স্ত্রীলিঙ্গ অবরোধ

 

আমাদের আটপৌরে জীবনের চৌহদ্দীতে পুরুষতান্ত্রিক জীবনবোধের পরিসরে কেমন নারীকে জীবনসঙ্গী হিসেবে পেতে চাই আমরা?  উচ্চশিক্ষিত, শিক্ষিত, আধাশিক্ষিত, অশিক্ষিত পুরুষ প্রজাতির ব্যক্তিরা? অবশ্যই আমাদের শিক্ষা দীক্ষা রুচি আর্থসামাজিক প্রেক্ষিতের ভিত্তিতে এই চাহিদা বিচিত্ররকম ভাবেই ভিন্ন রকমের হবে ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে তার একটা শ্রেণী চরিত্রের বিন্যাসও খুঁজে পাওয়া যেতে পারে নিবিড় বিশ্লেষণের উদ্যোগে এবং এই ভিন্নধর্মী প্রত্যাশার মাপের মধ্যে পছন্দের নারীর কাছ থেকে কত কি পাওয়ার স্বপ্নে আমাদের যাবতীয় উদ্যোগ উদ্বোধিত হয়ে থাকে কিন্তু সেই স্বপ্নের অন্তর্বাসের আড়ালটুকু মুক্ত করলে দেখি, নারীকে আমরা বশ করতেই চাই হ্যাঁ, আবহমান কাল ধরে নারীর কাছে আমরা বশ্যতাই আশা করে এসেছি নারীর প্রতি আমাদের প্রেম প্রীতি ভালোবাসা, অন্তর্লীন সেই আশার প্রেক্ষিতেই আমাদের চেতনার অলিন্দে জায়মান হয় নারীকে অধিকার করার প্রয়োজনেই বিবাহপ্রথার উৎপত্তি নারীকে নিজের বশে আনার মধ্যেই  পৌরুষের সার্থকতা আর তাই পুরুষমনের আশা আকাঙ্খাগুলি সেই প্রেক্ষিতেই নারীকে ঘিরে আবর্তিত হয় যে নারীকে বুকের মধ্যে আলিঙ্গনাবদ্ধ করে তার নরম ওষ্ঠে ওষ্ঠ ডুবাই, ঠিক নিবিড় চুম্বনের সেই নীরব নিভৃত মাহেন্দ্রক্ষণে মন তৃপ্ত হয় সেই অধিকার বোধেরই সক্রিয় পরিতৃপ্তিতে নারীর ভালোবাসায় নয় নয় তার চুম্বনের আস্বাদনে তৃপ্তি আমার অধিকারবোধের চৌহদ্দীতে নারীর আত্মসমর্পণে


এই যে আত্মসমর্পন এই আত্মসমর্পনটিই মূলত নারীর কাছে প্রত্যাশা পুরুষের নিজের টাকা কড়ি বাড়ি গাড়ির মতোই নিজের নারী, নিজস্ব রমণী এক বা একাধিক সেখানেই পুরুষার্থের তৃপ্তি পুরুষাকারের গৌরব আর এই কারণেই মেয়েবেলা থেকে মেয়েদের কৈশোর দুমড়ে মুচড়ে শুরু হয় তাদের চেতনাকে বিবাহোন্মুখ করে তোলার পর্ব শ্বশুরবাড়ীর সাথে মানিয়ে নেওয়ার শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে হয় মেয়েদের পুরুষের ভোগের উপযুক্ত করে গড়ে তোলার এই প্রথার সাথে মানিয়ে নেওয়াকেই নারীত্বের মহিমার কোমল প্রবৃত্তি হিসেবে বন্দনা চলতে থাকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে তাই পুরুষের চেতনায় নারী স্বামীভোগ্যা রূপেই প্রতিভাত হয়ে আসছে আবহমান কালব্যাপী আর ঠিক এরই প্রতিবাদে  তার শেষ বয়সে লেখা চোরাইধন গল্পে রবীন্দ্রনাথ বল্লেন, "দাম্পত্যের স্বত্ব সাব্যস্ত করতে হয় প্রতিদিনই নতুন করে, অধিকাংশ পুরুষই ভুলে থাকে এই কথাটা তারা গোড়াতেই কাস্টম্ হৌসে মাল খালাস করে নিয়েছে সমাজের ছাড়চিঠি দেখিয়ে, তার পর থেকে আছে বেপরোয়া" স্বামীর অধিকারে স্ত্রীর স্বাধীন ব্যক্তিসত্ত্বার নিঃশর্ত আত্মসমর্পনের সনদটিই ফুলশয্যার মহিমা হিসেবে প্রচারিত হয়ে এসেছে আবহমান কালের ধারায় আশ্চর্য্যের বিষয়, নারী জীবনের এমনই এক অভিশপ্ত ক্ষণটিকেই জীবনের পরমলগ্ন বলে বিশ্বাস করানো হয় মেয়েদের এবং পুরুষতন্ত্রের নানাবিধ প্রচার যন্ত্রের সিংহনাদে নারী সহজেই এই অন্যায়কেই কাঙ্খিত সত্য বলে ধরে নেয় এইভাবেই নারীর ব্যক্তি স্বাধীনতাকে পুরুষের ব্যক্তিস্বাধিকার বোধের কাছে আত্মবলিদানে প্রস্তুত করা হয় পুরুষতান্ত্রিক এই সমাজ ব্যবস্থায় বিবাহের পর নারীর পতিগৃহে যাত্রার মধ্যেই নারীকে আত্মসমর্পনের এই অলিখিত নিয়মটি মেনে নিতে শিখিয়ে দেওয়া হয় ফলে প্রতিটি পুরুষের চেতনায় নারী এই ভাবেই গৃহশোভা, আসবাব, ব্যবহার্য্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীর মতোই পুরুষের অধিকারের বস্তুতে পরিণত হয় আর সেই অধিকারের পরিসরেই নারীর শরীর ও তার শ্রমের উপর পুরুষের একাধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয় নিরঙ্কুশ ভাবে এবং সেই একাধিপত্য রক্ষার ব্যাপারে রক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়, সামাজ ও ধর্ম আর সেই খাঁচার মধ্যেই মানিয়ে নেওয়াই নারীত্ব বলে মহিমান্বিত হয় প্রচলিত সকল ধর্মেই নারীকে পুরুষের অধিকারের সামগ্রী করে রাখা হয়েছে নারীকে তার বেশি কোনো সম্মানের জায়গা দেওয়া হয়নি আর সমাজপতিরা নারীর অধিকারের পরিসরকে খর্ব করে রাখতে সেই ধর্মেরই দোহাই পেরে থাকেন সমাজ সংসারের এই পুরুষতান্ত্রিক আবহাওয়ার মধ্যেই মেয়েদের বেড়ে ওঠা ফলে কতভাবে এই সামাজিক বিধানের পরিসরে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিয়ে জাগতিক সুখ স্বাচ্ছন্দ ভোগ করা যায়, অর্জন করা যায় শারীরীক ও আর্থিক নিরাপত্তার বলয়, নরীর ধ্যান ধারণায় সেই চিন্তাই পুষ্ট হতে থাকে নিরন্তর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পরিপুষ্ট হয় না তার স্বাধীন মেধার মৌলিক বিকাশের সম্ভাবনার ধারাটি, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে এটাই তাকে বশীভূত রাখার সহজতম উপায়


পুরুষতন্ত্রের এই পরিকাঠামোর ঘেরাটোপেই জন্ম আমাদের তাই সুন্দরী রূপসী যৌবনবতী রমণী দেখলেই আমাদের হরমন সক্রিয় হয়ে ওঠে নারীর প্রেমে পড়তে তার রূপ যৌবন সৌন্দর্য্যই আমাদের কাছে প্রথম ও প্রধান শর্ত হয়ে দাঁড়ায় বরং মেধাবী ও স্বাধীন ব্যক্তিত্বের অধিকারী আত্মপ্রত্যয়ে দৃঢ় নারীকে আমরা যথাসম্ভব এড়িয়ে চলি এবং কার্যক্ষেত্রে স্বার্থের প্রয়োজনে দলবদ্ধ ষড়যন্ত্রে সেরকম নারীকে কোণঠাসা করতে অতিসক্রিয় হয়ে উঠি আমাদের কাছে নারী আমাদের ইচ্ছাধীন স্বয়ংক্রিয় পুতুল ছাড়া আর কিছু নয় আমাদের প্রয়োজন প্রত্যাশা রুচী ও শিক্ষা দীক্ষার মাপে নারীকে নিজের ঘর সাজানোর মতো করে সাজিয়ে নিতে পারলেই আমরা খুশি হয়ে তাকে আদরে মুড়ে রাখি আর নিজেদের প্রত্যাশার মাপে নারীকে নিজেদের ইচ্ছাধীন করে ঘর সাজানোর মতন করে সাজিয়ে নিতে না পারলেই আমাদের জান্তব পেশি শক্তির আস্ফালন শুরু হয়ে যায় ঘরে ঘরে আমরা তাই বলে নারীবিদ্বেষী নই মোটেই আমাদের নারী প্রেম-- অর্থ সম্পদ যশ খ্যাতি বাড়ি গাড়ির মতোই নিজেদের অভিরুচীর পরিমাপে জায়মান সেই মতোই নিজের স্ত্রীর শরীর ও মনের উপর আমাদের দখলদারী আমাদের সেই স্বত্বই নারীর লক্ষ্মণরেখা যার ভিতরে নারী সতী বাইরে বেরোলেই অসতী পৃথিবী জুড়ে সমস্ত ধর্মেই এই ভাবেই নারীকে অবরুদ্ধ করে রাখার প্রয়াস আর এই যে নারীর শরীর ও মনের উপর পুরুষের, পুরুষতন্ত্রের এই নগ্ন দখলদারী এটাই লিঙ্গ সাম্রাজ্যবাদ এই লিঙ্গ সাম্রাজ্যবাদেরই শিকার নারী, ঘরে বাইরে সমাজ সংসারে কন্যা রূপে, প্রেমিকা রূপে, স্ত্রী রূপে, জননী রূপে সমাজ সংসার ধর্মীয় লোকাচার শিক্ষাদীক্ষা কর্মক্ষেত্র সর্বত্রই এই লিঙ্গ সাম্রাজ্যবাদ নারীর শরীর ও মনের উপর, মেধা ও চেতনার উপর সাম্রাজ্যবাদী দখলদারী কায়েম রাখতে সদা তৎপর ঠিক সেই কারণেই নানাবিধ নিষেধ ও শাসনের জালে নারীর স্বাধীন ইচ্ছাকে পিষে ফেলার নিশ্ছিদ্র বন্দোবস্ত সর্বত্র এই লিঙ্গ সাম্রাজ্যবাদের কারণেই বস্তুত, নারীর নিরাপত্তা ও তার ব্যক্তিত্বের স্বাধীন মৌলিক বিকাশ কোথাও নিশ্চিত নয় আজও বরং নির্যাতন আর নিপীড়নের বৃত্তায়নে ঘুরতে থাকে নারীর ভাগ্য


এখন প্রশ্ন হল এই লিঙ্গ সাম্রাজ্যবাদের নাগপাশ থেকে মুক্ত হয়ে লিঙ্গসাম্য প্রতিষ্ঠার উপায় কি? উপায় একটাই, নারীকেই সেই উপায় খুঁজে বের করতে হবে পুরুষ বা পুরুষতন্ত্রের কাছে মানবিক ধর্মের দাবী করে তা হবে না মনে রাখতে হবে গড়তে গেলে ভাঙতে হবে এটাই প্রকৃতির বিধান তাই লিঙ্গ সাম্রাজ্যবাদ ভাঙ্গতে না পারলে গড়ে তোলা যাবে না লিঙ্গসাম্য এই ভাঙ্গার পদ্ধতি নিয়ে নানা মুনির নানা মত থাকতে পারে, সেটা কোনো বাধা নয়, বরং সুবিধে, সবরকম পথে অগ্রসর হলেই ভাঙ্গার কাজ দ্রুত সম্পন্ন হওয়ার সম্ভাবনা বেশি কিন্তু তার জন্যে নারীকেই মূল্য দিতে হবে সবচেয়ে বেশি কোনো সাম্রাজ্যবাদই সূচাগ্র মেদিনী ছেড়ে দেয় না বিনা যুদ্ধে মনে রাখতে হবে, শুরু করতে হবে ঠিক সেখানেই, যেখানে লিঙ্গ সাম্রাজ্যবাদ স্ত্রীলিঙ্গ অবরোধ করে বসে আছে; সেইখানেই বিদ্রোহের রণংদেহী পতাকা ওড়াতে হবে কে কিভাবে ওড়াবে সেটাও নারীর ব্যক্তিস্বাধীনতার পরিসরে বিচার্য্য বিষয় শুরু করতে হবে, যে নিয়ম রীতিগুলো নারীর জন্যে এক, আর পুরুষের জন্যে আর এক- সেই নীতিগুলিকে দুমড়ে মুচড়ে আস্তাকুঁড়ে ফেলার মধ্যে দিয়েই নারী তার শরীর মনের স্বাধীন আশা আকাঙ্খাগুলি চরিতার্থ করুক সমাজ সংসারের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করেই ব্যক্তিগত পরিসর থেকে শুরু করে যুথবদ্ধ সমষ্টিগত প্রয়াসের ব্যাপ্তিতেই অবরোধ যত তীব্র, আঘাতটাও তত ব্যাপক হওয়া প্রয়োজন পুরুষতন্ত্র প্রচারিত, লজ্জা নারীর ভুষণ, ভেঙ্গেই নারীর যে শরীর ও মনের ওপর পুরুষতন্ত্রের এই নির্লজ্জ দখলদারী, নারীর- নিজের সেই শরীর ও মনকেই লিঙ্গ সাম্রাজ্যবাদের পুরুষতান্ত্রিক দখলদারী থেকে মুক্ত করতে হবে হবেই প্রতিটি নারীর এটাই জন্মগত অধিকার ও দায়িত্ব হওয়া উচিত এই যুদ্ধ থেকে বিমুখ হলে নারীজন্ম বৃথা এই সারসত্যটি নারী যত দ্রুত অনুধাবন করবে সভ্যতার ততই মঙ্গল স্ত্রীলিঙ্গ অবরোধ করে সভ্যতার কোনো মঙ্গল সম্ভব নয় পুরুষতন্ত্র এই সত্য কোনোদিনই স্বীকার করবে না তাই নারীকেই এগিয়ে এসে সভ্যতার পরিচালনভার তুলে নিতে হবে আপন হাতে মুক্ত করতে হবে অবরুদ্ধ স্ত্রীলিঙ্গকে প্রতিটি নবজাতকের কাছে এটাই হোক প্রতিটি নারীর নারীদিবসের প্রথম অঙ্গীকার


৩রা মার্চ’ ২০১৪


কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত