ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা ও আমরা


মানুষের সমাজ সভ্যতা সংস্কৃতির বিকাশে সাম্প্রদায়িক ধর্মের ভুমিকা নিয়ে কোন সংশয় বা বিতর্ক উঠতেই পারে না। মানুষের ইতিহাস সাম্প্রদায়িক ধর্মের উদ্ভব বিকাশ ও বিস্তারের ইতিহাস। এখানে প্রথমেই বলে রাখা ভালো, ধর্ম ও রিলিজিয়ন কিন্তু দুটি আলাদা বিষয়। অধিকাংশ আলোচনায় আমরা যেটি খেয়াল রাখি না। ধর্ম কোন গোষ্ঠীবদ্ধ সম্প্রদায় বিশেষের জীবনচর্চার দৈনদিন সংস্কৃতি নয়। ধর্ম ব্যক্তিমানুষের জীবন জিজ্ঞাসা, তার জগত ও জীবন সম্পর্কে ধ্যানধারণার বিবর্তন ও বিকাশের রাজপথ। ধর্ম ব্যক্তি মানবের বৌদ্ধিক চর্চার নান্দনিক পরিসর। ধর্ম মানুষকে সমদর্শী হয়ে উঠতে প্রয়োজনীয় শক্তির জোগান দেয়। কিন্তু রিলিজিয়ন গোষ্ঠীবদ্ধ মানুষের সাম্প্রদায়িক জীবন সংস্কৃতি। রিলিজিয়ন বিভিন্ন মানুষকে একটি সাধারণ অভিন্ন সংস্কৃতির ধারক ও বাহক করে তোলে। এইখানেই রিলিজিয়নের সার্থকতা।  রিলিজিয়নের বাংলা প্রতিশব্দ না থাকায় আমাদের আলোচনার সুবিধার্থে, আমরা  রিলিজিন বলতে সাম্প্রদায়িক ধর্মই বলবো। অর্থাৎ এই প্রবন্ধের আলোচনার বিষয় সাম্প্রদায়িক ধর্ম। ধর্ম নয়।


আবহমান কাল থেকেই প্রতিটি সাম্প্রদায়িক ধর্ম বিভিন্ন মানুষকে তাদের নিজেদের একটি অভিন্ন সাম্প্রদায়িক সংস্কৃতির শৃঙ্খলে আবদ্ধ করতে তৎপর। আর এই নিয়েই বিভিন্ন ধর্মের মধ্যে পারস্পরিক দ্বন্দ্ব বিরোধ ও বিদ্বেষ। প্রতিটি সম্প্রদায়েরই দাবি তার সাম্প্রদায়িক সংস্কৃতি ও জীবন ধারাই সর্বশ্রেষ্ঠ। আর সেইখান থেকেই ভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সম্বন্ধে অশ্রদ্ধার জন্ম। পরস্পরের প্রতি বিদ্বেষ বিরোধাভাব ও সময় বিশেষে পারস্পরিক হানাহানি। এইভাবেই মানুষের সমাজ ও সভ্যতার ইতিহাসের বিবর্তনের ধারায় সাম্প্রদায়িক ধর্মগুলির ব্যপক প্রভাব রয়ে গিয়েছে। কিন্তু আমাদের আলোচনার পর্ব সাম্প্রতিক সময়। সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বরাজনীতিতে সাম্প্রদায়িক ধর্মের তাস খেলার যে প্রচলিত ধারার সৃষ্টি হয়েছে আমরা সাধারণ জনগণ তার প্রভাবে কিভাবে আবর্তিত হয়ে চলেছি, এই লেখার সেটিই মূল বিষয়।

মিডিয়া নিয়ন্ত্রিত বর্তমান বিশ্ব বন্দোবস্তে এক একটি অঞ্চল ভিত্তিক পরিসরে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ সৃষ্টি করে রাজনৈতিক ক্ষমতা বিস্তারের যে অশুভ প্রবণতা শুরু হয়েছে, আমরা ব্যক্তি মানুষ তার প্রভাবে এতটাই প্রভাবিত হয়ে পড়ি যে আমাদের খেয়ালই থাকে না আমরাও কিভাবে সাম্প্রদায়িক মানসিকাতার শৃঙ্খলে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ছি ধীরে ধীরে ক্রমান্বয়ে। আর সেই পথে আমাদের আজন্ম লালিত সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীচেতনা বিশেষভাবেই সহায়ক হয়ে ওঠে। বস্তুত রাজনীতির রঙ্গমঞ্চের কারবারিরা আমাদের এই আজন্ম লালিত গোষ্ঠীবদ্ধ সাম্প্রদায়িক আবেগকেই মূলধন করে তাদের কার্যসিদ্ধির পাশার দান দিতে থাকে। কিন্তু এতো গেল রাজনৈতিক কূটকৌশল~ ক্ষমতা বিস্তারের স্বার্থে। কিন্তু আমরা সাধারণ মানুষরা এই রাজনৈতিক শক্তিগুলির  প্রভাবের শিকার হইই বা কেন? হই কারণ আমরা আমাদের চলাচলের পরিসরে আমাদের জীবন যাপনের পরিসরে আমরা আমাদের গোষ্ঠীচেতনার বাইরে বেরোতে পারি না সহজে। আর এই গোষ্ঠীচেতনা চিরকালই ধর্মীয় সাম্প্রাদয়িকতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ এবং আজকে অনেকটাই মিডিয়া নিয়ন্ত্রিত। ফলে আমাদের পক্ষে চট করে এর বাইরে আসা খুবই মুশকিল।

এখানেই প্রতিটি সাম্প্রদায়িক ধর্মের প্রতিবন্ধকতা। প্রতিটি রিলিজিয়নই মনুষের ব্যক্তিসত্ত্বাকে খর্ব করে রাখার বিষয়ে সদা তৎপর। ব্যক্তিসত্ত্বার সম্পূর্ণ উদ্বোধনে এই গোষ্ঠীভিত্তিক ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা সবচেয়ে বড়ো প্রতিবন্ধক। কোন একটি সাম্প্রদায়িক ধর্মীয় গোষ্ঠীর বিধিবিধানকে স্বীকার করলেই অন্য গোষ্ঠীগুলির মানুষজনকে আর আপন আত্মীয় বলে অনুভব করা সম্ভব নয়। কারণ প্রতিটি গোষ্ঠীরই দাবি তার ধর্মই একমাত্র মানবিক ধর্ম, এবং সর্বশ্রেষ্ঠ। অন্য সকল ধর্মই অবান্তর ও অপ্রাসঙ্গিক। আমরা ভুলে যাই এই যে মানসিকতা, বা শিক্ষা, তা কখনোই অনুসরণ যোগ্য নয়। বিশ্বমানবতার বিরুদ্ধেই সদা সক্রিয় এই মানসিকতা। আমরা আরও একটু এগিয়ে দেখলে বুঝতে পারবো, আসলেই এই মানসিকতাই সাম্রাজ্যবাদেরও গোড়ার কথা। আমার সাম্রাজ্যই শেষ কথা। বাকি সব সাম্রাজ্যকেই গ্রাস করার মানসিকতার জন্মও এই মানসিক অবস্থান থেকে। সাম্প্রদায়িক ধর্মীয় সংস্কৃতিও সেইরকমই সাম্রাজ্যবাদী মানসিক অবস্থান থেকেই কাজ করে চলে। অন্য ধর্মীয় বিশ্বাসের মানুষের কাছে, আপন ধর্মীয় বিশ্বাসের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করে তাদেরকেও ধর্মান্তকরণের মাধ্যমে নিজ ধর্মীয় গোষ্ঠীভুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হয় এইভাবেই।  এইভাবেই বিশ্বের সকল প্রধান ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলির বিস্তার ঘঠেছে।

রাজনৈতিক সাম্রাজ্যবাদ আর ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক সাম্রাজ্যবাদ পরস্পর হাত ধরাধরি করে চলে। এটা সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বেশি তীব্র হয়ে উঠেছে। আর রাজনীতির এই দাবা খেলায় সবচেয়ে কার্যকরি অস্ত্রই হলো সাম্প্রদায়িকতার তাস। এই অস্ত্রটির বিপুল সাফল্যের একটিই কারণ, আমরা ব্যক্তি মানুষ হিসাবে অধিকাংশই ভিতরে ভিতরে সাম্প্রদায়িক। আমাদের মনের অজানা গহনে, সেই সাম্প্রদায়িকতার বিষ সুপ্ত থাকে। রাজনৈতিক কূটকৌশল যখন তখন সেই বিষকেই জাগিয়ে তোলে। আর তখনই আমরা মানুষ থেকে বদলিয়ে গিয়ে হয়ে উঠি এক একটি সাম্প্রদায়িক ধর্মীয় গোষ্ঠীর এক একটি বোড়ে। আজকের আন্তর্জাতিক রাজনীতি এই ভাবেই পরিচালিত করে চলেছে আমাদেরকে।

বেশ কতগুলি দৃষ্টান্তসহকারে আলোচনা করলে  বিষয়টি হয়তো একটু পরিস্কার হতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী অপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়ায় রাজাকারদের ফাঁসি চেয়ে উত্তাল হয়ে উঠেছিল বাংলাদেশ। ঢাকার শাহবাগ চত্তরে  হিন্দু মুসলিম নির্বিশেষে বিশেষ করে বাংলাদেশের যুবসম্প্রদায়এই দাবিতে সোচ্চার হয়ে উঠেছিল। তাদের এই দাবি সারা বাংলাদেশেই বিপুল প্রভাব ফেলতে শুরু করেছিল। দানা বাঁধতে চলছিল  অসাম্প্রদায়িক একটি আন্দোলনের। যে আন্দোলনের ভবিষ্যৎ অভিমুখ ছিল অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গঠনের। বাংলাদেশকে ইসলামী মৌলবাদের নিয়ন্ত্রণে ধরে রাখতে চাওয়া দেশি বিদেশী শক্তিগুলি শাহবাগ আন্দোলনের এই স্বতঃস্ফূর্ত ব্যাপ্তি ও তীব্রতা দেখে স্বভাবতই নড়েচড়ে বসতে বাধ্য হলো। তার আরও একটি বড়ো কারণ হলো এই যে, শাহবাগ আন্দোলন থেকেই ধর্মনিরপেক্ষ অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের দাবিও গড়ে উঠছিল। দাবি উঠছিল সংবিধান সংশোধন করে মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকারকে নতুন করে ফিরিয়ে নিয়ে আসারও। দেশি বিদেশি মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলি এইখানেই সবচেয়ে বেশি শঙ্কিত হয়ে উঠল। ভীত সন্ত্রস্ত এই শক্তিগুলি আতঙ্কিত হয়ে পড়লো এই ভেবে যে, এই আন্দোলন যদি সারা বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের মধ্যে নবজাগরণ ঘটিয়ে দেয় একবার, তাহলে তাদের আম ও বস্তা দুই হাপিশ হয়ে যেতে পারে। অনেক দিনের নানাবিধ ষড়যন্ত্র ও কুটকৌশলের মাধ্যমেই তারা বাংলাদেশের সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম ইসলামের স্বীকৃতি আদায় করে নিতে পেরেছিল। সেই অর্জন ভেস্তে যাওয়ার আগেই তারা তখন শুরু করলো পাল্টা চাল দিতে। প্রথমেই তারা শাহবাগ আন্দোলনকে নাস্তিকদের ষড়যন্ত্র বলে প্রচার শুরু করে দিল। অশিক্ষিত অল্পশিক্ষিত অর্দ্ধশিক্ষিত ও কুশিক্ষিত জনগনের বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জনের এটাই ছিল সবচেয়ে সহজ পথ। আর সেই পথেই সফল হতে বিভিন্ন মৌলবাদী সংগঠনগুলিকে দ্রুত সক্রিয় করে তোলা শুরু হলো। সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলি পারস্পরিক সমঝতা সহায়তার মাধ্যমে গড়ে তুলল বিস্তৃত নেটওয়ার্ক। দেশি বিদেশী প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিগুলি নানাবিধ উপায়ে মদত দেওয়া শুরু করলো বাংলাদেশের মৌলবাদী ও সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীগুলিকে। শুরু হলো একশান প্ল্যান।

এই একশান প্ল্যানের প্রথম লক্ষ্যই হলো অসাম্প্রদায়িক চেতনার মেধাবী যুবসম্প্রদায়কে প্রথম আঘাতেই কিংকর্তব্যবিমূঢ় করে স্তব্ধ করে দিতে হবে। যাতে তারা সংখ্যায় বৃদ্ধি পেতে না পারে। যাতে তাদের চেতনা দ্রুত ছড়িয়েও না পড়ে। আর এই উদ্দেশ্যেই শুরু হলো একের পর এক ব্লগার নিধনের চাপাতি উৎসব। একশান প্ল্যানের দ্বিতীয় ধাপ হল সারা দেশে মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলিকে দিয়ে সাম্প্রদায়িক বিষ খুব দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়া। যে কারণেই সংখালঘুদের উপর নানাভাবে উৎপীড়ন শুরু। আর এই একশান প্ল্যানের তৃতীয় ধাপ ছিল, জনগণের মনকে নাস্তিকদের বিরুদ্ধে  খেপিয়ে দেওয়া। তাই দেশ ব্যাপি  অসাম্প্রদায়িক চেতানার লেখক বুদ্ধিজীবীদেরকেই নাস্তিকতার লেবেলে চিহ্নিত করে, তাদেরকে জনগণের থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হলো অত্যন্ত সুকৌশলে। ঠিক যে কারণে ব্লগার হত্যা দেশের এক বৃহৎ অংশের জনসমর্থন পেয়ে গেল। গোটা দেশের নজরকে এইভাবেই নাস্তিকতা ও সাম্প্রদায়িকতার দিকে ঘুড়িয়ে দিয়ে শাহবাগ আন্দোলনকে তার অঙ্কুরেই স্তব্ধ করে দেওয়া হলো। সফল ভাবে মোকাবিলা করা হলো, অসম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ে তোলার চেতনাকে।

না এই প্রবন্ধের বিষয় রাজনীতি নয়। এই প্রবন্ধের বিষয় নাস্তিকতা নয়। এই প্রবন্ধের বিষয় শাহবাগ আন্দোলনও নয়। এই প্রবন্ধের বিষয় দেশি বিদেশী শক্তিগুলি কোন শক্তিতে এত সহজে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার তাস খেলে জনগণকে বিভ্রান্ত করে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে পরিচালনাধীন করে রাখতে পারে। আমরা আগেই দেখিয়েছি, ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীগুলি কিভাবে মানুষকে খর্ব করে রেখে তার ব্যক্তিত্বের সম্পূর্ণ উদ্বোধনে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে রাখে। অন্ধ ধর্ম বিশ্বাস। আমার ধর্মই সর্বশ্রেষ্ঠ। আমার ধর্মই শেষ কথা। আমাদের ঈশ্বরই জগতের একমাত্র প্রভু। আমার ধর্ম যারা মানে না, তারাই নিকৃষ্ট।  ঈশ্বরকে না মানলেই সে নাস্তিক। এবং ঘৃণ্য। নাস্তিক মানেই পাপী। এই বোধগুলিই আমাদের সাম্প্রদায়িক ধর্মচর্চার প্রথম ও শেষ কথা। ছোটবেলা থেকেই আমাদের বোধকে অসাড় করে রেখে, এই তত্বগুলিই আমাদের মজ্জাগত করে দেওয়া হয়। আর সেই কারণেই আমাদের মানবিক বোধ ও চেতনা এমনই অসাড় হয়ে থাকে যে, খুব সহজেই ধর্মের কারবারীরা আমাদের বিশ্বাস নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে পারে। তাদের সব কথাই আমরা অন্ধের মতো বিশ্বাস করতে শুরু করি, তাদের নির্দেশকে অনুসরণ করি চোখবুঁজে। এই যে চেতনার অন্ধত্ব, এটাই দেশি বিদেশী প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিগুলির প্রধান মূলধন। সকল সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলি এই মুলধনকে খাটিয়েই নিজেদের আখের গুছিয়ে নেয়। আর সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলি এদেরকে দিয়েই তাদের নানাবিধ রাজনৈতিক পরিকল্পনাগুলির সফল রূপায়ন ঘটায়।

যে যে ভুখণ্ডে সার্বিক অশিক্ষা যত বেশি, লক্ষ করলে দেখা যাবে, সেই সেই ভুখণ্ডেই সাম্প্রদায়িক ধর্মের নানান রকমের প্রতিষ্ঠানের রমরমা তত বেশি। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সেই সেই ভুখন্ডেই সাম্প্রদায়িক অস্থিরতা,ও মৌলবাদী কার্যক্রম তত বেশি করে ঘটানো হয়ে থাকে। দেশি বিদেশী প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিগুলি এই অস্থিরতা ও মৌলবাদ থেকে লাভবান হয় সবচেয়ে বেশি। এবং সেই লাভ অর্থনৈতিক লাভের কড়ি ও গণ্ডায় জমা হতে থাকে পৃথিবীর অন্য কোণে। এটাই সাম্প্রতিক বিশ্বব্যবস্থা। যার প্রাণভোমরা আমাদেরই সাম্প্রদায়িক চেতনার অন্ধত্বে। এই অন্ধত্বের করাল গ্রাসে বন্দি না থাকলে একের এপর এক ব্লগার হত্যার প্রতিবাদেই উত্তাল হয়ে উঠতো আজকের বাংলাদেশ। কিন্তু তা হয় নি। অনেকেই শাহবাগ আন্দোলনের স্বতঃস্ফূর্ততা দেখে উজ্জীবিত হয়ে দেশের যুবশক্তির প্রাণপ্রাচুর্য্যে আশান্বিত হয়ে উঠছিলেন অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কল্পনায়। কিন্তু সমগ্র দেশে সাম্প্রদায়িক ধর্মান্ধতার নিদারুণ বাস্তবতা সম্বন্ধে তাঁদের সত্যইই কোন সুস্পষ্ট ধ্যান ধারণা ছিল না। থাকলে তারা বুঝতে পারতেন, শাহবাগ একটি ক্ষণিকের স্ফূলিঙ্গ মাত্র। আর সেই স্ফূলিঙ্গকে এক ফুঁয়ে নিভিয়ে দেওয়ার মতো শক্তি দেশি বিদেশী প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিগুলির যথেষ্ঠই আছে। আছে বলেই নাস্তিকতার অজুহাতে দেশের বড়ো অংশেরই সমর্থন পেয়ে যায় ব্লগার হত্যার মতো পাশবিক ঘটনাও। ধর্মীয় অন্ধত্বের এই সাম্প্রদায়িক মনোভাবকেই মুলধন করে বিভিন্ন প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি মানুষকে বিভ্রান্ত করে অপদার্থ করে রাখে। এবং সময় সময়ে মানুষকে পাশবিক করে তুলে নানান রাজনৈতিক সমীকরণের সফল প্রয়োগ ঘটিয়ে নেয়।

বাংলাদেশ ছেড়ে এবার দৃষ্টি ফেরানো যাক সাম্প্রতিক ভারতবর্ষে। যে দেশের সবচেয়ে বড়ো প্রশ্ন, রাম মন্দির নাকি বাবরি মসজিদ? যে দেশের বর্তমান সমস্যাগুলির মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে গোরক্ষা ও গোমূত্রসেবন। গরুপাচারকারী সন্দেহেই যে কোন মানুষকে যেকোন স্থানেই পিটিয়ে মেরে ফেলাই নাকি হিন্দুধর্ম রক্ষার অন্যতম উপায়। ভারতীয়ত্বের জায়গায় ক্রমেই জায়গা করে নিচ্ছে হিন্দুত্ব। এবং সকল ধর্মের মানুষকেই নাকি এই হিন্দুত্বকে স্বীকার করে নিয়ে থাকতে হবে এই দেশে। কারণ হিসাবে বলা হচ্ছে হিন্দুত্ব নাকি কোন ধর্ম নয়। এটি একটি দেশীয় জীবন শৈলী। যেখানে ভারত মাতা কি জয় না বললেই সে দেশদ্রোহী। এই যে সংকীর্ণ সাম্প্রদায়িকতা, যাকে জাতীয়তাবাদের মোড়কে মুড়েই পরিবেশনের কার্যক্রম চলছে সারা দেশব্যাপি, সেটা সম্ভব হচ্ছে আমাদেরই মন মানসিকতার অন্তরে সুপ্ত সাম্প্রদায়িক ধর্মবোধের কারণে। অনেকেই বিশ্বাস করেন, ভারতবর্ষ হিন্দুদের। অনেকেই বিশ্বাস করেন মুসলিম মানেই সন্ত্রাসী। অনেকেই আবার নতুন করে মুসলিমদের হিন্দুধর্মে ধর্মান্তরকরণের সপক্ষে সওয়াল করে থাকেন।  এই যে পাকিস্তান বাংলাদেশ মানেই মুসলিমদের দেশ। ভারত মানেই হিন্দুদের দেশ, বাকিরা সবাই সংখ্যালঘু, এই মানসিকতাই ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতাজাত বিদ্বেষ প্রসূত চিন্তা।  সমস্ত প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিগুলিই এই মানসিকতার চিন্তাকে জ্বাল দিতে থাকে ধর্মের আঁচে। আর ছড়িয়ে দিতে থাকে দেশের প্রতিটি কোণে কোণে।  দুঃখের কথা, দেশের অধিকাংশ শিক্ষিত মানুষেরই সমর্থন পেয়ে যায় এই শক্তিগুলি।

এইভাবেই কি শিক্ষিত কি অশিক্ষিত সকল মানুষকেই কার্যত নৈতিক ভাবে বিকলাঙ্গ করে রেখে দেয় সাম্প্রদায়িক ধর্মীয় চেতনা। মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলি সেই সব বিকালাঙ্গদেরকেই হাতিয়ার করে নিজেদের কার্যসিদ্ধি করে নেয়। এখানে সব ধর্মেরই একই রূপ। আর যারা এখনো সুস্থ চেতনার প্রসারে কাজ করে চলেছে নিরন্তর, সেই সব মানুষদেরকে নাস্তিকতার অজুহাতে খুন জখম হত্যা করার এক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে সাম্প্রতিক দশকে। বাংলাদেশের পর ভারতবর্ষেও চলছে এই কার্যক্রম। একদিকে এই সকল মানুষদেরকে হত্যার মাধ্যমে সুস্থ চেতনার অসাম্প্রদায়িক মানুষদেরকে ভীত সন্ত্রস্ত আতঙ্কিত করে স্তব্ধ করে দেওয়া, আর এক দিকে এই হত্যাগুলির প্রতি ধর্মান্ধদের সমর্থন আদায় করার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড: এই দুই ভাবেই চলছে মৌলবাদী রাজনীতির স্বৈরতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার সাম্প্রতিক খেলা। যার জীয়ন কাঠিই হলো আমাদের মজ্জাগত ধর্মান্ধতাজাত সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীচেতনা। এই চেতনাকেই ধর্ম বলে প্রচার করে মৌলবাদীরা। আর তাদের রাজনৈতিক ব্যাপারিরা।  আমরা আমাদের অজান্তেই তাদের হাতের পুতুল হয়ে নাচতে থাকি। আর নিজেদেরকে ধার্মিক মনে করে অনুভব করি আত্মশ্লাঘা।

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত