সাপে নেউলে

 

বই আর বাঙালি। সম্পর্কটা কি অনেকটা সাপে নেউলের মতোন? জানি, এমন কথায় বাঙালি মাত্রেই চটে উঠবেন। সেটাই স্বাভাবিক। ঢাকা আর কলকাতা। একুশের গ্রন্থমেলা আর কলিকাতা পুস্তকমেলা। দুটিই আন্তর্জাতিক স্তরে প্রখ্যাত। ঢাকার বাংলা বাজার। কলকাতার কলেজস্ট্রীট। বাঙালি লেখক ও পাঠকের তীর্থক্ষেত্র। এবং রবীন্দ্রনাথ। সাহিত্যে বাঙালির নোবেল প্রাপ্তি। সেই একবার। তারপর এক শতাব্দী সময় চলে গেলেও ঐ একটি নোবেলের ওজনেই আমরা এখনো করে খাচ্ছি। সেই বাঙালির বই প্রীতি নিয়ে প্রশ্ন তুললে পাবলিক ছেড়ে দেবে নাকি? কিন্তু বাঙালির বই প্রীতির কথা বলতে গেলে। প্রথমেই বলতে হয়, কারুর কাছ থেকে বই চেয়ে নিয়ে এসে সেই বই তাকে ফেরত দেওয়ার বিষয়ে আমাদের ঐতিহাসিক অনীহার কথা। পদার্থ বিজ্ঞানের সূত্রের মতোন এই অনীহা সর্বাত্মক হলে বই প্রীতিও মারাত্মক হওয়ারই কথা। কিন্তু অধিকাংশ সময়েই দেখা যায়, আমরা যত বই কিনি তত বই পড়ি না। যত বই সংগ্রহ করি তত বই খুলে দেখি না। যত বই পড়তে শুরু করি তত বই শেষ অব্দি পড়ি না। যত বই শেষ অব্দিও বা পড়ি, তত মনে রাখতে পারি না। যতখানি মনেও রাখতে পারি ততখানি আন্য কারুর সাথে আলোচনাও করি না। ফলে আমাদের বই প্রীতির বিষয় যত কম বলা যায়। তত বেশি ভালো। জাতিগত মর্য্যাদা রক্ষা হয়। নাহলে বড় বিব্রত বোধ করতে হয়।


বইয়ের সাথে বাঙালির সম্পর্ক ঠিক সাপে নেউলের মতোন না হলেও, আর যাই হোক না কেন অন্তত উত্তম সুচিত্রা জুটির মতোন হট কিংবা হার্টথ্রবিং নয়। বাঙালি আর যাই হোক। বই নির্ভর জাতি নয়। সেদিক দিয়ে দেখলে আমরা সত্যিই স্বাধীন। যে সব জাতি বই হাতে করে বসে থাকে। আমরা তেমন নই। বইয়ের সাথে আমাদের সম্পর্ক ছেলেবেলার, মেয়েবেলার। তারপর বয়বৃদ্ধির সাথে মাস্টারের নোট মুখস্ত করতে করতে বাঙালির ছেলেমেয়েরা একদিন বইয়ের সাথে সম্পর্ক হারিয়ে ফেলে। আর সংসারে প্রবেশ করলে সেই সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের তো আর কোন প্রশ্নই ওঠে না। স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয়ের রকমারি ডিগ্রিধারী শিক্ষিত বাঙালির ঘরে ঘরে বই পড়ার রেওয়াজ বিশেষ দেখা যায় কি? হ্যাঁ কিছুটা নিশ্চয় দেখা যায়। বিশেষ করে কলাবিভাগ থেকে পাশ করা বাঙালির ভিতরে বই নিয়ে কিছুটা হলেও আত্মশ্লাঘার জায়গা একটা থাকেই। কিন্তু তার বাইরে নেহাৎ পেশা গত প্রয়োজন ছাড়া এবং সংসারে কচিকাঁচাদের পাঠ্য বইয়ের বাইরে বই ও বইয়ের চর্চায় বাঙালিকে বড়ো একটা দেখা যায় না। এটা অধিকাংশ বাঙালির ক্ষেত্রেই সত্য। বিশেষ করে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করা বাঙালির ক্ষেত্রে। সে বাঙালি বিশ্বের যে প্রান্তেই থাকুক না কেন। সারাদিন বাঙালির শত ব্যস্ততার ভিতরে অন্তত বই পড়ার কোন ব্যস্ততা থাকে না। কাউকে কোনদিন বলতে শোনা যায় না, অমুক সময়ে আমার সময় হবে না কারণ সে সময়ে আমি বই পড়তে ব্যস্ত থাকবো। সমাজ সংসারে হাজারো ব্যাস্ততার ভিতরে বাঙালির জীবনে অন্তত বই পড়ার কোন ব্যস্ততা নেই।


যদি মনে করি। বাঙালির জীবনে ব্যস্ততার কারণেই বই পড়ার মতোন অবসর নেই। তাহলে লন্ঠনও হেসে উঠবে। কারণ সেটিও বাঙালির তৈরী নয়। বস্তুত তালপাতার হাতপাখা আর বেতের বোনা ধামা কুলো ছাড়া বাঙালির দৈনন্দিন জীবনে প্রয়োজনীয় কোন জিনিসই বাঙালির মস্তিষ্ক প্রসূত নয়। সবই আমদানী করা প্রযুক্তি। বাঙালির মাথা প্রযুক্তির উদ্ভাবনে ব্যস্ত নয়। ব্যবহারে ব্যস্ত। ফলে অবসরের অভাবে আমাদের মধ্যে বই পড়ার চল নেই বললে সম্পূর্ণ মিথ্যা কথাই বলা হয়। আমরা বই পড়ি না। কারণ বই পড়তে আমাদের ভালো লাগে না। পড়াশুনো শেষ। বই পড়াও শেষ। সিলেবাসের বাইরে বই পড়ার রেওয়াজ খুব কম বাঙালির ভিতরেই দেখা যায়। ফলে সিলেবাস অনুসরণের আর দরকার না থাকলে বই পড়ারও দরকার থাকে না। খুবই সাধারণ সমীকরণ। খাঁটি বঙ্গীয় ফর্মুলা। আমরা অধিকাংশ বাঙালিই এই ফর্মুলায় অভ্যস্থ জীবনযাপন করে থাকি। আর সেই কারণেই আমাদের দেশে বই প্রকাশের বাজার মূলত পাঠ্য বই ছাপিয়ে টিকে থাকার চেষ্টা করে থাকে। বাকিটুকুর জন্যেই একুশের গ্রন্থমেলা কলিকাতা পুস্তকমেলা। আর জেলায় জেলায় বাৎসরিক বইমেলা। অর্থাৎ বাঙালি বইয়ের কাছে যেতে রাজি নয় বলেই বইকেই বাঙালির দূয়ারে কড়া নাড়তে আসতে হয়। বছরে একবার। নাহলে বই প্রকাশের বাণিজ্য ও তাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা নানান পেশা বন্ধ হয়ে যাবে।


আমরা যদি বইপ্রেমী হতাম। আমরা যদি বই পাগল হতাম। অন্তত উন্নত বিশ্বের অন্যান্য জাতিগুলির মতোন। তাহলে আমাদের শহরে গঞ্জে মফঃস্বলে এমন কি নগরেও এত কম বইয়ের দোকান দেখা যেত না। আপনি যে শহরে গঞ্জে নগরেই থাকুন না কেন। আপনিও জানেন সবচেয়ে কম যে জিনিসের দোকান দেখা যায়। সেটা বইয়ের দোকান। তার থেকে অনক বেশি মদের দোকান দেখা যাবে আপনার এলাকায়। সম্প্রতি লকডাউনের বাজারে মদের দোকানে যেমন বাঙালির লম্বা লাইন দেখা যাচ্ছে। তার দশভাগের একভাগও বইয়ের দোকানে দেখা যায় না। এমনই বাঙালির বই প্রীতি। সারা বছর বিভিন্ন জিনিসের পিছনে আমাদের একটা বাজেট থাকে। প্রায় প্রত্যেক সংসারেই থাকে। আমরা বলছি শিক্ষিত স্বচ্ছল পরিবারের কথা। কিন্তু কয়টি পরিবারে বইয়ের জন্য নির্দিষ্ট কোন ব্যায় বরাদ্দ থাকে? না। বইয়ের পিছনে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে রোজগার করা অর্থের অপচয় সম্ভব নয়। এটাই বাঙালির মটো। মাথা পিছু দুটি তিনটি স্মার্ট ফোন থাকতে হবে। এই পকেটে ওই পকেটে। কিন্তু পরিবার পিছু অন্তত একটি বইয়ের আলমারি থাকা একটা লাক্সারি ব্যাপার। বাঙালির টাকার মূল্য আছে। বাঙালি তাই পারত পক্ষে বইয়ের দোকান মুখো হতে রাজি নয়। হলেই অর্থের অপচয়।


বেশ। ভালো কথা। বই পড়তে গেলে কিনেই যে পড়তে হবে এমনটাও তো নয়। বই পড়ার জন্যে পাবলিক লাইব্রেরীও তো রয়েছে। সেখানে সদস্য হলেও তো বই পড়ে নেওয়া যায়। তা যায়। কিন্তু অত সময় কোথায় আমাদের? অবসরটুকুও যদি লাইব্রেরী থেকে বই নিয়ে এসে পড়তেই নষ্ট হয়। তবে তো মহা মুশকিল। না, বাঙালির হাতে নষ্ট করার মতোন যথেষ্ঠ অবসর নেই। পিএনপিসি করা, পাড়ায় পাড়ায় রাজনীতির কুটকাচালি করা, ঘরে বসে সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং করা, সিরিয়াল দেখা বাদ দিয়ে বই মুখে করে বসে থাকার জন্য নিশ্চয় জন্ম হয় নি বাঙালির। তাই পাবলিক লাইব্রেরীগুলিতেও কোন ভিড় নেই। বইয়ের দোকানেও কোন ভিড় নেই। ঘরে ঘরে বই নিয়ে বসে থাকা বাঙালিরও দেখা নেই। বাঙালির হাতে অত সময় নেই। তার অনেক কাজ আছে। না, নতুন নতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবনের কাজ নয়। নতুন নতুন বিজনেস এন্টারপ্রাইজ গড়ে তোলার কোন কাজ নয়। নতুন নতুন বৈজ্ঞানিক গবেষণার কোন কাজ নয়। নতুন নতুন অগম্য স্থানে অভিযানেরও কোন কাজ নয়। বাঙালির কাজ নিজের চরকায় তেল দেওয়ার। বাঙালির কাজ আখের গুছিয়ে নেওয়ার রাজনীতি করার। বাঙালির কাজ বাঙালিকে টেনে নামানোর। বাঙালির কাজ পিএনপিসি’র। বাঙালির কাজ নোট মুখস্থ করে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি হাসিল করার। বাঙালির কাজ ফর্মুলা মুখস্থ করার। বাঙালির কাজ প্রযুক্তির নকল করার। বাঙালির কাজ পণ্য তথ্য ও তত্ব আমদানী করার। বই মুখে বসে থাকার সময় আমাদের নেই।


তাই যেখানেই বাঙালি। সেখানেই বইয়ের সাহারা। যেখানেই বাঙালি। সেখানেই বাঙালি লেখকদেরকে জীবিকা নির্বাহের জন্য লেখা বাদ দিয়ে অন্য কোন পেশায় নিযুক্ত হওয়া। যেখানেই বাঙালি সেখানেই সিলেবাসের পাঠ্যবই ছাপিয়ে বই প্রকাশনীর বাণিজ্যে টিকে থাকার সংগ্রাম। যেখানেই বাঙালি সেখানেই পাবলিক লাইব্রেরীগুলি বন্ধ হওয়ার মুখে। যেখানেই বাঙালি সেখানেই বইয়ের ব্যবসায় পুঁজির অভাব। যেখানেই বাঙালি সেখানেই বই, সময় ও অর্থের যুগপৎ অপচয়।


২৫শে মে’ ২০২১

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত