পাবলিকে যা খায়


কথায় বলে ‘পাবলিকে যা খায়’। বিনোদন জগতে করে খেতে গেলে সেই মত রসদই সরবরাহ করতে হবে। সেটাই অর্থনীতি মোতাবেক ব্যবসায়িক মুনাফার চাবিকাঠি। আর বঙ্গসংস্কৃতির অঙ্গনে বাংলা ফিল্ম ইনডাস্ট্রির গত সাত দশকের ইতিহাসে সেটাই মূল চালচিত্র। কারণ সিনেমা মূলত অর্থকরী ব্যবসা মাত্র। কিন্তু টিভির কথা কিছু আলাদা। পশ্চিমবঙ্গের টিভি সম্প্রচারের শুরু সরকারী প্রতিষ্ঠান দূরদর্শনের মাধ্যমে। বাংলা সংস্কৃতির অঙ্গনে সে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন। সরকারী প্রতিষ্ঠানের তৎকালীন মিশ্রঅর্থনীতির রাষ্ট্রব্যবস্থায় কলকাতা দূরদর্শনের অনুষ্ঠান সম্প্রচারের প্রথম যুগে মুনাফা অর্জনের বিষয়টি যুক্ত না থাকায় পাবলিকে কি খায় সেটি মুখ্য বিবেচনার বিষয় ছিল না। কিন্তু পরবর্তীতে খোলাবাজার অর্থনীতির যুগে একাধিক সম্প্রচার প্রতিষ্ঠানের পারস্পরিক প্রতিযোগিতার বাজারে, এই ‘পাবলিকে যা খায়’ সেই হিসেবটিই মূখ্য বিবেচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। সেটাই বাজার অর্থনীতির মূলমন্ত্র। আর বাংলার বিনোদনসংস্কৃতির আঁতুর ঘর হিসেবে তখনই আত্মপ্রকাশ এই টিভিসিরিয়াল ঘরানার!


সেই ঘরানাই আপামর বাঙালির দৈনন্দিন বিনোদনের রসদ যুগিয়ে চলেছে তিনশতপঁয়ষট্টি দিন চব্বিশ ঘন্টা। ফলে বাংলা টিভিসিরিয়ালগুলির দিকে একটু নিবিষ্টমনে তাকালেই বাঙালির বিনোদন সংস্কৃতির দৈনন্দিন ধারাটির সম্বন্ধে একটা স্পষ্ট ধারণা গড়ে ওঠে। এবং মজার বিষয় এই তীব্র প্রতিযোগিতার বাজারে টিভির দর্শকদের নিজেদের অনুষ্ঠানে ধরে রাখার উদ্দেশ্যে প্রায় প্রতিটি অনুষ্ঠানই অন্য কোনো না কোনো অনুষ্ঠানের অনেকখানি প্রতিরূপ মাত্র। ফলে বিভিন্ন টিভি চ্যানেল ঘুরে দেখলে দেখা যায়, সেই একই ধরণের অনুষ্ঠানের থোড় বড়ি খাড়া আর খাড়া বড়ি থোড়। আর তাতেই প্রায় সবকটি চ্যানেলই বেশ রমরমিয়ে চলছে। রমরমিয়ে যে চলছে সেটা স্পষ্ট বোঝা যায় বিজ্ঞাপনের অতিরিক্ত ব্যবহারে। বিজ্ঞাপনদাতারা মূলত সেই অনুষ্ঠানেই অর্থব্যায় করেন যে অনুষ্ঠানের জনপ্রিয়তা বেশি। তাই বর্তমান টিভিসিরিয়ালগুলির জনপ্রিয়তার নিরিখে এটি নির্দ্বিধায় বলা যায় ঘরে ঘরে বাঙালির বিনোদনসংস্কৃতির চাহিদা মতোই অনুষ্ঠান সরবরাহ করে ফুলে ফেঁপে উঠছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। এবং সেই সূত্রেই বাঙালির বর্তমান বিনোদনসংস্কৃতির ধারাটিকেও ধরা যায় বেশ স্পষ্ট ভাবেই।

অনেকেই হয়তো বলবেন, টিভিতে কে কি দেখাবে তার উপর আমাদের তো কোন হাত নেই। যা দেখায় তাই দেখতে বাধ্য আমরা। কথাটি আংশিক সত্য। আংশিক এই কারণেই যে, কেবেল টিভি, ডিটিএইচ এর যুগে চ্যনেল নির্বাচন ও অনুষ্ঠান দেখা দর্শকের রিমোট নির্ভর পুরোপুরি। তাই আপনি আমি কি দেখবো সেটি মূলত আমার আপনার রুচি সংস্কৃতি ও আগ্রহের বিষয়। হ্যাঁ আবার একথাও ঠিক যে শতশত চ্যনেল থাকলেও বাংলা চ্যানেল হাতে গোনা কটা মাত্র। বিশেষ করে যেখানে অদৃশ্য কোনো রিমোর্ট কারসাজিতে পাকিস্তান সহ দেশবিদেশের বিভিন্ন চ্যানেল দেখা গেলেও বাংলাদেশের আ-মরি বাংলাভাষার চ্যানেল এবঙ্গে দেখানো বারণ! ফলে এপারের বাঙালির হাতে পড়ে থাকে মাত্র গুটি কয়েক বাংলা চ্যানেল। যার অধিকাংশর মালিকানাই আবার অবাঙালি শিল্পপতিদের হাতে। ফলে বাঙালি কি দেখবে আর দেখবে না তার পুরো নিয়ন্ত্রণও হয়তো নেই বাঙালির হাতে। এই অবস্থায় গুটিকয়েক বাংলা চ্যানেলে যা দেখায় তাই দেখা ছাড়া উপায়ই বা কি?

কিন্তু প্রশ্ন সেই ঘুরে ফিরে একই জায়গায়  ফিরে আসে। গুটিকয়েকই হোক আর অগুন্তিই হোক, চ্যানেলগুলি কিন্তু তাদের ব্যবসায়িক মুনাফার স্বার্থে এমন কিছু দেখাবে না, যাতে দর্শক হারাতে হয়। কারণ দর্শক হারানো মানেই বিজ্ঞাপন হারানো। মুনাফার নিম্নমুখী গতির হাত ধরে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়ে ব্যবসায় গনেশ ওল্টানো। কোনো চ্যানেল কর্তৃপক্ষই সেটি চাইবেন না। ফলে তারা ঠিক সেটাই দেখাবেন যেটার বাজার মূল্য বেশি। অর্থাৎ বাজারে যার চাহিদা সবচেয়ে বেশি। তাই তাদের চ্যনেল চালাতে গেলে প্রথমেই মাথায় রাখতে হয় ‘পাবলিকে কি খায়’; আর সেটাই তাদের মুনাফার চাবিকাঠি। সব চ্যনেলকেই তাই প্রায় একই ধরণের স্টিরিওটাইপ কিছু অনুষ্ঠান সরবরাহ করেই বিনোদনসংস্কৃতির বাজারটি ধরে রাখতে হয়।

আর এইখানেই বঙ্গসংস্কৃতির দর্পনে ভেসে ওঠে আমাদেরই নিজেদের মুখ। ঠিক কি দেখতে চাই আমরা? সারাদিনের যাপিত জীবনের ব্যস্ততার ঘেরাটোপে ব্যতিব্যস্ত হয়ে টিভির রঙিন দৃশ্যাবলীর চলমান প্রবাহে  আমরা হয়তো একটু হাঁফ ছাড়তে চাই। তখন বাস্তব ও বাস্তবতার বাইরে রঙিন বিনোদনের কাল্পনিক অবাস্তবতাও আমাদের কাছে সুখদায়ক হয়ে ওঠে। আর সেইটিই সরবরাহ করার জন্যেই বাংলা টিভিসিরিয়ালের নানান রকমফের। বাস্তব জীবনে যেখানে একান্নবর্তী পরিবারের অবলুপ্তিতে রোজকার পারিবারিক জীবনের একঘেয়েমী আমাদের নিউক্লিয়ার পরিবারগুলিকে গ্রাস করছে দুর্বার গতিতে, সেখানে যৌথ পরিবারের গল্পগুলি বিনোদন মাত্রাকে যে বাড়িয়ে দেবে সেকথা বলাই বাহুল্য।

তাই বাংলা টিভিসিরিয়ালের নাটক মাত্রেই যৌথপরিবারের গল্প।  মূলত চাকুরীজীবি শিল্পবাণিজ্য বিমুখ বাঙালি আমরা যারা স্বাধীন ব্যবসাবাণিজ্যের নিরন্তর ঝুঁকিপূর্ণ পেশাকে এড়িয়ে বাঁধা মাইনের চাকুরিতেই বেশি স্বস্তি পাই, সেই তারাই আবার নাটক নভেলে পাত্রপাত্রীদের শিল্পবাণিজ্যে সফল দেখলে বেশ আমোদিত হই। তাই অধিকাংশ টিভি সিরিয়ালের পারিবারিক গল্পগুলির কেন্দ্রে একটি শিল্পবাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের গাজর ঝোলান‌ো থাকে। যা থেকে তাদের ধনৈশ্বর্যের ঝাঁচকচকে আতিসজ্জের বিভায় আমরা দর্শককুল অভিভুত হই। মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত বাঙালি জীবনের আর্থিক টানাটানির বাস্তবতায় টিভির স্ক্রীনে আমাদের ধনসম্পদের কল্পনাবিভোর স্বপ্নের প্রতিফলন দেখতে পেলে আমরা যে মোহিত হব সেকথাও বলাইবাহুল্য। তাই বাংলা টিভিসিরিয়ালের যৌথপরিবারগুলিও একএকটি ছোটখাটো মাঝারি টাটা বিড়লা গোত্রের হয়ে থাকে। বাঙালি গৃহজীবনের ঘরসংসারের গল্পমাত্রেই শাশুরীবৌয়ের চিরায়ত দ্বন্দ্ব নির্ভর। ফলে বাঙালি দর্শকের বিনোদন মাত্রায় সেই ফর্মুলাটুকু তো থাকতেই হবে, নয়তো দর্শককে ধরে রাখা যাবে কি করে। আবার একথাও ঠিক, টিভিসিরিয়ালের বেশিরভাগ দর্শক বাড়ির মহিলারাই। সংসারের পরিচালন ব্যবস্থায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই যাদের অবস্থান পুরুষের পার্শ্বচর হিসেবেই। তাই তাদের স্বপ্নপূরণের জন্যেই টিভিসিরিয়ালের গল্পগুলিতে মহিলাদেরকেই সর্বশক্তিমান হিসেবে সংসারের পরিচালনার বিষয়ে শেষ কথা বলতে দেখা যায়। এবং অধিকাংশ নাটকেই পুরুষদেরকে প্রায় সংলাপহীন আলাপে অংশগ্রহণ করতে হয়। সেখানেই টিভি সিরিয়ালগুলির বিশেষ জনপ্রিয়তার চাবিকাঠি। আবার বিভক্ত বাংলার টিভিসিরিয়ালের চরিত্র মাত্রেই হিন্দু। যেন আমাদের সমাজ সংসারে অন্য ধর্মাবলম্বী বাঙালির অস্তিত্বই নেই। থাকলেও মাঝে সাঝে তাদের দেখা ‌যায় ধনীগৃহের ভৃত্যগোত্র রূপেই। বরং ইদানীং পশ্চিমবঙ্গের ক্রমবর্ধমান হিন্দীভাষী জনগণের মনোরঞ্জনের জন্যে প্রতি সিরিয়ালেই এক অধটি হিন্দীভাষী চরিত্রের আমদানী বৃদ্ধি পাচ্ছে। সমাজ সংসারে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে হিন্দুধর্মের প্রভাব প্রতিপত্তি যত কমছে, টিভিসিরিয়ালগুলিতে তত বেশি করে হিন্দুধর্মের অলৌকিক প্রভাবের গল্প ফাঁদা শুরু হয়েছে। আর আমরাও তা বেশ উপভোগ করছি সানন্দে। কারণ অলৌকিক ঐশ্বরিক ম্যাজিক্যাল স্বপ্নপুরাণে বাঙালির কল্পনাবিলাস চিরকালীন।  আবার উল্টো দিকে, প্রধানত নিরুপদ্রপ জীবনে অভ্যস্থ বাঙালি দর্শককুলও গল্পের মধ্যে রহস্য রোমাঞ্চের একটু ককটেল চেখে দেখতে বিশেষ আগ্রহী তাই প্রায় সব গল্পেই একজন প্রধান ভিলেনের নানান রকমের উদ্ভট কর্মকাণ্ডের আবর্তে বাকি সব চরিত্রদের ঘুরেপাক খেতে হয় নিরন্তর। যত বেশি ঘুরপাক তত বেশি জনপ্রিয়তা। এটাই আসল রেসিপি।

এই রেসিপিগুলি গড়ে ওঠে আমাদেরই আগ্রহের চাহিদার মাপ অনুসারে। তাই ‘পাবলিকে যা খায়’ মাথায় রাখতে হয় সিরিয়াল প্রযোজকদেরকেই। এখন স্বভাবতঃই প্রশ্ন জাগে, পাবলিকে এইসব আজগুবি মশলা খায় কেন? সেই উত্তর পেতে গেলে তা খুঁজতে হবে আমাদেরই সাংস্কৃতিক চেতনার মধ্যে। যার পরতে পরতে জড়িয়ে আছে আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও তার উত্তরাধিকার। আমরা প্রায়ই বাঙালির সংস্কৃতিচেতনার উৎকর্ষের কথা বলে গর্ব বোধ করে থাকি। যার শুরু সেই বাংলার নবজাগরণের হাত ধরেই। বিশ্বকবি বিবেকানন্দ থেকে সত্যজিত রবিশঙ্কর নিয়ে আমাদের মাতামাতির শেষ নেই। কিন্তু এই মহাপুরুষরা তো ব্যক্তিগত উৎকর্ষতার আবিশ্ব দৃষ্টান্ত মাত্র। তাঁদেরকে বাঙালি জাতির প্রতিচ্ছবি ধরলে নিজেদের সম্বন্ধে আত্মশ্লাঘা জাগে ঠিকই, কিন্তু তার মতো মস্ত বড়ো ভুলও তো আর হয় না। তাঁদের  যেকোনো মহামূল্যবান বাণী বা দিকনির্দেশনার অনুসরণের কথা তুললেই আমরা কত সহজেই না পাশ কাটিয়ে যাই এই বলে যে, সে সব ওনাদের মতো বড়োমাপের মানুষদের পক্ষেই মানা সম্ভব। আমারা সাধারণ মানুষ। ওঁদের মতো মহামানব নই। অর্থাৎ আমাদের সংস্কৃতি এইসব কৃতী বাঙালিদের থেকে ভিন্ন গোত্রের। অথচ তাদেরকেই সাক্ষীগোপাল খাড়া করে বঙ্গসংস্কৃতির বড়াই করতে সর্বদাই মুখিয়ে থাকি আমরাই! এই দ্বিচারিতায় বাঙালির কোনো জুড়ি নেই!

বস্তুত আমাদের সংস্কৃতি ও সাংস্কৃতিক গর্ববোধের ঢাক দুটি একগোত্রের নয়। এক গোত্রের হলে আমাদের দৈনন্দিন সমাজ সংসার থেকে জাতীয় কর্মকাণ্ডের বিস্তৃত পরিসরে সর্বত্র তার নমুনা দেখা যেতো। অর্থাৎ আমাদের মুখের কথা আর হাতের কাজের মধ্যে থাকত না দূর্লঙ্ঘনীয় দূরত্ব। ইতিহাসের ধারা পর্যবক্ষণ করলেই দেখা যায় বাঙালি পাবলিকে কি খায়। আর সেই ধারার সাথে বাঙালি মনীষীদের সাংস্কৃতিক ধারার পার্থক্যটিও খুব সহজেই স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়ে ওঠে। আর সেখানেই দেখা যায়,  আধুনিক বাঙালির বিনোদন সংস্কৃতির জন্ম বটতলার উপন্যাসে আর তার সমৃদ্ধি টালিগঞ্জের সিনেমার হাত ধরে আজকের বাংলা টিভিসিরিয়লের ধারাবাহিক পালায়। আর সেই ফাঁকেই হয়তো পালিয়ে যায় সুস্থ সংস্কৃতিচর্চার অমূল্য সময়।

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত