অরাজনৈতিক নয়

 

সোশ্যালসাইটে বিশেষ করে ফেসবুকে, অনেকেরই সাম্প্রতিক রাজনীতির বিষয় নিয়ে আলাপ আলোচনায় অংশগ্রহণে আপত্তি রয়েছে। আপত্তি থাকা না থাকা, একজন ব্যক্তির মৌলিক অধিকারের বিষয়। সেই বিষয় নিয়ে আপত্তি করার কোন জায়গা থাকে না। এবং আপত্তি থাকার এই সামাজিক প্রবণতা কয়েকজনের ভিতরে সীমাবদ্ধ থাকলে সেই বিষয়ে আলোচনাও অর্থহীন। কিন্তু সেই একই প্রবণতা যখন একটা গোটা সমাজের প্রকৃতি হয়ে উঠতে থাকে। তখন সেই বিষয়ে আলাপ আলোচনার আশু প্রয়োজন রয়েছে বই কি। গণতান্ত্রিক নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় কে কোন দলের কোন প্রার্থীকে ভোট দেবেন, সেটি ব্যক্তি মানুষের একান্ত নিজস্ব একটি বিষয়। কিন্তু সমাজ রাজনীতির ঘূর্ণীতে সাধারণ মানুষ কিভাবে আবর্তিত হচ্ছে, এবং হতে বাধ্য হচ্ছে সেটি সর্বজনীন আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠাই বাঞ্ছনীয়। কিন্তু সাধারণ মানুষ সেই আলোচনায় আগ্রহী নন আর ইদানিং। তার একাধিক কারণ বর্তমান। কিন্তু প্রধানত যে কারণগুলি মানুষকে মুখে কুলুপ আঁটতে বাধ্য করে সেগুলির দিকে লক্ষ্য রাখলেই বর্তমান রাজনীতির মূল ব্যাধির হদিশ পাওয়া যেতে পারে।

 

কোন রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ার বাইরে থাকা একেবারে সাধারণ জীবনযাপন করা জনগণের অধিকাংশের ভিতরেই বর্তমান রাজনীতি একটা আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি করে দিয়েছে। কোন রাজনৈতিক আলাপ আলোচনায় অংশগ্রহণ করলেই বিপক্ষ মতের মানুষের সাঁড়াশী আক্রমণের মুখোমুখি পড়তে হতে পারে। বিষয়টি সেখানেই সীমাবদ্ধ থাকলে আলাদা কথা ছিল। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই বিষয়টি রাজনৈতিক বিতর্কের ভিতরে আটকিয়ে থাকে না। দলবদ্ধ ভাবে এবং রাজনৈতিক দলের ঝাণ্ডা উঁচিয়ে ব্যক্তি মানুষের প্রতি সমাজিক বয়কট থেকে শুরু করে ব্যক্তি মানুষের উপরে শারীরীক নির্যাতন অব্দি জল গড়িয়ে যেতে পারে। সমাজবদ্ধ মানুষ স্বাভাবিক ভাবেই তাই আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে সভয়ে মুখে কুলুপ এঁটে থাকে। মুখ ফুটে প্রাণের কথাটুকু বলতে চায় না। এই যে একটা আতঙ্ক। কোন দলের বিপক্ষে কথা বললেই নির্যাতনের শিকার হওয়ার সম্ভাবনা। এইটি মানুষকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে দীর্ঘদিন। এমনকি কোন দলের পক্ষ নিয়ে কথা বললেও বিপদ রয়েছে। বিপক্ষ দলের গুণ্ডা মাস্তানদের হাতে নাস্তানাবুদ হওয়া থেকে শুরু করে জীবন অব্দি খোয়াতে হতে পারে। সোশ্যাল মিডিয়ায়, রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ার বাইরে থাকা মানুষ তাই পারতপক্ষে কোন রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে উচ্চবাচ্চ করতে সাহস পায় না।

 

যারা রাজনীতি নিয়ে ঝগড়া বিবাদ তর্ক বিতর্ক করে। তারা আসলে অধিকাংশই কোন না কোন রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় থেকেই মুখ খুলে থাকে। সেই মুখে যত অশ্রাব্য কথারই খই ফুটুক না কেন। কিন্তু সাধারণ ভাবে ভয়ে সিঁটিয়ে থাকা নিরীহ জনগণের বৃহত্তর অংশই মুখে কুলুপ আঁটায় বিশ্বাসী। কথায় আছে বোবার শত্রু নাই। ঠিক এই কারণেই অধিকাংশ সোশ্যাল সাইটেই দেখা যায়, মানুষ বিশেষ বিশেষ প্রাসঙ্গিক ঘটনা প্রবাহের দিক থেকেও মুখ ফিরিয়ে থাকে। কারণ অধিকাংশ প্রাসঙ্গিক বিষয়াদিই সরাসরি কিংবা কোন না কোন না কোনভাবে রাজনীতির সাথে যুক্ত। বিশেষ করে দলীয় রাজনীতি। মানুষ জানে, এই সব বিষয়ে মুখ খোলা মানেই ডেকে শত্রু পয়দা করা। তাই মানুষের বুক ফেটে গেলেও মুখ ফোটে না। আজকের সমাজে সাম্প্রতিক রাজনীতি এমনই এক ভয়ংকর পরিবেশের সৃষ্টি করে দিয়েছে।

 

অবস্থা যে কতটা ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। সেটি বোঝা গেল সাম্প্রতিক ব্রিগেড জনসভায় অভিনেতা থেকে রাজনৈতিক নেতা হয়ে ওঠা জনপ্রিয় তারকার প্রকাশ্য বক্তব্যে। তিনি কোন ভণিতা না করেই সদম্ভে ঘোষণা করে দিলেন, তিনি বিষধর গোখরা। ঘোষণা করলেন বিশেষ একটি রাজনৈতিক দলে আনুষ্ঠানিক ভাবে যোগদান করার সভামঞ্চেই। অর্থাৎ অভিনেতা থেকে তার নেতা হয়ে ওঠার চাবিকাঠিই কি তাহলে বিষধর হওয়া? বিষহীন হলে রাজনৈতিক দলে আর কল্কে পাওয়া যাবে না? তাই তাকে প্রকাশ্যে ঘোষণা দিতে হলো। তিনি বিষধর জাত গোখরা? এবং বিষধর হয়ে ওঠার এই শর্ত কি শুধুমাত্র সেই বিশেষ রাজনৈতিক দলের নিজস্ব সংস্কৃতি? না’কি আপামর সকল রাজনৈতিক দলই কম বেশি এই সংস্কৃতির চর্চাই করে থাকে? উত্তর যাই হোক না কেন, একথা সত্যি যে ভদ্রলোক মুখ ফস্কেই হোক অথবা স্ক্রিপ্ট অনুযায়ীই হোক আসল সত্যিটা বলে দিয়েছেন। কথাটা যে কতখানি সত্য। সেটা আপামর জনতা মাত্রেই জানে। কথায় আছে সাপের লেজে পা দিলে আর রক্ষা নাই। এদেশের অধিকাংশ রাজনৈতিক নেতানেত্রী সম্বন্ধেই যে কথাটা বহুলাংশে খাটে, সে কথা জনতা মাত্রেই জানে। মুখে স্বীকার করুক আর না করুক।

 

না, সে কথা মুখে স্বীকার করার উপায় রাখে নি আমাদের সমাজ। আজকের সমাজে রাজনীতি যে দখলদারিত্ব করে থাকে। তাতে একথা অনস্বীকার্য্য। প্রতিটি মানুষ মাত্রেই জানে পিছনে অন্য কোন রাজনৈতিক দলের খুঁটির জোর না থাকলে অপর কোন রাজনৈতিক দলের বা দলীয় নেতার অন্যায়ের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠা যায় না। উঠলেই ছোবল খেতে হবে। আর সেই সত্যটুকুই কি অবলীলায় স্বীকার করলেন লাল নীল রঙ বদল করতে করতে গেরুয়া রঙ ধারণ করার শুভমুহুর্তে, জনপ্রিয় অভিনেতা! তার অভিনেতা থেকে নেতা হয়ে ওঠার প্রকাশ্য সভামঞ্চে। জানিয়ে দিলেন এদেশের রাজনীতির এতদিনের ওপেন সিক্রেটটি। “এক ছোবলেই ছবি”।

 

ঠিক এই কারণেই অধিকাংশ মানুষ, রাজনীতির বিষয়ে দেশ গোল্লায় গেলেও মুখে কুলুপ আঁটায় বিশ্বাসী। বিশেষ করে অনলাইনে সোশ্যাল সাইটের ওয়ালে ওয়ালে। সমাজে বাস করতে করতে, তাঁরা ঠিক এই এক ছোবলেই ছবি করে দেওয়ার হুমকির বিষয়টা সম্বন্ধে যথেষ্ঠ ওয়াকিবহাল। রাজনীতির কারবারিরা বিরোধী কন্ঠস্বর বেশিদিন সহ্য করে না। তাদের পোষা গুণ্ডাবাহিনীদের দাপটের কথা মানুষ মাত্রেই জানে। জানে, কি ভাবে এক ছোবলেই ছবি করে দেওয়া হয়। ধনে প্রাণে সুস্থ শরীরে প্রিয়জন নিয়ে শান্তিতে বেঁচে থাকতে হলে মুখে কুলুপ এঁটেই থাকতে হবে। ফলে একেবারে সাধারণ মানুষের হাতে অন্য কোন নিরাপদ পথ খোলা থাকে না। যে পথে সে তার নিজের উপলব্ধির কথাটা মুখ ফুটে ঠিক মত প্রকাশ করতে পারবে। অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে নিজের প্রতিবাদকে মুখর করতে পারবে। এই এক কারণ। যে কারণে অধিকাংশ নেটিজেনই সব রকম রাজনৈতিক আলাপ আলোচনা থেকে নিজের প্রোফাইলকে মুক্ত রাখে।

 

এমনিতে মনে হতেই পারে। যস্মিন দেশে যদাচার। এইভাবেই আত্মরক্ষা করা সঠিক উপায়। রাজনৈতিক ছোবল থেকে রক্ষার জন্য কোন রকম সামাজিক নিরাপত্তা যেখানে নাই, সেখানে আপনি বাঁচলে বাপের নাম। একজন সাধারণ মানুষকে বর্তমান রাজনীতির গতিপ্রকৃতি এই ভাবে ভাবতেই বাধ্য করে থাকে। রাজনৈতিক দলগুলির লক্ষ্যই থাকে সমাজে একটা ভয় ধরানো প্রতিপত্তি কায়েম করে রাখা। মানুষ সেই ভয়ে সভয়ে রাজনৈতিক দলের আধিপত্যে বিশ্বাসী হয়ে উঠবে। এক এক সময়ে এক এক অঞ্চলে এইভাবে এক একটি রাজনৈতিক দল নিরঙ্কুশ আধিপত্য কায়েম করে রাজত্ব চালিয়ে থাকে। সেই আধিপত্যেরই ওপেন সিক্রেট, “এক ছোবলেই ছবি”। যখন যে রাজনৈতিক শিবিরের সেই ছোবল মারার শক্তি বেশি হয়ে ওঠে, সেই শক্তিই সরকারী ক্ষমতার শীর্ষে অবস্থান করে। আর এটাই ভারতীয় গণতন্ত্র। যে গণতন্ত্রের মূল চালিকা শক্তি নিহিত থাকে, “এক ছোবলেই ছবি” করে দেওয়ার ক্ষমতায়।

 

মানুষের মনে ভয় ধরিয়ে দিয়ে তাকে রাজনৈতিক ভাবে নিস্ক্রিয় করে রাখার মধ্যেই রাজনৈতিক ক্ষমতার যথেচ্ছ ব্যবহার করার সংস্কৃতির প্রাণভোমরা লুকিয়ে থাকে। এটাই আসল রাজনীতি। যে রাজনীতির শিকার সাধারণ জনসমাজ। এর ফল কিন্তু মারাত্মক। যে রাজনৈতিক অবক্ষয় গোটা সমাজকে এই ভাবে শাসন করতে থাকে, সেই অবক্ষয়ের হাত ধরেই সমাজে পচন ধরতে শুরু করে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতেই পারে, সামাজিক এই অবক্ষয় থেকে যে যার আত্মশক্তি ও বুদ্ধিমত্তার জোরে রক্ষা পেতে পারে, তাতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। কিন্তু সার্বিক ভাবে সমাজ আপাদমস্তক পচনের শিকার হয়ে পড়লে, ব্যক্তিগত পরিসরে আত্মরক্ষা করা অসম্ভব। ফলে আজকে যে যার ব্যক্তিগত পরিসরে, যে ছোবলের ভয়ে যত বেশি করে গুটিয়ে থাকবো, সেই ছোবলের বিষ ততই আমাদের সমাজকে বিষিয়ে দেবে। বিষিয়ে দিচ্ছে। দিয়েছে বলেই আমরা অধিকাংশ সময়ে অরাজনৈতিকতার মুখোশের আড়ালে আত্মগোপন করতে বাধ্য হই, আত্মরক্ষার আশু তাগিদে। যার সুদূরপ্রসারী ফলে গোটা সমাজ পচনের অভিমুখেই এগিয়ে চলতে থাকে। নিরন্তর।

১০ই ফেব্রুয়ারী’ ২০২১

 

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত