ফ্রেমের ছবি ছবির ফ্রেম


না, আমার শঙ্খ ঘোষের সাথে কোন সেল্ফি নাই। কোন ছবি নাই। মানুষটির সাথে কোনদিন মুখোমুখি দেখাও হয় নি। শুনিনি কোনদিন তাঁর কোন বক্তৃতা প্রকাশ্য জনসভায় কিংবা বৌদ্ধিক সেমিনারে। কোন সাহিত্যসভাতেও দেখা হয়নি তাঁর সাথে। কিন্তু কথা হয়েছে নিরন্তর। না দূরাভাষে নয়। দূর আভাসেও নয়। কথা হয়েছে নিরবে নিভৃতে। একান্তে তাঁর লেখার ভিতর দিয়ে। যেমন কথা হয় আমাদের অনেকেরই, রবি ঠাকুরের সাথে। যেমন কথা হয় কারুর কারুর কার্ল মার্কসের সাথে। কিংবা লেলিনের সাথে। কখনো সখনো গ্রামশীর সাথে। ফ্রয়েডের সাথে। স্বামী বিবেকানন্দ কি ঋষি অরবিন্দের সাথে। রাসেলের সাথে, বার্নাড শ’র সাথে। রোমা রোঁলা কিংবা মানবেন্দ্র রায়ের সাথে। ঠিক তেমনই শঙ্খ ঘোষের সাথেও অন্য অনেকের মতোই আমারও কথা হয়েছে। হয় এবং আরও হবে। নিরন্তর হবে। যতদিন আয়ু সাহায্য করবে ততদিন।

 

শঙ্খ ঘোষের সাথে রবীন্দ্রনাথের সাথে ছবি থাকা না থাকাটা কোন কথা নয়। এনাদের সাথে মুখোমুখি দেখা হওয়া না হওয়াটাও কোন বড়ো কথা নয়। বড়ো কথা নয়, তাঁদের সাথে ব্যক্তিগতস্তরে আলাপ পরিচয় থাকা না থাকাও। বরং তাদের সাথে এই নিরন্তর কথা হওয়াটাই আসল কথা। বড়ো জরুরী। অনিবার্য্য ভাবেই জরুরী। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, এই কথা হওয়ার সুযোগ সুবিধে এবং আগ্রহ ও আকাঙ্খা আমাদের অত্যন্ত কম। এবং বড়ো ভয়ানক ভাবেই কম। কম বলেই একজন শঙ্খ ঘোষের মৃত্যুতেও জাতি হিসাবে বাঙালির আজকে আর বিশেষ কিছুই যায় আসে না। আশু ভবিষ্যতেও আসবে না। আর তখনই একজন শঙ্খ ঘোষের সাথে এক ফ্রেমে থাকার স্মৃতিটুকুই অত্যন্ত মূল্যবান হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। যেখানে সমগ্র জাতির ফ্রেমে শঙ্খ ঘোষেরা ধরা পড়েন না কোনভাবেই।

 

একটি জাতি আসলেই কতটা রিক্ত ও নিঃস্ব ধরা পড়ে যায় ঠিক তখনই। জাতির ফ্রেমে তার শ্রেষ্ঠ সন্তানরাই স্থান পায় না যখন। সমাজের বৃহত্তর অংশের চিন্তা চেতনায়, আশা আকাঙ্খায়, সমস্যা ও সংকটে শঙ্খ ঘোষরা জায়গা করে নিতে পারেন না আর। কারণ সেই জায়গাটা থালা বাজানো, তালি দেওয়া, প্রদীপ জ্বালানো, আমরা সবাই চোরের মিছিলে হাঁটা, রাস্তা জুড়ে নয় শুধু মন মনন জুড়ে খড়্গ হাতে দাঁড়িয়ে থাকা উন্নয়ন আর আর সম্প্রদায়িক সত্তা জুড়ে জয়ধ্বনি দেওয়া শ্রীরাম দখল করে নিয়েছে। এটাই আমাদের জাতির ফ্রেম। সেই ফ্রেমে ব্রাত্য শঙ্খ ঘোষেরা আজ।

 

কিন্তু আমরা অধিকাংশ মানুষই যদি শঙ্খ ঘোষেদের মতোন জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের সাথে নিরন্তর এই নিভৃত আলাপচারিতাটুকুও চালিয়ে নিয়ে যেতে পারতাম। তাহলে আজকের সামাজিক অসুখগুলির প্রতিরোধে কিছুটা হলেও মানুষ এগিয়ে আসতে পারতো। অন্তত প্রতিরোধহীন এইডস রুগীর মতোন দশা হতো না পশ্চিমবঙ্গের বাঙালির। যেখানে বলা যায়, তোমারা আমাদের ভোট দাও। আমরা তোমাদের নাগরিকত্ব দেবো। যেখানে গরুর দুধে সোনা আছে বললে সমর্থন বাড়তে থাকে লাফিয়ে লাফিয়ে। যেখানে কাটমানি তোলাবাজি সংস্কৃতি রাজনৈতিক মান্যতা পেয়ে যায়। যেখানে ২০২১ সালে এসে নতুন করে সাম্প্রদায়িক পরিচয় বড়ো হয়ে ওঠে জাতি সত্তার পরিচয় থেকেও। যেখানে জাতীয়তার পরিচয় নির্ধারিত হতে থাকে সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীবাজির সংস্কৃতিতে। যেখানে রাজনীতি ঠিক করে দিতে থাকে, আমরা কি খাবো। কি পড়বো। আর কি বলবো।

 

তাই আজ যাঁরা শঙ্খ ঘোষের প্রয়াণে শোকস্তব্ধ। তাঁদেরও ভাবা দরকার। শঙ্খ ঘোষ’তো সজীব ছিলেন দীর্ঘ জীবনব্যাপী কর্ম পরিক্রমায়। প্রায় এক শতাব্দী ব্যাপী সেই জীবন দুই হাতে তাঁর শ্রেষ্ঠতম সাধনার ধন বিলিয়ে গিয়েছেন আমৃত্যু। কিন্তু সেই সাধনার শরিক কেন হতে পারিনি আমি আপনি। কেন সেই সাধনার শরিক হতে পারিনা আমরা। যারা অতি সহজেই চলমান রাজনৈতিক কি সমাজিক প্রবণতার শরিক হয়ে যেতে থাকি। ভাসতে ভাসতে ঘুরপাক খেতে থাকি গড্ডালিকা প্রবাহে। গড়াতে গড়াতে নামতে থাকি অধঃপতনের অতলে। এবং প্রশ্নহীন আনুগত্যের প্রবণতায়। অথচ শঙ্খ ঘোষদের মতো মনীষীদের দেখানো পথ অনুসরণে কেন আমাদের চরম অনীহা? সমাজটা যদি শুদ্ধতার পথে এগোতে থাকে, সেই ভয়ে? ঘুষ আর ঘুষির সমাজ যদি সমাজবদলের স্বপ্ন দেখতে শুরু করে দেয় সেই ভয়ে? একটা ফোন কলে নিতান্ত বেআইনী কাজটি যদি আর সহজে না করা যায়, সেটাই কি আমাদের বড়ো ভয় তবে? না, আমরা অত্যন্ত সচেতন ভাবেই তাই কথা বলি না এই রকম শঙ্খ ঘোষদের সাথে, আমাদের একান্ত নিভৃতে নীরবে। ভয় রয়েছে সেখানে। চলমান সময়ের থেকে যদি পথভ্রষ্ট হয়ে পড়ি।

 

আসলে এই গড্ডালিকা প্রবাহের পোকামাকড়ের মতো বেঁচে থাকার ভিতর দিয়েই আমরা নিজেদের ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর স্বার্থরক্ষায় আনন্দ পাই বেশি। অনেক বেশি। একে টাকা খাইয়ে ওকে টাকা খাইয়ে ছেলের একটা চাকরী নিশ্চিত করতে গেলে, না শঙ্খ ঘোষের সাথে নিভৃতে নীরবে বলা যায় না কোন কথাই। এক হাতে কাটমানি খাবো আর অন্য হাতে ধরা থাকবে শঙ্খের কবিতার বই। সে হয় না। মানুষ হয়তো এখনো অতটা হিপোক্রিট হয়ে উঠতে পারেনি। তাই আমরা সাধারণ মানুষরাই, সচেতন ভাবে শুধু যে শঙ্খ ঘোষদের থেকে দূরে থাকি তাও নয়। তাদেরকে আমাদের থেকে অনেক দূরে ঠেলে রেখে দিই। করোনার মতোই সংক্রমণের ভয়ে। আমরা এঁদেরকে আসলে ভয়ও করি। যদি তাঁর সাথে একান্ত আলাপচারিতায় সংক্রমিত হয়ে পড়ি? তাই মাস্ক পড়ার মতোই সভয়ে নিজেদের সত্তাকে ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর ব্যক্তি স্বার্থের ঘেরাটোপে ঢেকে রাখি। আর রাজনৈতিক সুবিধাবাদের স্যানিটাইজার দিয়ে নিরন্তর ধুতে থাকি আপন বিবেক। যাতে দংশন করতে না পারে শঙ্খদের শব্দসংক্রমণ। শঙ্খদের দর্শন সংক্রমণ।

 

তার থেকে শঙ্ঘ ঘোষেদের মতো বিশিষ্টজনেদের সাথে এক ফ্রেমের স্মৃতি ঘরে টাঙিয়ে রাখতে পারলে। সামাজিক কদরও বাড়ে। ব্যক্তি স্বার্থেরও হানি হয় না। এটা কোন বড়ো কথা নয়। শঙ্খ ঘোষ আমাকে আমার সুবিধেবাদী স্বার্থসন্ধানী চরিত্র থেকে মুক্ত করতে পেরেছেন কিনা। এটা অনেক বড়ে কথা, আমার সাথে তাঁর ছবিও এক ফ্রেমে বন্দী। সেই ছবিই আমাকে পরবর্তীতে কিছু অতিরিক্ত মাইলেজ পাইয়ে দিতে পারে। কিন্তু শঙ্খের শব্দ নিঃশব্দের তর্জনী হয়ে আমাকে সচেতন করতে পারছে কি পারছে না, সেটা আর আমাদের কাছে তত বড়ো বিষয় নয়। তাই শঙ্খ চলে যাওয়ায়, আমরা শোক জ্ঞাপন করছি। সেই শোক জ্ঞাপনের ভিতর দিয়েই সমাজে আমার অবস্থানটুকুও একটু ঝালিয়ে নিচ্ছি। নেবোও।

 

শঙ্খ ঘোষ চলে গিয়েছেন বলে যাঁদের কষ্ট। তাঁদের কাছে বিনীত প্রশ্ন এইটুকুই। শঙ্খ কবে ছিলেন? কজনের কাছে ছিলেন? তিনি কি আদৌ সেই মুষ্টিমেয় কয়েকজন মানুষের কাছে থাকার জন্যেই আজীবন সাধনার ধন উৎসর্গ করে গিয়েছেন তাঁর অনন্য লেখনী আর শিরদাঁড়া সোজা করা মানবিক বোধে? যদি ঠিক সেইটুকুইকেই শঙ্খর অভিপ্রায় বলে বিশ্বাস করতে শুরু করি আমরা। তবে তা ওনাকে অপমান করারই সামিল নয় কি? যে বৃহত্ত অংশের মানুষের কাছে আজও অধরা রয়ে গিয়েছেন তিনি। সেইখানে যতদিন না তিনি পৌঁছাবেন, যতদিন না সেখানে তাঁকে পৌঁছিয়ে দিতে স্বচেষ্ট হবো আমরা। ততদিন তাঁর চলে যাওয়া নিয়ে শোক করা বৃথা। আবার যদি তেমন অঘটনও বাঙালি জাতির জীবনে আদৌ কোনদিন ঘটে, তবে সেদিন আমাদের উৎসবের দিন। শোকের দিন নয়। সেইদিন শঙ্খ ঘোষেরও জন্মদিন। ব্যক্তি শঙ্খের নয়। সাধক শঙ্খের। শঙ্খ ঘোষ এক সাধনার নাম। যে সাধনার সাথে চলতে পারে নিরন্তর দেওয়া নেওয়া আদান প্রদান। ব্যক্তি পরিসর থেকে শুরু করে সমাজিক পরিসরে। একান্ত নিভৃত আলাপচারিতা থেকে শুরু করে জাতীয় স্তরে। শঙ্খ ঘোষ শুধু নন। শঙ্খ ঘোষেরা সেই দিনের জন্যেই আজীবন সাধনার ধন উৎসর্গ করে দিয়ে যান। শুধুই নিজের জাতির জন্যেও নয়। সমগ্র মানবজাতির জন্য। যেমন দিয়ে গিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ বিবেকানন্দ আরবিন্দ জীবনানন্দ। যেমন দিয়ে গিয়েছেন মার্কস লেলিন গ্রামশী। যেমন দিয়ে গিয়েছেন রাসেল শ রোমা রোঁলা। ব্যক্তির উর্ধে। গোষ্ঠীর উর্ধে। সম্প্রদায়ের উর্ধে। জাতির উর্ধে। সমগ্র মানবের জন্য।

 

২২শে এপ্রিল’ ২০২১

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত