেকথা মানতে রাজি হবেন না, ঠিক। বরং বলতে চাইবেন, সব রিলিজিয়নই মানুষকে নিজের কোলে আশ্রয় দেয় বলেই এক একটি রিলিজিয়নকে কেন্দ্র করে কোটি কোটি মানুষের এক একটি সম্প্রদায় গড়ে ওঠে। গড়ে ওঠে ঠিকই। কিন্তু সেই গড়ে ওঠা প্রতিটি সম্প্রদায়ই এক এক ধরনের জীবনচর্চায় বিশ্বাসী হয়ে অন্য ধরনের জীবনচর্চাকে ভ্রান্ত বলেই বিবেচনা করে। এবং নিজ সম্প্রদায়ের জীবনচর্চাকে অভ্রান্ত জেনে সেই জীবনচর্চার চারদিকে একটি রিলিজিয়াস পাঁচিল তুলে রাখে। যার ওপারের সবটাই পরিত্যাজ্য। এই যে একটা অপছন্দের সংস্কৃতি, এর হাত ধরেই সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষচর্চার ভুমি তৈরী হতে থাকে। কোন রিলিজিয়নই বলে না, বাকি সব রিলিজিয়নই সমান অভ্রান্ত। সমান সুন্দর। কোন রিলিজিয়নই বলে না, সব রিলিজিয়নই আমার আত্মীয়। বরং বলে একমাত্র আমার রিলিজিয়নই বিশ্বের শ্রেষ্ঠ রিলিজিয়ন। আমার ঈশ্বরই জগতের মালিক। সব রিলিজিয়নই এই এক কথা প্রচার করে আসছে। অথচ কোন রিলিজিয়নই একবার ভেবে দেখে না, যদি সেই কথাই ধ্রুব সত্য হয়, তবে সেই জগতের মালিকের অধীনে এত ভিন্ন রকমের অন্যান্য রিলিজিয়নের আমদানী হয় কি করে? যে ভিন্নতার ভিতরে এত রকমের বিশ্বাস অবিশ্বাস আচার আরাধনা জীবনশৈলীর এমন গভীর পার্থক্য। 

রুচির বিকার


রুচির কোন নির্দিষ্ট সঙ্গা হয় কি? সঙ্গা নিশ্চয় হয়। তবে তা এক এক কালে এক এক অঞ্চলে এক এক গোষ্ঠীর ভিতর এক এক রকমেরও হতে পারে। এর একটা কারণ রয়েছে। রুচি কোন নিশ্চল অটল বিষয় নয়। স্থান কাল এমন কি জলবায়ু ভেদে রুচি পরিবর্তনশীল। রুচি ব্যক্তি বিশেষের শিক্ষা দীক্ষা নীতি নৈতিকতার উপরেও বিশেষ করে নির্ভরশীল। এমন কি বয়স ও অভিজ্ঞতার উপরেও রুচির গতি প্রকৃতি নির্ভরশীল। ফলে এক এক কালে এক একটি অঞ্চলে এক একজনের কাছে রুচির সঙ্গাও এক এক রকমের হতেই পারে। এবং সেক্ষেত্রে রুচির নির্দিষ্ট কোন মানদণ্ড থাকারও কথা নয়। থাকেও না। ফলে আমরা কখনোই রুচির মানদণ্ডে কারুর বিচার করতে পারি না। কিন্তু সেই রুচির উপরে নির্ভর করেই আমরা কাউকে কাছে টানতে পারি। কাউকে দূরে ঠেলে দিতে পারি। এটা আমাদের ব্যক্তিগত পছন্দ অপছন্দের বিষয়। এক এক সময়ে এক এক অঞ্চলের অধিকাংশের ভিতর রুচির যে সামঞ্জস্য তৈরী হয়ে ওঠে, তাকে আমরা জনরুচি বলতে পারি। এই জনরুচি একটি শক্তিশালী ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। জনরুচি অবশ্য গড়ে ওঠে জনশিক্ষার গতিপ্রকৃতির উপরে। জনশিক্ষার মান যখন যে অঞ্চলে যেরকম, জনরুচির মানও তার অনুরূপ হয়ে দেখা দেয়। সেটাই স্বাভাবিক। আবার বর্তমানের বিশ্বায়নের যুগে গণমাধ্যমগুলির ভিতর দিয়ে রাজনৈতিক শক্তিগুলির দিকনির্দেশনায় জনরুচির গতিপ্রকৃতি নিয়ন্ত্রণও করা সম্ভব। ফলে রুচি বিষয়টি অনেকগুলি শর্তের উপর দাঁড়িয়ে থাকে। তার নিজস্ব কোন সুনির্দিষ্ট ভিত নাই। সেটা ভালো না খারাপ, সে কথা ভিন্ন। কিন্তু বাস্তব এটাই যে, রুচি সদাই পরিবর্তনশীল।

অরাজনৈতিক সেল্ফি


আমাদের বসবাসের অলিগলি থেকে শুরু করে, লোক চলাচলের চৌহদ্দি থেকে ফেসবুকের ওয়াল জুড়ে শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর একটা বড়ো অংশই নিজেদের অরাজনৈতিক বলে দাবি করে থাকি। এবং সেই দাবির সপক্ষে থেকেই আমরা কোন রকম রাজনৈতিক আলোচনার পক্ষে বিপক্ষে অংশগ্রহণ করতেও রাজি নই। নিজেদের ওয়ালকে চলমান রাজনীতির প্রভাব থেকে মুক্ত রাখি। এটা অবশ্যই যে কোন স্বাধীন দেশের নাগরিকের মৌলিক অধিকার। সংবিধান স্বীকৃত। আমাদের ভিতর একটা বড়ো অংশই আবার নির্বাচনের দিন নিজেকে বাড়িতে বন্দী করে রাখি। সাধারণের সাথে এক লাইনে ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে থাকতে আমাদের ভালোও লাগে না। আমরা এও মনে করে থাকি, আমাদের ভোট দেওয়া না দেওয়ায় দেশের কিছু এসে যাবে না। ফলে দেশ জুড়ে যাই হয়ে যাক। সেটা রাজনীতির বিষয় হলে, আমাদের কিছু যায় আসে না। এই কারণেই আমরা কোন রকম রাজনৈতিক বিষয়ে মাথাও ঘামাতে রাজি নই। বরং সেই সময়ে ফেসবুকের ওয়ালে নান্দনিক শিল্পচর্চায় মশগুল থাকা অনেক ভালো। তাই আমরা কবিতা লিখি। গান গাই। নাচ দেখাই। গল্প বলি। পারলে পরনিন্দা পরচর্চাও করে থাকি। সারাদিন একঘেয়ে জীবনে একটু রিফ্রেশ হওয়ার দরকার আছে বই কি। তাই আমরা ফেসবুকে আসি।

ভাগের মা গঙ্গা পায় না


ভাগাভাগির ভিতরে বাঙালি হিসাবে আমাদের একটা বংশগত ঐতিহ্য বর্তমান। আর ভাগের সাথে বখরার একটা বিষয় জড়িয়েই থাকে। না, বখরা কথাটা শুনতে খারাপ। প্রধানত চোর জচ্চোর চিটিংবাজ ছ্যাঁচড়াদের সাথে বখরা কথাটা খাপ খায়। আজকাল অবশ্য, রাজনৈতিক ময়দানে নির্বাচিত প্রতিনিধি কেনাবেচার হাটের সাথেও বখরা কথাটি জড়িয়ে গিয়েছে। তাই আমরা ভদ্দরলোকেরা বখরা কথাটি মেনে নিতে রাজি নই। আমরা বলি ন্যায্য অধিকার। এই যেমন শীর্ষ আদালতের রায়ে কন্যা বিবাহিতই হোক আর অবিবাহিত। পৈতৃক সম্পত্তির অংশের ন্যায্য অধিকারী। তার অধিকার আইনত স্বীকৃত। আসলে সেটিও বখরা। এতদিন ভাইয়েরা বোনেদেরকে প্রাপ্য বখরা থেকে বঞ্চিত করতে পারতো। এবার থেকে আর পারবে না। অর্থাৎ বখরার ন্যায্য অধিকার পেতে গেলে। আগে তো ভাগ করতে হবে। ভাগ না করলে আর বখরা কিসের? তাই বলছিলাম। ভাগের সাথে বখরার জন্মজন্মাতরের সম্পর্ক। বখরা পেতে গেলে ভাগ না করে উপায় নাই। তাই পৈতৃক সম্পত্তির ভাগ দিয়েই একান্নবর্তী পরিবারের ভাঙন শুরু হয়েছিল। আমাদের বাংলার সমাজ জীবনে। যে যার বখরা বুঝে নিতেই পরিবারে ভাঙন ধরানোর কাজটি শুরু হয়ে যায়। যে পৈতৃক সম্পত্তির লোভেই একান্নবর্তী পরিবারের ভাঙন, অনেক ক্ষেত্রেই সেই লোভ ভায়ে ভায়ে হানাহানি অব্দি গড়িয়েও থাকে। একটা পরিবারের ভিতরেই যদি এই অবস্থা হয়, তবে গোটা সমাজের চেহাড়াটি কি রকম হতে পারে, সহজেই অনুমেয়।