অরাজনৈতিক সেল্ফি


আমাদের বসবাসের অলিগলি থেকে শুরু করে, লোক চলাচলের চৌহদ্দি থেকে ফেসবুকের ওয়াল জুড়ে শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর একটা বড়ো অংশই নিজেদের অরাজনৈতিক বলে দাবি করে থাকি। এবং সেই দাবির সপক্ষে থেকেই আমরা কোন রকম রাজনৈতিক আলোচনার পক্ষে বিপক্ষে অংশগ্রহণ করতেও রাজি নই। নিজেদের ওয়ালকে চলমান রাজনীতির প্রভাব থেকে মুক্ত রাখি। এটা অবশ্যই যে কোন স্বাধীন দেশের নাগরিকের মৌলিক অধিকার। সংবিধান স্বীকৃত। আমাদের ভিতর একটা বড়ো অংশই আবার নির্বাচনের দিন নিজেকে বাড়িতে বন্দী করে রাখি। সাধারণের সাথে এক লাইনে ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে থাকতে আমাদের ভালোও লাগে না। আমরা এও মনে করে থাকি, আমাদের ভোট দেওয়া না দেওয়ায় দেশের কিছু এসে যাবে না। ফলে দেশ জুড়ে যাই হয়ে যাক। সেটা রাজনীতির বিষয় হলে, আমাদের কিছু যায় আসে না। এই কারণেই আমরা কোন রকম রাজনৈতিক বিষয়ে মাথাও ঘামাতে রাজি নই। বরং সেই সময়ে ফেসবুকের ওয়ালে নান্দনিক শিল্পচর্চায় মশগুল থাকা অনেক ভালো। তাই আমরা কবিতা লিখি। গান গাই। নাচ দেখাই। গল্প বলি। পারলে পরনিন্দা পরচর্চাও করে থাকি। সারাদিন একঘেয়ে জীবনে একটু রিফ্রেশ হওয়ার দরকার আছে বই কি। তাই আমরা ফেসবুকে আসি।


নিজেদের অরাজনৈতিক মুখ দেখাতে। নিজেদের সাংস্কৃতিক প্রতিভা বিকশিত করতে। তাতে নিশ্চয় অন্যের গোঁসা হওয়ার কথা নয়। আমাদের কার্যক্রম ভালো না লাগলে তফাৎ যান। আমরা এই কারণেই মাঝে মধ্যে নিজেদের বন্ধুবৃত্তকে ছোট করে আনি। সেলুনে গিয়ে অবাঞ্ছিত চুল কেটে ছেঁটে আসার মতো। বেশ রিফ্রেশড লাগে তখন। কিন্তু তাই বলে কি আমরা নিয়মিত খবর দেখি না? দেখি বই কি। সময় পেলে হেডলাইনে চোখ বুলিয়ে নিই। নিজেদের বিশ্বাস মতো খবরের চ্যানেলগুলিতে নিজেদের বেঁধেও রাখি। খুঁটিতে বাঁধা গোয়ালের গরুর মতো। পার্থক্য শুধু এই, আমরা গরুদের মতো গোয়ালার হাতে বাঁধা থাকি না। আমরা নিজেদের অজ্ঞতা ও কুসংস্কার এবং সাম্প্রদায়িক বংশ কৌলিন্যের হাতে বাঁধা থাকি। ফলে আমাদের আর কোন অসুবিধা হয় না। ঠিক যেমনটি বিশ্বাস করতে চাই, ঠিক সেই সংবাদটিই সেই মতো ভাবে আমাদেরই জন্য প্রচারিত হয় নিত্যদিন। এবং আমরা যারা অরাজনৈতিক মুখের আড়ালে লুকিয়ে রাখি নিজেদের রাজনৈতিক প্রকৃতি, তারা বেশ একটা ফিল গুড অনুভুতির মধ্যে দিয়েই দিন যাপন করতে থাকি।


আমাদের এই ফিল গুড অনুভুতিজাত মুডের পরিস্কার একটা ছবি ভেসে ওঠে ফেসবুক সাম্রাজ্যের দিগন্তে। এই সেই মুড। যার ভিতর দিয়ে আমরা পরস্পরকে চিনে নিতে পারি। বন্ধুবৃত্ত বাড়িয়ে নিতে পারি। এবং অনলাইন থেকে অফলাইন আমাদের আনন্দের উপকরণের কোন অভাব হয় না। পরিযায়ী শ্রমিকরা হাজার হাজার মাইল পথ হাঁটুক। কৃষকরা কনকনে ঠাণ্ডায় মাসাধিককাল রাজপথে পড়ে থাকুক। নিরপেক্ষ সাংবাদিকরা মিথ্যা মামলায় হাজতে পচে মরুক। উলঙ্গ রাজার দিকে আঙুল তোলা শিক্ষার্থীরা রাষ্ট্রদ্রোহের মামলায় ঘর ছাড়া হোক। নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের মূল্য লাগাম ছাড়িয়ে যাক। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ভিটেমাটি ছাড়া হোক। রাজনৈতিক নেতারা পুকুরচুরি করে বেড়াক আর দলবদলের খেলা খেলুক। রাজ্য জুড়ে রাজনৈতিক খুনোখুনি চলতে থাকুক। নেতানত্রীদের ভাষা সন্ত্রাস অব্যাহত থাকুক। আমরা অরাজনৈতিক মুখ নিয়ে ঘুরে বেড়াবো। আমরা কবিতা লিখবো। গান বাঁধবো। মঞ্চে উঠে সংবর্ধনা নেবো। গল্প করবো। গল্প শোনাবো।


দেশ রসাতলে যাক। সমাজ উচ্ছন্নে যাক। আমরা রাস্তায় নামবো না। আমরা রাজনীতি করবো না। আমরা হাসি মুখের সেল্ফি তুলে লাইক গুনবো। আমরা ফেসবুক মিট করবো। আমরা কবিতার পত্রিকা প্রকাশ করবো নিয়মিত। আমরা বই প্রকাশের মঞ্চে ভিড় করবো। আমরা মেলায় ঘুরবো। আমরা পরস্পরের হাসিমুখের দিকে তাকিয়ে হাত নাড়বো। আমরা ভালো আছি। আমরা বেশ আছি। পেট্রল ডিজেলের দাম বাড়ছে। এ আর নতুন কথা কি? গ্যাসের ভর্তুকি কমছে। সে তো জানাই কথা। সরকার দেশের সম্পত্তি বেচে দিচ্ছে। ভালোই তো। মানুষের উপরে মাথা পিছু দেনার দায় বাড়ছে। তাতে আমাদের কি? আমরা তো বছরে একটা নতুন স্মার্ট ফোন কিনতে পারছি। অসুবিধে কি? ব্যাংকে সুদ কমছে বটে। সে, কি আর করা। তার ভিতরেই অর্থলগ্নীর বিষয়টা ম্যানেজ করে নিতে হবে। কিন্তু তাই বলে রাজনীতি নিয়ে মাথা ঘামাতে হবে, এমন কোন কথা নাই। দেশ দেশের মতোই পড়ে থাকবে। সমাজ সমাজের মতোই সমস্যায় জর্জরিত হয়ে চলতে থাকবে। তার নিজস্ব গতিতে। মানুষ তার নিজের সাধ্যমতো আরামে থাকবে। ক্ষমতায় না কুলালে পড়ে পড়ে মার খাবে। আমার উপরে নাই ভুবনের ভার।


আমরা নিজেরা কিভাবে দিন কাটাবো। সেটি একান্তই আমাদের বিষয়। সেই বিষয়ে কোন সমালোচনা সহ্য করবো না নিশ্চয়! তাই আমরা সেল্ফি তুলি। কবিতা লিখি। গল্প করি। কাব্যগ্রন্থের প্রকাশমঞ্চ আলোকিত করে তুলি। গল্প গান কবিতা পাঠের আসর জমিয়ে তুলি। বাংলা সংস্কৃতির দিগন্তে আমাদের যে দায়বদ্ধতা, সেই বিষয়টি আমরা কোনদিনও অবহেলা করি না। সংস্কৃতির অঙ্গনে, তা সে অনলাইনেই হোক আর অফলাইনে। আমরা আছি। সচল হয়ে। সক্রিয় হয়। সজীব হয়ে। আমাদের এই সজীবতা ছড়িয়ে থাকে আমাদের সেই ফিল গুড মুডের পরিমণ্ডল জুড়েই।


না, কোন রাজনীতিরই সাধ্য কি! আমাদের এই ফিল গুড মুডের বেষ্টনী ভেদ করে খুঁটিতে বাঁধা অসার চেতনায় ধাক্কা দিয়ে যাবে? আমরা সজাগ আছি। সজাগ থাকি। নির্বাচনের দিন, আমাদের খুঁটিতে বাঁধা প্রত্যয় নিয়ে ভোটের লাইনে দাঁড়াই বা নাই দাঁড়াই। আমরা খুঁটি ছাড়া হই না কখনোই। আমরা জানি, খুঁটিতে বাঁধা থাকার সুবিধে অনেক। না শুধুই কি আর আখের গোছানো? সকলেই কি আর আখের গুছিয়ে নিচ্ছি আমরা? না নিশ্চয়। কিন্তু নিজেদেরকে এক একটি বিশ্বাসের খুঁটিতে বেঁধে নিতে পারলে মনের দিক থেকে নিশ্চিন্ত। এর মতো শান্তি আর নাই। নিজের বিশ্বাস মতো সংবাদ চ্যানেলের খবর জেনে নেবো। নিজের বিশ্বাস মতো সেই খবর কানাকানি করবো। যখন যতটুকু দরকার। নিজের বিশ্বাস মতো কোন খবরের দিকে চোখ বুঁজে থাকবো। আবার কোন খবর নিয়ে মাতামাতি করবো। নিজের সেই বিশ্বাসের গড়ে আর কাউকে ফাটল ধরাতে দেবো না নিশ্চয়। সেই গড় মজবুত করে নিয়ে তবেই আমরা অরাজনৈতিক রূপ ধারণ করি। যে রূপে আমাদের সামাজিক পরিচিতি। আমাদের অনলাইন সেল্ফি আর অফলাইন চলাচল।


তথ্য প্রযুক্তির এই যুগে আমরা যত বেশি করে অরাজনৈতিক মুখচ্ছবি নিয়ে চলাচল করবো। তত বেশি করে সমাজটা রাজনীতির হাতের মুঠো‌য় চলে যাবে। সেকথা আমরা মুখে স্বীকার না করলেও বেশ জানি। ভালো করেই জানি। আমরা এও জানি, কিসে আমাদের আজকের সুখ। আর কিসে আমাদের ভবিষ্যতের ভালো। কিন্তু ভবিষ্যতে কি হবে। কি হওয়া উচিত। কি হলে সকলের ভালো হবে। সেসবে আমাদের কিসের স্বার্থ? আজকের এই দিনটিই আসল কথা। আজকের দিনটি আমি কতটা সুখে আছি। সেটাই আমার কাছে প্রথম কথা। প্রাথমিক শর্ত। নিজের স্বার্থের এই দিকটি কেনই বা উপেক্ষা করবো? আমার ভালোটা তো আর অন্য কেউ করে দিয়ে যাবে না। আমার ভালো থাকার ব্যবস্থা যখন আমাকেই করে নিতে হবে, তখন অন্য কোন যুক্তিই গ্রহণযোগ্য নয়। সেই কারণেই এই অরাজনৈতিক থাকার রক্ষাকবচটি ধারণ করে নিতে হয়েছে আমাদেরকে। এই রক্ষাকবচেই আমাদের আজকের ভালো থাকার রেমেডি। সেখান থেকে আমাদের টেনে নামাতে গেলে, আমরা সহ্য করবো কেন? তাই আমরা কখনোই রাজনীতির কোন বিষয়ে মুখ খুলবো না। রাজনীতির প্রসঙ্গ উঠলেই মুখে কুপুপ দিয়ে বসে থাকবো। অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে। আপন ঘরের চৌকাঠের বাইরে যত যাই ঘটে যাক না কেন। আমাদের দরজা জানলা বন্ধ আছে। বন্ধ থাকবে।


১৭ই ফেব্রুয়ারী’ ২০২১


কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত