বাংলাদেশের হৃদয় হতে…..


“Major Zia, provisional Commander-in-Chief of the Bangladesh Liberation Army, hereby proclaims, on behalf of Sheikh Mujibur Rahman, the independence of Bangladesh.

I also declare, we have already framed a sovereign. legal government under Sheikh Mujibur Rahman which pledges to function as per law and the constitution. The new democratic Government is committed to a policy of non-alignment in international relations. It will seek friendship with all nations and strive for international peace. I appeal to all government to mobilize public opinion in their respective countries against the brutal genocide in Bangladesh.

The Government under Sheihk Mujibur Rahman is sovereign legal Government of Bangladesh and is entitled to recognition from all democratic nation of the world.”

[২৭ মার্চ ১৯৭১ কালুর ঘাটে স্থাপিত স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র থেকে শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষ থেকে মেজর জিয়াউর রহমানের পাঠ করা স্বাধীনতার ঘোষণা।]


১৯৭১এ  বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর অতিক্রান্ত চার দশকেরও বেশি সময়। মধ্যবর্তী এই সময়ে অনেক ভাঙাগড়ার মধ্যে দিয়ে এগিয়ে চলছে বাংলাদেশ। সেই এগিয়ে চলার পথে রাষ্ট্রক্ষমতার দখল নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলির মধ্যে নিরন্তর দ্বন্দ্ব ও সংঘাত, ব্যক্তিগত উচ্চাভিলাষ, সামরিক শাসন, ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রেখে জনগণকে বিভ্রান্ত করার উদ্দ্যেশ্য নিরন্তর ইতিহাসের বিকৃতি ঘটানো, সাম্প্রদায়িক সংঘাতের  মাধ্যমে অস্থিরতা সৃষ্টির প্রয়াস, স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান স্বীকৃত- রাষ্ট্রের  ধর্মনিরপেক্ষতা থেকে সরে এসে ইসলামী রাষ্ট্র গঠন প্রভৃতি নানান ওঠা পড়ার মধ্যে দিয়েই আজকের বাংলাদেশ।

বস্তুত স্বাধীন বাংলাদেশের মূল ইতিহাসই হল রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের জন্যে বিভিন্ন গোষ্ঠী ও নেতানেত্রীর মধ্যে পারস্পরিক দ্বন্দ্ব ও রক্তক্ষয়ী সংঘাতের ইতিহাস। আর সেই ইতিহাসের শুরুও স্বাধীনতার ঊষালগ্ন থেকেই।  ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার গঠনের একেবারে শুরু থেকেই এর পরিচয় পাওয়া যায়। সেই অস্থায়ী সরকারের প্রধানমন্ত্রী, সুদক্ষ সংগঠক ও জাতীয় নেতা তাজউদ্দিন আহমেদের কার্যকালের প্রথম থেকেই এর আঁচ পাওয়া যেতে থাকে। বিশিষ্ট গবেষক কথা কবিতা,  তাঁর ‘বিজয়ের মাস- ফিরে দেখা’ সুদীর্ঘ প্রবন্ধে এই বিষয়ে লিখছেন, “৩ এপ্রিল তাজউদ্দিন ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করেন। প্রথমেই ইন্দিরা গান্ধী জিজ্ঞাসা করেন স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার গঠন করা হয়েছে কি না। তাজউদ্দিন এই প্রশ্নের জবাব দেয়ার সময় উপস্থিত বুদ্ধি প্রয়োগ করেন। তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে জানান, ২৫/২৬ মার্চের রাতেই বাংলাদেশকে স্বাধীন ঘোষণা করে একটি সরকার গঠিত হয়েছে। শেখ মুজিব সেই স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের রাষ্ট্রপ্রধান, তিনি প্রধানমন্ত্রী এবং অন্যান্য সহকর্মীরা তার মন্ত্রিসভার সদস্য। বর্তমানে শেখ মুজিবের অনুপস্থিতিতে সব সদস্যের অনুমতিক্রমে তিনি সার্বিক দায়িত্বে আছেন। ঐ মুহূর্তে তাজউদ্দিনের এই কথা বলা ছাড়া উপায় ছিল না। কারণ, একটা দেশের প্রধানমন্ত্রী তো আর এমন এক সদস্যের সাথে কথা বলবেন না, যে সদস্যের নিজ দেশের সরকারের অস্তিত্ব নেই। তিনি কথা বলবেন সেই দেশের সরকার বা সরকারের প্রতিনিধির সাথে। তাজউদ্দিন নিজেকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পরিচয় দিয়ে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি আদায় করে নেয়ার ফলে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে প্রবল গতি সঞ্চারিত হয় এবং মুক্তিসংগ্রাম এক নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করে। কিন্ত এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে দলীয় কোন্দল ও নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব অ্নিবার্য হয়ে উঠে। যা মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে এবং মুক্তিযুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও দীর্ঘ সময় সমগ্র রাজনীতিকে বিরাটভাবে প্রভাবিত করে রাখে”।

মুক্তিযুদ্ধের সময় যখন সকল নেতৃবৃন্দের একসাথে জোটবদ্ধ থেকে যুদ্ধ পরিচালনা করার প্রয়োজন ছিল, তখন থেকেই ক্ষমতা দখলের এই দ্বন্দ্ব বাংলাদেশের পক্ষে ক্রমেই অভিশাপ হয়ে দেখা দিয়েছ বারবার। ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সাথে বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদের এই প্রথম সাক্ষাৎকারের সময় থেকেই দলীয় নেতৃবৃন্দের মধ্যে যে দ্বন্দ্ব বিবাদ দেখা দেয় তা তলায় তলায় ক্রমেই ধুমায়িত হতে থাকে। এই প্রসঙ্গে আহমেদ রেজা তাঁর ‘একাত্তরের স্মৃতিচারণ’ গ্রন্থে লিখছেন, “...[১৯৭১ এর] জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাতে পশ্চিমবঙ্গের বাগডোগরায় আওয়ামী লীগের প্রদেশিক ও জাতীয় সংসদ সদস্যদের এক যুগ্ম সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলো। আওয়ামী লীগের সংঘাতমুখী বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে সমন্বয় সাধনই এই সম্মেলনের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল। স্বাধীনতা সংগ্রামের স্বার্থে আওয়ামী লীগের এই অন্তর্ঘাতী দ্বন্দ্বের অবসান এ সময়ে অপরিহার্য হয়ে পড়েছিল নিঃসন্দেহে। এই প্রেক্ষিতে সম্মেলনের এই পদক্ষেপ সুবিবেচন প্রসূত হয়েছিল।

সম্মেলনের সুযোগ নিয়ে তাজউদ্দিন বিরোধী মহল পূর্ণোদ্যমে তৎপর হয়ে উঠলো। প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে তাজউদ্দিন আহমেদকে অপসারণের জন্য এমন কি সদস্যদের দস্তখত সংগ্রহ অভিযান পর্যন্ত শুরু হয়ে গেল। সেই সাথে আওয়ামী লীগের অংশবিশেষ প্রধানমন্ত্রী সম্পর্কে নানারকম  কুৎসা রটনায়েও পঞ্চমুখ হয়ে উঠল। সামরিক বাহিনীর প্রধান কর্নেল ওসমানীর ত্রুটি বিচ্যুতি দায় দায়িত্বও বিরামহীন ভাবে প্রধানমন্ত্রীর ওপর চাপানো হলো। যা’হোক এসব প্রচেষ্টা শেষ পর্যন্ত ফলপ্রসূ হলো না। সম্মেলন শেষে দেখা গেল প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদের অবস্থান অপেক্ষাকৃত সুদৃঢ় হয়েছে, এবং পক্ষান্তরে বিরোধী তৎপরতা অনেকাংশে হীনবল হয়ে পড়েছে। সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রক্ষাপটে রণাঙ্গনের বস্তুনিষ্ট মূল্যায়ন করে প্রধানমন্ত্রী দীর্ঘ বক্তব্য পেশ করলেন। তাঁর বক্তব্যে জনগণের আশা-আকাঙ্খার প্রতিফলন ছিল সুনিশ্চিত। ফলে উপস্থিত সংসদ সদস্যরা তাঁর নেতৃত্বে বিপুলভাবে আস্থা জ্ঞাপন করলেন। যা’হোক তাজউদ্দিন-বিরোধী মহল অনেকাংশে হীনবল হয়ে পড়লেও, তাদের তৎপরতার অবসান হলো না এই সম্মেলনে”।

মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলির ইতিহাস পর্যবেক্ষণ করলে স্পষ্ট হয় আওয়ামি লীগের অভ্যন্তরীন এই ক্ষমতার দ্বন্দ্বকে  কি ভাবে কাজে লাগিয়ে মুক্তিযুদ্ধকে ব্যর্থ করতে স্বচেষ্ট ছিল সেসময়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিরোধী মার্কীণ শক্তি ও তার দোসর চিন ও পাকিস্থান। তাদের মূল কাজই ছিল সূক্ষ্ম যুক্তি তর্ক সহকারে রুশ-ভারত-তাজউদ্দিন বিরোধী প্রতিক্রিয়া সৃষ্টির করে জনগনকে বিভ্রান্ত করে স্বাধীনতা যুদ্ধের গতি স্তব্ধ করা। আর এই বিষয়ে তাদের সহায়তা করতে থাকে বিভিন্ন ক্ষমতালোভী গোষ্ঠীগুলি। দুঃখের বিষয়, বাংলা ও বাঙালির ইতিহাসে যে মুক্তিযুদ্ধ জাতি হিসেবে বাঙালির সবচাইতে গৌরবজনক অধ্যায়, সেই পর্বও কলঙ্কমুক্ত নয়। বস্তুত সেই পর্বে তাজউদ্দিন আহমেদ এর ন্যয় একনিষ্ঠ দেশসেবক ও সুদক্ষ প্রশাসক প্রশাসনের শীর্ষে না থাকলে মুক্তিযুদ্ধের গতিপথ ব্যহত হয়ে স্বাধীনতার বিষয়টিই হয়তো বানচাল হয়ে যেতে পারতো। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের অন্যতম নেতা মোস্তাক, শেখ মণি ও অন্যান্যরা যেভাবে মার্কীণদের সাথে যোগাযোগ রেখে পাকিস্তানের সাথে খিড়কীর দরজা দিয়ে স্বায়েত্বাশাসন মূলক আপোষরফায় ব্যাগ্র হয়ে উঠেছিলেন তা যদি সাফল্যের মুখ দেখতো। স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসের শুরু এইখান থেকেই। ক্ষমতালাভের এই লোভ, গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের পারস্পরিক সংঘাত বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে কণ্টকময় করে তুলেছে সেই প্রথম দিন থেকেই।

১৯৪৭ এ যুদ্ধবিদ্ধস্ত বৃটিশরা ভারতভাগ করে উপমহাদেশের বৃটিশভক্ত নেতৃবৃন্দ ও রাজনৈতিক দলগুলির সাথে ক্ষমতার ভাগবাঁটোয়ারা করে চলে যাওয়ার পর থেকেই এই অঞ্চলে প্রভাব বাড়াতে থাকে সদ্য যুদ্ধ জয়ী প্রবল শক্তিধর মার্কীণযুক্তরাষ্ট্র। আর তাদের এই প্রভাব বাড়ানোর পরিকল্পনার জন্যেই দরকার হয় পাকিস্তানের মতো সামন্ততান্ত্রিক ও সাম্প্রদায়িক একটি রাষ্ট্রের। তার বুঝতে পেরেছিল পাকিস্তানকে সহজেই তাদের তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করা যাবে। আর সেইটা করতে পারলেই দক্ষিণ এশিয়ায় তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভুত্ব কায়েম করতে বিশেষ সুবিধে হবে। আর ঠিক সেই কারণেই পাকিস্তানকে তারা প্রথমাবধি সামরিক সাহয্যে পুষ্ট করতে থাকে। যে কাজে সামরিক অস্ত্রসম্ভার বিক্রীর একটি স্থায়ী বাজারে পরিণত হয় পাকিস্তান। তাই মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বভাবতঃই মার্কীণ পরাশক্তি সর্বোতভাবে পাকিস্তানের বড়ো ভাই হয়ে বরাভয়ের হাত বাড়িয়ে দেয় পাক হানাদার বাহিনীর প্রতি। এই কারণেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা বানচাল করতে তারা রাষ্ট্রপুঞ্জে বারবার স্বচেষ্ট হয়।  এবং তারা তাদের তৎকালীন মিত্রদেশ চীনকে বিশেষ ভাবেই পাশে টেনে নেয় নিজেদের এই উদ্দেশ্য চরিতার্থতায়। আর এই উদ্দেশ্যেই তারা তলায় তলায় তৎকালীন আওয়ামী লীগের মার্কীণপন্থী ও ক্ষমতালোভী নেতৃবৃন্দের সাথে যোগাযোগ রাখতে থাকে, যাতে মুক্তিযুদ্ধকে ভেতর থেকেই সাবোতাজ করা সহজ হয়। কিন্তু এই কাজে তারা মূলত তিনটি বাধার সম্মুখীন হয়। এক, অস্থায়ী প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিনের প্রখর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও প্রশাসক হিসেবে তার অসাধারণ দক্ষতা ও কুটনৈতিক দূরদর্শীতা। দুই, ভারতবর্ষের তৎকালীন ক্ষমতাসীন নেতৃবৃন্দের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গী ও অর্থনৈতিক দূরদৃষ্টি। তারা বুঝতে পেরেছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা ভারতের পক্ষে বিরাট আশীর্বাদস্বরূপ। দেশের দুই প্রান্তে পাকিস্তানকে সামলানোর থেকে একপ্রান্তে সামলানো অনেক বেশি যুক্তিযুক্ত, এবং স্বাধীন বাংলাদেশ ভৌগলিক কারণেই স্বাভাবিক ভাবে ভারতীয় পণ্যের একটি স্থায়ী ও বিশাল বাজারে পরিণত হবে। ফলে এই দুই কারণেই ভারতবর্ষ বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে সর্বতো ভাবে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল।  তিন, সেই সময়ের ঠাণ্ডাযুদ্ধ পরিস্থিতির বিশ্বব্যাপি ক্ষমতার ভারসাম্য। অবশ্যই সেইসাথে দেশবাসীর স্বাধীনতা লাভের অদম্য বাসনা।

তাই ১৯৭১ এর ১৬ই ডিসেম্বর পাকহানাদর বাহিনীর পরাজয় সম্ভব হয়। ভগ্নমনোরথ হয়ে ফিরে যেতে হয় মার্কীণ নৌবাহিনীর সপ্তম নৌবহরকে, কারণ সময়মতো ভারতমহাসাগর ও বঙ্গোপসাগরে সোভিয়েত ডুবোজাহাজের একটি বাহিনী আগে থাকতেই মোতায়েন থাকাতে মার্কীণ নৌবহর আর বাংলাদেশের উপকুলে পৌঁছাতে পারেনি। কিন্তু সুচতুর মার্কীণ শক্তি প্রাথমিক পরাজয়ের ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে খুব বেশি সময় নেয় নি। তারা জানতো দেশ স্বাধীন হলেও, ক্ষমতালোভী গোষ্টীগুলির অন্তর্দ্বন্দ্ব এবং উচ্চাভিলাষী নেতৃবর্গের মধ্যে পারষ্পরিক সংঘাত অনিবার্য। এবং সেই সংঘাত সময়ের সাথে বাড়বে বই কমবে না। আর সেই সুযোগেই বাংলাদেশের ওপর মার্কীণ প্রভাব বিস্তার করা ও দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও অর্থনীতিকে মার্কীণ স্বার্থে পরিচালিত করা খুবই সহজ হবে।  আর যে দেশের  শিক্ষার হার যত কম ও দারিদ্র্য যত বেশি, সেই দেশে এই সংঘাত তত তীব্র হয় এমনিতেই। এবং ঠিক সেই সুযোগেই প্রথম বলি হলেন বঙ্গবন্ধু!  আর মসনদে গদিয়ান হলেন বরাবরের মার্কীণপন্থী উচ্চাভিলাষী সমরনায়ক জেনারেল জিয়া। সেই যিনি বঙ্গবন্ধুর নামে প্রথম স্বাধীনতার ঘোষণাটি পাঠ করেন ২৭শে মার্চ ১৯৭১।

শুরু হল বাংলাদেশের ইতিহাসে ইতিহাস বিকৃতির এক নতুন অধ্যায়। আর সেই অধ্যায়ের সূত্রেই আজ সারাদেশের অন্যতম বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু, স্বাধীনতা এল কার হাত দিয়ে জেনারেল জিয়া না বঙ্গবন্ধু? নিয়তির পরিহাসে আজ এই বিতর্কেই দেশ কার্যত দুই ভাগ! এবং বিভিন্ন ভাবে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাসকে ধামাচাপা দেওয়ার অপচেষ্টা হয়েছে বিগত চারদশক ব্যাপী সময়সীমাতেই। বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের পথে জাতির অভ্যন্তরেই সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়ে প্রথমাবধি যারা দেশের স্বাধীনতার বিরোধীতা করে এসেছিল, সেই মৌলবাদী শক্তি জামাতে ইসলামী ও পাকহানাদার বাহিনীর দোসর রাজাকার আলবদর আলশামস বাহিনীর সদস্যরা প্রেসিডেন্ট জিয়ার আমলেই নতুন করে ক্ষমতার বৃত্তে সক্রিয় হতে শুরু করে। পরবর্তীতে এরশাদের আমলে বাংলাদেশের সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষ ঘোষণাটি বাতিল করে ইসলামী রাষ্ট্র করায় এই মৌলবাদী শক্তিগুলি অতি দ্রুত সারা দেশেই তাদের প্রভাব বিস্তার করতে থাকে। আরও দুঃখের বিষয় দীর্ঘ সামরিক অপশাসনের অবসানের পর গণতন্ত্রের পুনঃ প্রতিষ্ঠার লগ্ন থেকেই দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলি এই মৌলবাদী শক্তিগুলির সাহায্য নিতে থাকে নির্বাচনের বৈতরণী পার হওয়ার জন্যে। এবং এইখানেই মার্কীণ অপশক্তির হাসি চওড়া থেকে আরও চওড়া হতে থাকে। বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের মূল অর্জন থেকে আজকের বাংলাদেশেকে এই ভাবে পথভ্রষ্ট করতে সক্ষম হয়ে মার্কীণশক্তি আবারও প্রমাণ করেছে ওস্তাদের মার শেষ রাতে। আর তারই প্রমাণস্বরূপ বাংলাদেশের বর্তমান সরকার গঠিত আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইবুনালের বিচারে রাজাকাররা দোষী প্রমাণিত হলে সারাদেশে রাজাকারদের মুক্তির দাবীতে রক্তগঙ্গা বয়ে যায় সেই বাংলাদেশেই, যে দেশ ত্রিশলক্ষ প্রাণের  বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছিল চারদশক আগে!

হ্যাঁ এইভাবেই বাংলাদেশের মৌলবাদী শক্তিগুলিকে শক্তিশালী করে তোলায় বিরাট ভুমিকা মার্কীণ যুক্তরাষ্ট্রের। প্রধানত পর্দার আড়াল থেকে তাদের মদতেই পেট্রডলারের বন্যায় বাংলাদেশে মৌলবাদী শক্তি হিসেবে জামাত এখন এক বড়ো বাস্তব। সমাজদেহের অনেক গভীরেই তাদের শিকড় ক্রমশ চওড়া থেকে আরও চওড়া হয়ে উঠেছে। তাই রাজনীতির আঙিনাতেও তাদের দাপট ক্রমবর্ধমান। বস্তুত এই ভাবেই ইঙ্গমার্কীণ শক্তি এশিয়া মহাদেশ জুড়ে মৌলবাদের চাষ করে। আর তাই রাজাকারদের ফাঁসি ও জামাতকে নিষিদ্ধ করার দাবীতে শাহবাগ আন্দোলন যখন দেশবিদেশ জুড়ে বিপুল উন্মাদনার সৃষ্টি করে, তখন বৃটিশ বিদেশমন্ত্রক থেকে সরাসরি বলে দেওয়া হয়, তারা কোনো সংগঠন নিষিদ্ধ করাকে সমর্থন করে না। বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের কাছেও বার্তাটি স্পষ্ট পৌঁছিয়ে গিয়েছিল। আর তাই শাহবাগ আন্দোলন ছত্রভঙ্গ হলেও জামাত কিন্তু আজও নিষিদ্ধ হয়নি। এটাই বর্তমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক অবস্থা। পাঠক স্মরণে রাখতে পারেন এই ইঙ্গমার্কীন শক্তিই কিন্তু বিশ্বজুড়ে নানান সংগঠনকে পর্দার আড়াল থেকে গড়ে তোলে, আর কার্যসিদ্ধি হয়ে গেলেই নিষিদ্ধ ঘোষণা করে সেই দেশে সৈন্যসামন্ত পাঠায়। যার সাম্প্রতিকতম উদাহরণ আলকায়দা ও তালিবান। আর বাংলাদেশের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ যারা আন্তর্জাতিক রাজনীতির গতিপ্রকৃতি সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল তারা কিন্তু এখনই সিঁদুরে মেঘ দেখছেন গভীর ভাবে।

বিশ্বরাজনীতিতে ঠাণ্ডাযুদ্ধের অবসানের পর ধর্মীয় মৌলবাদই ধনতান্ত্রিক সাম্রাজ্যবাদের সবচেয়ে বড়ো কার্যকরী হতিয়ার। আর এর প্রমাণ আমরা দেখেছি মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক অতীতে ও বর্তমান নানান ঘটনা প্রবাহে। এখন ভারতীয় উপমহাদেশে যদি এই মৌলবাদের চারা লাগানো যায় তবে দীর্ঘমেয়াদী ভাবে ইঙ্গমার্কীণ শক্তির সমরাস্ত্র বিক্রীর বাজারটা আরও ফুলে ফেঁপে উঠবে সন্দেহ নাই। নিজেদের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করে তোলার এমন সুবর্ণ সুযোগ তারা ছাড়বে কেন? বিশেষত গোটা উপমহাদেশেরই ক্ষমতারবৃত্তে যখন তাদেরই বিভিন্ন প্রতিনিধিরা সদা সক্রিয়! তাই সেই চারা গাছ তারা বহু পূর্বেই লাগিয়েছেন। পাকিস্তানের মতো দেশে সেই চারা গাছ এখন মহীরূহে পরিণত। আর ভারত ও বাংলাদেশে তা ক্রমেই ডাঁটো হয়ে উঠছে। আর ঠিক এইখানেই আজ বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবসের মূল প্রাসঙ্গিকতা। জাতি কি পারবে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশকে আদৌ সার্থক করে তুলতে? জাতি কি পারবে মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকারগুলিকে সত্যি করে তুলতে? জাতি কি পারবে প্রবল পরাক্রান্ত ইঙ্গমার্কীণ শক্তির দূরভিসন্ধিকে পরাস্ত করে দেশকে রাজাকার জামাত মুক্ত করে ধর্মীয় মৌলবাদকে চিরকালের মতো কবর দিতে? জাতি কি পারবে ধর্মান্ধতা ও সাম্প্রদায়িকতার অভিশাপ থেকে গেটা দেশকে মুক্ত করে উন্নতবিশ্বের সমকক্ষ হয়ে ওঠার পথে পা রাখতে? এই সকল প্রশ্নের উত্তরগুলি কিন্তু খুঁজে পেতে হবে সমগ্র জাতিকেই! তবেই স্বাধীনতাদিবস পালনের মূল সার্থকতা!

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত