পঞ্চায়েত নির্বাচন ২০১৮ ও ভারতীয় গণতন্ত্র


পঞ্চায়েত নির্বাচন ২০১৮। রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ। নির্বাচন পর্বের প্রথমেই মনোনয়পত্র জমা দেওয়ার পর্বেই রক্তার্ত রাজ্য। হতাহত মানুষ। গুলিবিদ্ধ তাজা প্রাণ। বোমা বন্দুকের লাইভ মিছিল। এবং যথারীতি নিস্ক্রিয় পুলিশ ও প্রশাসন। আদালতের হস্তক্ষেপে মাত্র ৪ ঘণ্টা বাড়তি সময় লাভ মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার। আরও গুলি আরও মৃত্যু। মৃতদেহ নিয়ে রাজনৈতিক দলের টানাটানি। কোন দলের মড়া! আর তারই মধ্যে প্রায় ত্রিশ শতাংশ আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় শাসক দলের জয়লাভ। যে জয়কে উন্নয়নের জয় বলেই প্রচার করছেন শাসক দলের নেতানেত্রী। এরপরে আছে, নির্বাচন উত্তরপর্বে, বিরোধী প্রার্থীদের কিনে নেওয়া। বিরোধী দলগুলি বুঝতে পেরে গিয়েছে, প্রশাসন ও শাসক দলের ঐক্যবদ্ধ জোটকে প্রতিহত করে অবাধ ও মুক্ত নির্বাচন কিছুতেই সম্ভব নয়। জনগণ ভীত সন্ত্রস্ত! শাসক দলকে ভোট না দিলে গ্রামে টিকে থাকা মুশকিল। একদিকে ভিটে মাটি উচ্ছেদের ভয়, অন্যদিকে প্রাণ সংশয়। সার্বিক এই পরিস্থিতিতে কপাল খুলে গিয়েছে দুষ্কৃতি আর দুর্বৃত্তদের। সন্ত্রাস সৃষ্টির পেশায় ঢালাও অর্থ উপার্জনের ব্যবস্থা। ঘরে ঘরে উন্নয়নের আলো জ্বলে উঠছে দ্রুত হারে। কপাল খুলে গিয়েছে শাসক দলের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের। বিত্ত সম্পদ ফুলে ফেঁপে উঠছে সীমাহীন ভাবে। উজ্জীবিত কর্মী সমর্থকরা ক্ষমতার সাথে থাকার আনন্দে টগবগ করছে। হাত বাড়ালেই কাঁচাটাকার ঝনঝনানি। উন্নয়নের প্রত্যক্ষ সুফল ঘরে তুলতেই ব্যস্ত সকলে। ফলে রাজ্যব্যাপি নিরঙ্কুশ আধিপত্যবাদের বাস্তবায়ন সুসম্পন্ন! যার গালভরা নাম উন্নয়ন। চারদিকে নীল সাদা রঙেই যার অব্যর্থ প্রমাণ।

এখন প্রশ্ন- এই যে বিরোধীশূন্য নির্বাচন ব্যবস্থা কায়েমের প্রবণতা, যাকে উন্নয়নের প্রত্যক্ষ ফল বলেই শাসক দলের দাবি; একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রীয় কাঠামোয়, এই ব্যবস্থা কতটা গণতান্ত্রিক? ত্রিস্তর নির্বাচন ব্যবস্থায় প্রায় ত্রিশ শতাংশ আসনেই বিরোধী দলগুলির প্রার্থীদের মনোনয়ন পত্র জমা দিতেই দেওয়া হলো না। বোমা বন্দুক লাঠি, ধস্তাধস্তি, চোখ রাঙানি, হুমকির দেওয়াল টপকে যাঁরা নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারলেন না, হারালেন তাঁদের গণতান্ত্রিক অধিকার তাঁদের গণতান্ত্রিক অধিকারগুলি যদি এই রকম প্রকাশ্যেই নিরন্তর খর্ব হতে থাকে তবে সেটা গণতন্ত্রেরই মৃত্যুঘন্টা নয় কি? এবং এই প্রবণতা যে আসলেই সংক্রামক, সেটা যতদিন যাবে ততই সুস্পষ্ট হয়ে উঠতে থাকবে। আর এইখানেই আসে পুলিশের ভুমিকা। নাগরিকের গণতান্ত্রিক অধিকারগুলি সুরক্ষিত রাখার দায়িত্ব যাঁদের উপর, তাঁরাই যদি ঠুঁটো জগন্নাথ হয়ে দুষ্কৃতিদের পেছনে থেকে নিরব দর্শকের ভুমিকা পালন করেন তবে আর যাই হোক গণতন্ত্রকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হবে না বেশিদিন।

ফলে এবারের পঞ্চায়েত নির্বাচন মনোনয়ন পর্বেই গণতান্ত্রিক প্রহসনে পরিণত হয়ে উঠেছে। এবং এর প্রভাব কিন্তু সর্বাত্মক ভাবেই দেখা দিতে থাকবে প্রতিদিন। নতুন করে। নিস্ক্রিয় পুলিশ প্রশাসনের নাকের ডগায়, সংবাদ মাধ্যমের ক্যামেরার সামনেই যেভাবে দুর্বৃত্তদের লাগামছাড়া দৌড়াত্ম চলতে থাকল মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার পর্বে, তা এককথায় অভুতপূর্ব। এইভাবে পেশাদার দুর্বৃত্ত দুষ্কৃতীদের অবাধ সন্ত্রাসের লাইসেণ্স দেওয়ার এই রাজনীতি রাজ্যের সামাজিক নিরাপত্তার পরিবেশকেই ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে থাকবে দ্রুতগতিতে। যেখানে রাজনীতির দাবা খেলায় ঠুঁটো জগন্নাথ হয়ে নেতানেত্রীদেরই অধস্তন বোড়ে হয়ে দিন কাটাতে হবে পুলিশকে।

একটি রাজ্যের পুলিশকে যখন শাসকদলের লেঠেলের ভুমিকাতেই দেখা যায় প্রধাণত, তখন জনগণ ও গণতন্ত্র দুয়েরই বিপদ। যে কোন সুস্থ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আদালত ও পুলিশের নিরপেক্ষ অবস্থানের প্রয়োজনীয়তা সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। পুলিশের কাজ যথাযথ ভাবে আইন শৃঙ্খলা রক্ষা করে, প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকারগুলি সুনিশ্চিত করার বিষয়ে প্রশাসন ও আইন আদালতকে সর্বতোভাবে সাহায্য করা। কিন্তু সেই পুলিশকেই যদি সর্বতোভাবে শাসকদলের কথায় ওঠবোস করতে হয় তবে সেটা যে কোন সমাজের পক্ষেই এক ভয়াবহ পরিণতি। দুঃখের বিষয় ১৯৪৭এ দেশ স্বাধীন হলেও পুলিশের উপর শাসকের কর্তৃত্বের ধারাটি কোনদিনও বদলায়নি। বৃটিশ তার লুঠতরাজের স্বার্থে যে পুলিশি ব্যবস্থা কায়েম করেছিল, সেই ব্যবস্থাই বিগত সাত দশক ধরে শাসকদলের স্বার্থে ব্যবহৃত হচ্ছে ক্রমাগত। কংগ্রেস আমল থেকে বাম আমলেও এই ধারা দিনে দিনে পুষ্ট হয়ে উঠেছে। বিস্তার ঘটেছে পরিব্যাপ্ত হয়ে। সাড়ে তিন দশকের শাসন কালে বামফ্রন্টও কংগ্রেসের ধারাটিকেই আরও সুদৃঢ় করে তুলেছিল মাত্র। কোন রকম ভাবেই এই ধারাটির বদল ঘটানোর কথা চিন্তাও করেনি। ফলে পুলিশ হয়ে উঠে শাসক দলেরই ডান হাত। এই বিষয়ে বুর্জোয়া পার্টি ও সর্বহারা সাম্যবাদী পার্টি সবই সমান। কোন রকম পার্থক্য নাই। আর তারই কুফল ফলেছে পরিবর্তনের রাজ্য রাজনীতিতে সর্বাত্মক ভাবে। বাম আমলেও যেটুকু চক্ষুলজ্জা ছিল, পরিবর্তনের ঢক্কানিনাদে আজ সেটুকুও নাই। তাই পুলিশ আজ সরাসরি দলদাসে পরিণত। কিন্তু আজকের এই পরিণতির জন্যে সবচেয়ে বেশি দায় কিন্তু সাড়ে তিনদশক ধরে শাসন ক্ষমতায় বসে থাকা বামফ্রন্টেরই। এত দীর্ঘদিন শাসন ক্ষমতায় থেকেও বামফ্রণ্ট পুলিশকে রাজনীতি নিরপেক্ষ করে তুলতে চেষ্টাও করেনি কোনদিন। পুলিশের দায়বদ্ধতা থাকার কথা কেবলমাত্র আইন ও আদালতের কাছেই। শাসক দলের নেতানেত্রীদের কাছে নয়। যতদিন না সেই ব্যবস্থা গড়ে তোলা যাবে, ততদিনই পুলিশকে চক্ষুলজ্জাহীন শাসকদলের দলদাস হয়েই থাকতে হবে। কারণ পুলিশও মানুষ। এই সমাজেই তাকে বাস করতে হয়। তাই শাসক দলের চোখরাঙানিকেই পুলিশের ভয় সবচেয়ে বেশি। একথা সর্নজনবিদিত। সেই ভীত সন্ত্রস্ত ঠুঁটো জগন্নাথ পুলিশি ব্যবস্থা কি করে সুরক্ষা দেবে নাগরিকদের?

এবারের পঞ্চায়েত নির্বাচনের মনোনয়পর্বেও তাই পুলিশকে ব্যস্ত থাকতে হয়েছে দুর্বৃত্ত দুস্কৃতিদের সুরক্ষা দিতেই। আর সেই কারণেই প্রায় ত্রিশ শতাংশ আসনে ওয়াকওভার জোগাড় করে নিয়েছে শাসকদল। আর বোঝাই যাচ্ছে, এই পরিস্থিতিতে বাকি সত্তর শতাংশ আসনে কি ধরণের প্রহসন সংঘটিত হতে চলেছে আর কয়েক দিনের ভিতরেই। অনেকেই এখানে নির্বাচন কমিশনের ভুমিকার গুরুত্বের কথা বলবেন। সাংবিধানিক ক্ষমতা যাই থাকুক না কেন, শাসকদল কর্তৃক নিযুক্ত নির্বাচন কমিশনের মূল বাধ্যবাধকতা যদি শাসকদলের প্রতিই ন্যস্ত থাকে, তবে কি হতে পারে, তারই দৃষ্টান্ত দেখা গেলে ২০১৮-তে। যে কারণে বিরোধী দলগুলিকে প্রতিদিন নিয়ম করে ধর্না দিতে হলো আইনের চৌকাঠে। কিন্তু আদালতের এক্তিয়ারও যে কতটা সীমিত, সেটিও সুস্পষ্ট হয়ে উঠল এই ২০১৮-তেই। এবং এইখানেই উঠে আসে ভারতীয় সংবিধানের দূর্বলতার দিকগুলি। ভারতের মতো জনবহুল দেশে প্রায় ত্রিশ শতাংশ আসনে মনোনয়নপত্র জমা না পড়লে যে, কোন নির্বাচনেরই বৈধতা থাকাই উচিত নয়, সেই বিষয়টিই উপেক্ষিত সংবিধানের পরিসরে। সংবিধানে আরও উপেক্ষিত, নির্বাচিত প্রার্থীর দলবদলের বিষয়টি। একটি দলের প্রতীকে নির্বাচিত হয়ে দলবদল করার মৌলিক অধিকার থাকলেও সেই আসনে পুনর্নিবাচনের বাধ্যবাধকতা না থাকা যে কোন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার এক মস্ত বড়ো গলদ। ভারতী সংবিধান এই বিষয়গুলিতে নিরুত্তর প্রায়। আর সেই ফাঁক দিয়েই গণতন্ত্রের ছদ্মবেশে স্বৈরতান্ত্রিক শক্তিগুলির উত্থান ঘটছে দ্রতগতিতে।

ফলে নির্বাচনের নামে গণতান্ত্রিক প্রহসনের ব্যবস্থা সংবিধান স্বীকৃত না হলেও সংবিধানের মধ্যেই সংঘটিত করা সম্ভব। ভারতীয় রাজনীতি বহুবারই তা করে দেখিয়েছে। দেখিয়েছে সংবিধানের ফাঁকফোঁকড়গুলিকে কাজে লাগিয়েই। গণতান্ত্রিক উপায়ে নির্বাচিত সরকার তার সাংবিধানিক ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়েই গণতন্ত্রের কণ্ঠরোধ করতে পারে। সংকুচিত করে তুলতে পারে গণতান্ত্রিক পরিসর। নির্বাচন ব্যবস্থাকে পরিচালিত করতে পারে নিজদলের স্বার্থেই। স্বাধীন ভারত অনেকবারই সেই ইতিহাসের স্বাক্ষী থেকেছে। অনেকেই বলতে পারেন, সে কথা যতটা সত্য, ঠিক ততটাই সত্য ভারতীয় সংবিধানের পরিসরও। আর সেই পরিসরেই জনগণই যে শেষকথা সেকথাও ভারতীয় রাজনীতিতে বারবার প্রমাণিত হয়েছে। যখনই কোন সরকারের স্বৈরাচারী মুখ ভেসে উঠেছে তার গণতান্ত্রিক মুখোশের আড়াল ছিঁড়ে, ততবারই জনগণই উল্টে দিয়েছে পাল্টে যাওয়া মুখগুলিকে। ঠিক, কিন্তু একথাও সত্য এই উল্টিয়ে দেওয়াটাই শেষকথা বলে নিশ্চিন্তে ঘুম দেওয়াটিও কোন কাজের কথা নয়। আমাদের দেখতে হবে সংবিধানের কোন কোন ফাঁকফোঁকড়গুলি বারবার অসাংবিধানিক কর্মকাণ্ডগুলিকে সাংবিধানিক বৈধতা দিয়ে ফেলছে। যার ফলে আইন আদালাত পুলিশ প্রশাসনকে কাজে লাগিয়েই স্বৈরাচারী ক্ষমতায়ন সম্ভব হচ্ছে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রীয় কাঠামোতেই?  যেখানে পুলিশকে শাসকদলের দলদাস হয়ে আত্মরক্ষা করতে হয়? যেখানে আইনের সংস্থানগুলিও নিরব দর্শক হয়ে নিশ্চুপ থাকে শাসকের অঙ্গুলিহেলনে?

এই বিষয়গুলি দ্রুত ঠিক করে না নিলে আমাদের সমাজব্যবস্থাই ভাঙতে থাকবে দিনে দিনে। নৈরাজ্যসৃষ্টিকারী শক্তিগুলিই নির্বাচনের দখল নিয়ে শাসনক্ষমতা কেন্দ্রে অধিষ্ঠিত থাকবে ক্রমান্বয়ে। এখানে কবে কোন রাজনৈতিক দল নির্বাচনে হেরে গেল, কোন দল ক্ষমতায় ফিরে এলো আবার, এসব একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক। প্রাসঙ্গিক হলো আমাদের সংবিধান কতটা নির্ভুল। প্রাসঙ্গিক হলো আমাদের গণতন্ত্র কতটা শক্তিশালী। প্রাসঙ্গিক হলো আমাদের সমাজ। প্রাসঙ্গিক হলো নাগরিকের সুরক্ষা। নাগরিকের মৌলিক অধিকারগুলি কতটা সুরক্ষিত। প্রাঙ্গিক হলো আমদের ভবিষ্যৎ অভিমুখ কতটা সঠিক পথে রয়েছে। সেইগুলিই।

২৫শে এপ্রিল’ ২০১৮

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত