কন্ঠরোধের গল্প

রাষ্ট্রশক্তি আর ব্যক্তি মানস কোথাও কি একটা মিল দেখা যাচ্ছে? অন্তত বর্তমান ভারতবর্ষের রাজনীতি ও সমাজিক পরিসরে। রাষ্ট্র পরিস্কার বলে দিতে চাইছে, হয় আমার স্তাবকতা কর। আর নয়তো নিশ্চুপ থাকো। কিন্তু কোনভাবেই রাষ্ট্রের সমালোচনা করা চলবে না। রাষ্ট্রকে তার কোন কাজের জন্য প্রশ্ন করা যাবে না। রাষ্ট্রের জবাবদিহির কোন দায় নেই জনতার কাছে। রাষ্ট্র হয়তো একটি বিমূর্ত সত্তা। কিন্তু রাষ্ট্রকে পরিচালনা করার অধিকার প্রাপ্ত প্রশাসন কোন বিমূর্ত সত্তা নয়। প্রশাসনকে চোখের সামনে দেখা যায়। তার কাজকর্মের ফলে আমাদেরকে ভুগতে হয়। কিন্তু বর্তমান সংস্কৃতিতে সেই প্রশাসনকে তার কাজকর্ম সম্বন্ধে কোন প্রশ্ন করা চলবে না। প্রশাসন ও তার কর্তাব্যক্তিদের কাজের জন্য, তাদের কাছ থেকে কোন জবাবাদিহি চাওয়া যাবে না। অর্থাৎ সহজ কথায়, প্রশাসনের স্তাবকতা করতে অসুবিধে হলে, নীরব থাকাই শ্রেয়। মুখ খুললেই বিপদ। সম্প্রতি চালু হয়েছে নতুন তথ্য প্রযুক্তি আইন। ছাব্বিশে মে বুধবার থেকে। আমরা এখনো এই আইনের খুঁটিনাটি বিষয়ে ওয়াকিবহাল নই। কিন্তু প্রকাশিত খবরের সূত্র ধরে একথা বুঝতে অসুবিধে হচ্ছে না, সামাজিক মাধ্যমগুলিতে রাষ্ট্র অর্থাৎ প্রশাসনের বিরুদ্ধে মুখ খুললে, সমালোচনা করলে, প্রশ্ন তুললে এবার থেকে আইনের নাগালে নাকানিচোবানি খেতে হতে পারে। কয়েকটি সামাজিক মাধ্যমের সাথে এই বিষয় নিয়ে প্রশাসনের টাগ অফ ওয়ার চলছে। এমনকি দিল্লী হাইকোর্টে সরকারী ফরমানের বিরুদ্ধে মামলাও দায়ের হয়েছে। বহুজাতিক সংস্থার তরফ থেকে। তাদের বক্তব্য এই আইনের অন্যতম ধারা ‘তথ্যের উৎসমূল চিহ্নিতকরণ’ আসলেই অসাংবিধানিক। কারণ ভারতীয় সংবিধান অনুসারে মানুষের ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা মানুষের মৌলিক অধিকারের বিষয়। কিন্তু নতুন এই আইন সাংবিধানিক মৌলিক অধিকার রক্ষার পরিপন্থী।

 

অর্থাৎ একটি বিষয় পরিস্কার। রাষ্ট্র তথা প্রশাসন কোনভাবেই বিরুদ্ধ সমালোচনাকে প্রশ্রয় দিতে রাজি নয় আর। সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় যেভাবে বর্তমান প্রশাসনের প্রতিটি কাজকর্ম নীতি ও তার প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। সমালোচনার ঢেউ উঠছে। প্রশাসন সেই ঢেউকেই প্রতিহত করতে চাইছে। একেবারে আদাজল খেয়ে। একেবারে গোড়াতেই। কারণ প্রশাসন জানে, একজনের প্রশ্ন দশ জনের মনে ছড়িয়ে পড়লেই সরকার বিরোধী আন্দোলনগুলি সবল হয়ে ওঠে। তীব্র হয়ে ওঠে। শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ফলে একজনের তোলা প্রশ্নকে যদি দশজনের মনে ছড়িয়ে পড়ার আগেই আটকিয়ে দেওয়া যায়। তবে বহাল তবিয়তে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকা সহজ হয়ে যায় অনেকটাই। গত বুধবার থেকে চালু হওয়া নতুন তথ্য প্রযুক্তি আইনের মূল অভিমুখ ঠিক এই দিকেই। জনতাকে যেভাবেই হোক ভয়ে রাখতে হবে। এই বুঝি আমার কথায় রাষ্ট্র আমার বিরুদ্ধে খেপে ওঠে। রাষ্ট্র খেপে উঠলেই মশা মারার মতো আমায় গলা টিপে মেরে ফেলতে পারে। জনতার মনে রাষ্ট্র সম্বন্ধে এই ভীতি গেঁথে দিতে হবে। আর সোশ্যাল মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেই দেশ জুড়ে এই ভীতির সঞ্চার সহজ। নতুন এই তথ্যপ্রযুক্তি আইন সেই কাজেই লাগানো হবে। অর্থাৎ ঘুরে ফিরে সেই একই কথা। রাষ্ট্র তথা প্রশাসনের সমালোচনা করা চলবে না। প্রশাসনের কাজে কোন প্রশ্ন তোলা চলবে না। শাসকের বিরুদ্ধে সরব হওয়া চলবে না। হলেই সেই সমালোচককে প্রশ্নকর্তাকে প্রতিবাদকারীকে স্তব্ধ করে দিতে হবে। কিন্তু সেই সমালোচক সেই প্রশ্নকর্তা সেই প্রতিবাদকারী যদি বহুজাতিক সোশ্যাল মিডিয়াগুলিতেই এই সমালোচনা এই প্রশ্ন এই প্রতিবাদ করতে থাকে। তাহলে সরকারের কোতোয়াল তাদের ধরবে কি করে? সরকারী কোতয়ালের ক্ষমতার পরিসর তো মাঠে ময়দানে। সেই ক্ষমতার সম্প্রসারণ এবারে অন্তর্জাল মাধ্যমে সুনিশ্চিত করতেই নতুন এই তথ্য প্রযুক্তি আইন। ইনটারমিডিয়ারী গাইডলাইনস এণ্ড ডিজিট্যাল মিডিয়া এথিকস কোড।


এবার থেকে ডিজিট্যাল মিডিয়ায় আপনি কোন মত প্রকাশ করতে পারবেন আর কোন মত প্রকাশ করতে পারবেন না। সেই বিষয়েই এই ডিজিট্যাল মিডিয়া এথিকস কোড প্রযুক্ত হতে থাকবে। রাতদিন সাতদিন। অতন্দ্র প্রহরীর মতো। আর সেই বিষয়ে সরকারের সাথে সহযোগিতা করতে বাধ্য থাকবে প্রতিটি ডিজিট্যাল সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম। যতক্ষণ আপনি সরকার বা শাসকদলপন্থী। ততক্ষণ সরকার আপনার টিকি ছোঁবে না। সে আপনি যতই ফেক নিউজ তৈরী করুন আর ভুয়ো বার্তা ছড়াতে থাকুন। শাসকদলের স্বার্থহানী না হলেই হলো। সরকারের মুখ না পুড়লেই হলো। কিন্তু আপনি সঠিক তথ্য তুলে ধরে সরকারের ব্যর্থতা কিংবা দুরভিসন্ধি বিষয়ে মানুষকে সচেতন করতে গেলেই আপনার মতপ্রকাশের মৌলিক অধিকারে কোপ পড়বে। এমনকি দেশ বিরোধী কার্যকলাপের অভিযোগে দেশদ্রোহের আইনে আপনাকে গারদের অপর প্রান্তে চালান করে দেওয়াও বিচিত্র নয়। মত প্রকাশের এই এথিকস ঠিক হয়েই নতুন এই আইনটি চালু করা হয়েছে। এমনটাই অনুমান সংশ্লিষ্ট মহলের।


রাষ্ট্রেশক্তির মনোভাব না হয় বোঝা গেল। কিন্তু এর সাথে ব্যক্তি মানসের সাযুজ্য কোথায়? ফেসবুকের কথাই ধরা যাক। বর্তমানে যে ভুখণ্ডে সবচেয়ে বেশি মানুষের চলাচল। সেটি কিন্তু ফেসবুক। হোক সেটি ভার্চ্যুয়াল মাধ্যম। কিন্তু একচ্যুয়াল ঘটনা সেখানেও ঘটছে। এই স‌োশ্যাল সাইটে মানুষ আসে কেন? আসে মূলত নিজের কথা বলতে। নিজেকে প্রকাশ করতে। নিজেকে দেখাতে। নিজেকে জাহির করতে। বহুজনের ভিতরে নিজের বৈশিষ্টকে তুলে ধরতে। এবং এই পথে আমরা প্রত্যেকেই আশা করি আমাদের এমন একটি বন্ধুবৃত্ত গড়ে উঠবে। যে বৃত্তে সকলেই আমার কথার প্রতিধ্বনি করে চলবে। সকলেই কম বেশি আমার কথার সমর্থনে বক্তব্য রাখবে। আমি যখন যা প্রকাশ করবো। লেখা হোক ছবি হোক। অডিও হোক ভিডিও হোক। বাকিরা তাতে তাদের সমর্থন ব্যক্ত করবে। আমরা তাই লাইক চাই। সমর্থন চাই। আমার কথার সমর্থন চাই। আমার পোস্টের শেয়ার চাই। এবং এই ভাবে যাঁরা যত বেশি আমার পাশে থাকবেন। তাঁরাই তত বেশি আমার বন্ধু ও ফলোয়ার। রাষ্ট্রশক্তির মতো প্রশাসনের মতো আমরাও আমাদের নিজস্ব একটা জনসমর্থনের ভিত তৈরীর প্রয়াসেই মগ্ন থাকি।


কিন্তু তাল কেটে যায় তখনই। যখন কেউ আমার প্রকাশের বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তোলে। কেই আমার বক্তব্যকে খণ্ডন করতে যুক্তিজাল বিস্তার করতে থাকে। কেউ আমার আচরণের ব্যবহারের সমালোচনা করে ফেলে্। আমি আপনি আমরা সকলেই কম বেশি রাষ্ট্রশক্তির মতো প্রশাসনের মতোই তখন প্রথমে ক্ষুব্ধ হই। তারপরে ক্রুদ্ধ হই। এখন ক্ষুব্ধ হই তখনই যখন আমার স্বপক্ষে যথেষ্ট শক্তিশালী যুক্তি পেশ করতে পারি না। আর ক্রুদ্ধ হই তখনই যখন দেখি আমার বিরুদ্ধ সমালোচনাও কিছুটা হলেও জনসমর্থন পেয়ে যাচ্ছে। কিন্তু রাষ্ট্রশক্তির মতো প্রশাসনের মতো আমাদের হাতে তো জনতার কন্ঠরোধ করার মতো কোন আইন থাকে না। তখন আমরাও শাসকদলের মতো প্রথমে কাঁদুনি গাইতে থাকি। আমাদের সমালোচকদের বিরুদ্ধে নিজেদের স্বপক্ষে একটা ভাবাবেগ গড়ে তুলতে। ফেসবুকের ওয়াল থেকে ওয়াল ঘুরে দেখলেই এর প্রমাণ পাওয়া যায়। সকলে মিলে একজনকে কোনঠাসা করতে থাকি। কারণ একটাই। তাঁর যুক্তিগুলি খণ্ডন করার মতো যথেষ্ঠ শক্তিশালী যুক্তি নিজের ভাণ্ডারে না থাকা। এরপরেও যদি নিজের ভিতরের ধুমায়িত ক্রোধ প্রশমিত না হয়। তখন আমরাও রাষ্ট্রশক্তির মতো, প্রশাসনের মতো আইনের সুযোগ খুঁজি। খুঁজতে থাকি। ফেসবুকের কথাই যদি ধরা যায়, তখন আমরা আমাদের পেটোয়া স্তাবকবৃত্তকে অনুরোধ করতে থাকি। অমুকের বিরুদ্ধে সমবেত রিপোর্টিং করতে। সকলে মিলে নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে ফেসবুকে ব্লক করে দিতে। হ্যাঁ এই দুইটিই আমাদের শেষ অস্ত্র। এমন কি সেরকম দরকার পড়লে আমরা নির্দিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ মিথ্যা অভিযোগের ফিরিস্তি দিয়েও রিপোর্টিং করতে দ্বিধা করি না। যদি আমাদের স্তাবকবৃত্ত দলে বেশ ভারি হয়। উদ্দেশ্য একটিই। নির্দিষ্ট ব্যক্তির ফেসবুক কিংবা টুইটার আইডিই বন্ধ করিয়ে দেওয়া। রাষ্ট্রশক্তির প্রতিশোধ নেওয়ার ধরণ আর আমাদের প্রতিশোধ নেওয়ার ধরণের ভিতরে বিশেষ কোন পার্থক্য আছে কি আদৌ?


তাহলে দেখা যাচ্ছে। রাষ্ট্রশক্তিই হোক প্রশাসনই হোক। আর শাসকদলই হোক। যার হাতে ক্ষমতা। কিংবা ব্যক্তি মানুষই হোক। সেই’ই তার বিরুদ্ধ সমালোচনা বরদাস্ত করতে রাজি নয়। সেই’ই সর্বতোভাবে সচেষ্ট হয় তার সমালোচকের কন্ঠরোধ করতে। প্রায়শই দলবদ্ধ শক্তিতে। সংঘবদ্ধ ভাবে। ক্ষমতার ঔদ্ধত্যে। আত্মম্ভরি অহংকারে। শক্তিমত্ততার আস্ফালনে। রাষ্ট্রশক্তির বিচ্যুতি প্রশাসনের বিচ্যুতিগুলি আমাদের চোখে ধরা পড়লেও, আত্মবিচ্যুতি আমাদের চোখে ধরা পড়ে না কোনদিন। কারণ, রাষ্ট্রশক্তিই হোক আর প্রশাসনই হোক। কিংবা শাসকদলই হোক আর আমি আপনিই হই। লেন্সের ফোকাসটা কখনোই নিজের দিকে ধরা থাকে না। তাই নিজেকে দেখতে পাওয়াই সবচেয়ে কঠিন কাজ। সে দুইবেলা যত সেল্ফিই তুলি না কেন। আমরা অধিকাংশই নিজেকে দেখতে শিখি না। সারাজীবন ধরেই আত্মান্ধ হয়ে পড়ে থাকি। তাই নো সমালোচনা। ওনলি স্তাবকতা। হয় আমার সাথে থাকুন। নয় নিশ্চুপ থাকুন। অন্যথায়………


২৮শে মে’ ২০২১

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত