লোকলজ্জা ও অপরাধ প্রবণতা


বৈধ অবৈধ সম্পর্কের টানাপোড়েন, ব্ল্যাকমেইল ষড়যন্ত্র খুনের সাম্প্রতিক দুটি ঘটনা সংবাদ মাধ্যমের শিরোনামে আলোড়ন ফেলে দিয়েছে। ঘটনার রহস্য সন্ধানে তদন্ত চলছে জোরকদমে! কিন্তু দুটি ক্ষেত্রেই অপরাধী পুলিশের জালে ধরা পড়েছে প্রথমেই।  অর্থাৎ অপরাধীরা কেউই কোন রাজনৈতিক দলের প্রসাদভোগী সেবক নন। রাজনীতির বাইরে, তথাকথিত অপরাধ জগতের বাইরেও সাধারণ মানুষের সামাজিক জীবন, সাংসারিক জীবনের পরিসরে ঘটে চলা অপরাধ ও অপরাধ প্রবণতা বৃহত্তর সমাজেরই প্রতিচ্ছবি মাত্র! বিষয়টা তাই সমাজবিজ্ঞানী সমাজতত্ববিশারদদের এক্তিয়ার ভুক্ত! কিন্তু আমরা যারা সাধারণ ব্যক্তি-মানুষ, বৃহত্তর সমাজের এই অপরাধ প্রবণতা আমাদেরকেও যথেষ্টই বিচলিত করে তুলেছে। সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সংগঠিত অপরাধ ও তার রহস্য নিয়ে আমাদের যে স্বাভাবিক কৌতুহল ও আগ্রহতার বাইরে প্রতিটি ঘটনার সামাজিক তাৎপর্য ও তার গুরুত্ব নিয়ে আমরা কি ঠিক ততটাই বিচলিত? ঠিক যতটা বিচলিত মূল রহস্যের নেপথ্যের আসল কুশীলবদের বিচার ও শাস্তির প্রসঙ্গে? হয়তো না! তাই আমাদের আগ্রহ ও কৌতুহল কেবল এক একটি ঘটনা থেকে পরবর্তী ঘটনার পেছনেই ছুটতে থাকে। কোন ঘটনারই সামাজিক আভিঘাত আমাদেরকে ততখানি নাড়া দেয় না, যতটা দিলে আমাদের সমাজ ভাবনার ভিতটা অনেক বেশি পাকা পোক্ত হয়ে উঠতে পারে।


সমস্যা এইখানেই। আর তাই দিনে দিনে অপরাধ প্রবণতা কেবলই বৃদ্ধিই পেতে থাকে। আমরা দোষ দিই প্রশাসনকে। তারা তাদের দায়িত্বে বেশি তৎপর হলেই সমস্যার সমাধান বলে মনে করতে থাকি আমরা। কিন্তু আমাদের সমাজ সংসারের মূল ক্ষতগুলির প্রতি নজর দিই না সচারচর। ঠিক তেমনই একটা ভয়াবহ ক্ষত এই নরনরীর সম্পর্ক বিন্যাসের সামাজিক ধ্যানধারণা। যে ধ্যানধারণার ভিত্তিতেই আমরা বিচার করতে বসে যাই কোনটা অপরাধ আর কোনটা নয়। কে অপরাধী আর কে নয়! সবসময়ই যে সেই বিচার ভুল হয় বা ঠিক হয় তা কখনোই নয়। কিন্তু আমাদের দৃষ্টিভঙ্গী আটকিয়ে থাকে প্রচলিত কটি বিচার বিশ্লেষণ নীতিবোধের গণ্ডীতেই। সেখান থেকে আমরা কেউই মুক্ত নই। আর নই বলেই সংকট কালে আমরাই হয়তো সংগঠিত করে ফেলি নতুন কোনো অপরাধ সামাজিক বিচারের মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কা থেকেই!

সাম্প্রতিক এই দুটি খুনের ঘটনাই কিন্তু এই সামাজিক বিচারের মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কা থেকেই সংঘটিত। মানুষ তার দূর্বলতম মূহুর্ত্তেই লোকলজ্জার ভয়ে অধিকাংশ অপরাধ ঘটিয়ে ফেলে। মনে করে প্রিয়জনকেও খুন করাই লোকলজ্জার হাত থেকে পরিত্রাণের শেষ উপায়। অর্থাৎ স্বাভাবিক নৈতিকতার প্রশ্নটি, বিবেক দংশনের প্রশ্নটি মানুষের কাছে তখন গৌণ হয়ে পড়ে। বড়ো হয়ে ওঠে লোকলজ্জার ভয়টিই! বস্তুত আমাদের সমাজে অধিকাংশ অপরাধই, (এখানে আমরা রাজনৈতিক ও অপরাধ জগতের সংগঠিত অপরাধকে আলোচনার বাইরে রাখছি অবশ্যই) এই লোকলজ্জার থেকে পরিত্রাণের শেষ উপায় হিসেবেই সংঘটিত হয়ে থাকে। অর্থাৎ এই লোকলজ্জার অশংকাটুকু না থাকলে এই ধরণের অপরাধ প্রবণতা যে হ্রাস পেত, প্রাথমিক ভাবে সেকথাই মনে হয় আমাদের। একথা ঠিকই যে বিষয়টি হয়তো এতটাই একরৈখিক নয়, যে লোকলজ্জার ভয় না থাকলেই সমাজ অনেকটা অপরাধমুক্ত হতো। কারণ সেই বিষয়টি নির্ভর করে অনেকগুলি বিষয়ের পারস্পরিক সম্পর্ক বিন্যাসের সূত্রের উপরই। তবু সাধারণ ভাবে এটাও সত্য যে সামাজিক লোকলজ্জার আতঙ্কই মানুষের দূর্বলতম মূহুর্ত্তে তাকে এমন এমন অপরাধের দিকে ঠেলে দেয়, যা  অন্য সময়ে সে নিজেও হয়তো ভাবতে পারতো না!

সংবাদ প্রবাহের উপর নির্ভর করে এ কথাই মনে হয়; দূর্গাপুরের একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক ম্যানেজারের হাতে তার প্রেমিকা ও শিশু খুনের বীভৎস ঘটনাটিও এই লোকলজ্জার হাত থেকে পরিত্রাণের শেষ উপায় হিসেবেই সংঘঠিত। এমনকি বোম্বাইয়ে মায়ের হাতে কন্যা হত্যার মত বিরলতম ঘটনাটিও আদতে এই লোকলজ্জার হাত থেকেই পরিত্রাণের একমাত্র উপায় হিসেবেই ঘটেছে বলে এখন অব্দি অনুমান করা যায়। সেখানে নিজের বর্তমান স্বামীর কাছে গোপন করা দীর্ঘদিনের গুপ্ত সত্য প্রকাশ হয়ে যাওয়ার আতঙ্কজনিত কারণটিই অধিকতর প্রবল বলে প্রাথমিক ভাবে অনুমান করা হচ্ছে। দূর্গাপুরের এই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের আধিকারিকও এমন ভয়ঙ্কর অপরাধটি নিজের স্ত্রীপুত্রকন্যার কাছে নিজের সৎ ভাবমূর্ত্তিটি অটুট রাখতেই করেছেন বলে প্রাথমিক ভাবে বোঝা যাচ্ছে।  একথাও চোখবুঁজেই বলে দেওয়া যায় লোকলজ্জার ভয়ে সংঘঠিত অপরাধ যত ঘটে জানাজানি বা ধরা পরে তার তুলনায় যৎসামান্যই! ফলে এই যে সামাজিক একটি ক্ষত এর ব্যপ্তি ও গভীরতা কিন্তু অনেকটাই গভীর। একে দুই একজন মানুষের চারিত্রিক ত্রুটি বা মানসিক বিকার বলে বিচ্ছিন্ন ঘটনাক্রম ভাবলে কিন্তু মস্ত ভুল হবে! আর এইখানেই এই ঘটনাগুলি আমাদেরকে সরাসরি এক গভীর প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়।

আমাদের শিক্ষাদীক্ষায় গড়ে ওঠা জীবন প্রণালীতে নৈতিকতা, নীতিবোধ, আদর্শ, বিবেক ইত্যাদির থেকেও লোকলজ্জার আতঙ্কই আমাদেরকে প্রধানত সৎ রাখে জীবনের নানা পর্বে। আমাদের সমাজে এইটিই রূঢ় বাস্তব। আমরা ঠিক ততখানিই সৎ মানুষ, যতটা আমরা লোকলজ্জাকে স্বীকার করি। হ্যাঁ এখানে আইনের চোখরাঙানিরও একটা বিরাট ভুমিকা আছে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে আইনের হাতে ধরা পড়ার মতো পরিস্থিতি তখনই সৃষ্টি হয় যখন লোকলজ্জার ভয়েই মানুষ ঘটিয়ে ফেলে অনভিপ্রেত ঘটনা! তাই আমাদের সততার পেছনে আমাদের সাধু থাকার পেছনে, আমাদের এই লোকলজ্জার আতঙ্কই সর্বপ্রধান ভুমিকা পালন করে। অনেকেই বলবেন, তবে তো ভালোই! সমাজকে সুস্থ রাখার প্রয়োজনেই লোকলজ্জার এই ভুমিকা সাধুবাদ যোগ্য। কথাট আংশিক সত্য সন্দেহ নাই। কিন্তু এইখানেই অন্ধকার জমে আছে সবচেয়ে বেশি। কারণ মানুষের সততা তার সাধুতা যখন তার নীতিবোধ- বিবেকবোধ- আদর্শবোধ সঞ্জাত না হয়ে লোকলজ্জার আতঙ্কের উপরেই গড়ে ওঠে, সমজের ভিত্তির তলায় তখনই জমতে থাকে চোরাবালি। আর আমাদের সমাজে ঘটেছে ঠিক সেটাই। লোকলজ্জা মানুষের স্বাভাবিক লোভ লালসা ভোগবাদী প্রবৃত্তির নিরাময় করতে পারে না কখনোই। অ্যালোপাথী ঔষধির মতো তা সাময়িক উপশমের সহায়ক হতে পারে বড়োজোর। তলায় তলায় আমাদের সকল প্রবৃত্তিই জায়মান থাকে, এবং সময়ে সময়ে আমরা আড়াল আবডালের সুযোগসুবিধে পাওয়া মাত্রই সেই প্রবৃত্তিগুলিই পরিচালিত করতে থাকে আমাদের। সর্বনাশের বীজ অঙ্কুরিত হয় সেই অশুভক্ষণেই। কেননা আমাদের আদর্শবোধ, বিবেকের দীক্ষা, নৈতিকতার দৃঢ়তা কার্যত অপুষ্ট থাকে আমাদের প্রত্যেকেরই জীবনরেখার পরিসরে। তাই যখন তাদের সক্রিয় হয়ে উঠে আমাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করার কথা, সেই সময়ে তারাই অসাড় থাকে কুম্ভকর্ণ নিদ্রায়। এইটাই বাস্তব সত্য।

হ্যাঁ, তাই কোন সমাজ যখন কেবলমাত্র লোকলজ্জার উপর নির্ভর করেই সৎ ও সুসভ্য জীবনপ্রণালীর নিশ্চয়তা সাধন করতে থাকে, বুঝতে হবে পচন ধরেছে সেই সমাজের গোড়াতেই। আর তখনই লোকলজ্জার সামাজিক আতঙ্কই মানুষের দূর্বলতম মূহুর্ত্তে আপাত স্বাভাবিক মানুষকে দিয়েও ঘটিয়ে তুলতে পারে বীভৎসতম অপরাধ। এইখানেই আমাদের সমাজভাবনায় পরিবর্তন আনাটা জরুরী। সামাজিক শিক্ষাদীক্ষার গোড়াতেই জল ঢালতে হবে নতুন করে। লোকলজ্জা নয়, জাগিয়ে তুলতে হবে প্রকৃত আদর্শবোধের বিবেকী নৈতিকতাকেই। সমাজকেও বেড়িয়ে আসতে হবে এই লোকলজ্জার ঘেরাটোপ থেকে। নরনারীর সম্পর্ক বিন্যাসের সমাজ নির্ধারিত পরিসরের গণ্ডীবদ্ধ সীমাটিকে অবলুপ্ত করতে হবে জরুরী ভিত্তিতে। সম্পর্কের বৈধতা অবৈধতার প্রচলিত ধ্যানধারণার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হয়ে প্রশ্ন করতে হবে প্রচলিত ধ্যানধারণাগুলির বৈধতা নিয়েই। নরনারীর ব্যক্তিগত জীবন ও সম্পর্কের বিন্যাস সম্পর্কিত প্রচলিত ধ্যানধারণার মধ্যেই এই অপরাধ প্রবণতার সম্ভাবনাগুলি সুপ্ত থাকে। তাই প্রশ্ন করতে হবে সেই প্রচলিত ধারণার সীমাবদ্ধতাকেই। মনে রাখতে হবে সমাজ কখনো একটি জায়গায় থেমে থাকে না। সামাজিক ন্যায়ের ধারণাগুলিও সতত পরিবর্তনশীল! একসময় কুলীন ব্রাহ্মণের একাধিক পত্নী থাকাটাই সামাজিক আভিজাত্যের নমুনা ছিল যা কালপ্রবাহে আইনের চোখে অপরাধ বলে নির্ধারিত হতে থাকে। ঠিক তেমনই একদিন গৃহস্থবাড়ীর মহিলাদের পরপুরুষের মুখদর্শনও অবৈধ বলে গণ্য হতো। সমাজ আজ সেখান থেকে অনেকটাই অগ্রসর। তাই নারী পুরষের সম্পর্ক বিন্যাসের বিষয়ে সমাজ যত বেশি উদার হবে লোকলজ্জার আতঙ্ক মানুষকে তত কম ভোগাবে। আর সেই আতঙ্কজনিত অপরাধ সংঘটনও তত কমবে। এইটাই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। তাই একদিকে আমাদের শিক্ষাদীক্ষায় আদর্শবোধের বিবেকী নৈতিকতাকে জাগ্রত করে তোলা, অপর দিকে সামাজিক লোকলজ্জার ধ্যানধারণাগুলিকে বিসর্জন দেওয়া ও নরনারীর সম্পর্ক বিন্যাসের বিষয়ে সমাজ সংসারের উদারনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গী গ্রহণ করা ছাড়া এই রকম অনভিপ্রেত অপরাধ প্রবণতা কমানো যাবে না! প্রয়োজন তাই আমাদের দৃষ্টিভঙ্গীর আমূল পরিবর্তনের।

কপিরাইর শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত