১৪ই আগস্ট কাঁটাতার দিবস

 

১৪ই আগস্ট’ ১৯৪৭। পৃথিবীর ইতিহাসে বাঁধিয়ে রাখার মতো একটি দিন। এই দিন বাঙালি নামক একটি প্রজাতির মাতৃভূমিকে বেশ কিছু অবাঙালি জাতিগোষ্ঠী মিলে ইংল্যাণ্ডের তত্ত্বাবধানে দুই ভাগে ভাগ করে দেয়। না, সেইদিন বাঙালি নামক সেই প্রজাতিটির কিছুই এসে যায় নি সেই ঘটনায়। বরং হিন্দু এবং মুসোলমান নামক দুইটি ভিন্ন সম্প্রদায়ে আড়াআড়ি ভাগ হয়ে যেতে পেরে দুই সম্প্রদায়ের বাঙালিই সেদিন উৎসবে মেতে উঠেছিল স্বাধীনতার আনন্দে। একদিন আগে পিছে। খাতায় কলমে স্বাধীনতার অর্থ ব্রিটিশের অধীনতার নাগপাশ থেকে মুক্তিলাভের বিষয় ছিল ঠিকই। কিন্তু, বাঙালি নামক প্রজাতিটির মনের আনন্দে সেদিনের স্বাধীনতার আসল অর্থ ছিল হিন্দু মুসলিমের পারস্পরিক অধীনতা থেকে মুক্তিলাভ। এই যেমন আমি আপনি। আজ ২০২১ সালে এসেও কেমন সুন্দর হিন্দু আর মুসোলমান হয়ে বসে রয়েছি। সেদিন আমার এবং আপনার পূর্বপুরুষেরা মহানন্দে স্বাধীনতার আনন্দে মেতে উঠেছিলেন। ব্রিটিশের অধীনতা থেকে মুক্তিতে নয়। বাঙালি হিন্দু সেদিন আনন্দ করেছিল বাঙালি মুসলিমের থেকে আলাদা হতে পারার আনন্দে। বাঙালি মুসলিম সেদিন আনন্দ করেছিল বাঙালি হিন্দুর থেকে আলাদা হতে পারার আনন্দে। হিন্দু বাঙালির মাথার উপরে ছিল মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকারের অধীনস্থ থাকার রাজনৈতিক খাঁড়া। বাঙালি মুসলিমের মাথার উপরে ছিল হাজার বছরব্যাপী হিন্দু সামাজের আধিপত্যের সামাজিক খাঁড়া। এই দুই খাঁড়ার হাত থেকেই বাঙালি নামক প্রজাতিটির এই দুই হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ ১৯৪৭ সালের এইদিনে অর্থাৎ ১৪ই আগস্টে রক্ষা পেয়েছিল। সৌজন্যে অবাঙালি জাতিগোষ্ঠী সমূহ এবং তাদের বাঙালি প্রতিনিধিবৃন্দ। সংখ্যায় তারা কম হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ হিন্দু ও মুসলিম বাঙালি মাত্রেই সেদিন তাদের কাছে কৃতজ্ঞ ছিলেন নিঃসন্দেহে। ছিলেন বলেই না, ১৯০৫ সালের মতো সেদিন আর বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন গড়ে ওঠেনি। তাই বাঙালি নামক প্রজাতিটির হিন্দু এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের সকলেই এই ১৪ই আগস্টের কাছে এবং বাংলাভাগের কাণ্ডারী অবাঙালি জাতিগোষ্ঠী সমূহের কাছে চির কৃতজ্ঞ। আজ সেই কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনদিবস। আমাদের বাঙালি হিন্দু বাঙালি মুসলিমের ভিতরে আর যতই বিরোধ থাকুক না কেন। এই ১৪ই আগস্ট নিয়ে কোন বিরোধ নাই। বাঙালি নামক প্রজাতিটির উভয় সম্প্রদায়ের মানুষের কাছেই আজ উৎসবের তিথি। আজ বাংলা ভাগের দিন। আজ হিন্দু মুসলিমের নিজ নিজ অঞ্চল বুঝে নেওয়ার দিন। একান্নবর্তী পরিবার ভেঙে ভিন্ন হাঁড়ি নিয়ে আলাদা হওয়ার দিন। তাই আজ আমাদের স্বাধীনতার উৎসব। বাঙালি মুসলিমের হাত থেকে, বাঙালি হিন্দুর হাত থেকে, বাঙালি হিন্দু ও বাঙালি মুসলিমের স্বাধীনতা প্রাপ্তির উৎসব আজ।


আজ আমরা যারা বাঙালি হিন্দু। তারা কত নিশ্চিন্ত। বাঙালি মুসলিমের অধীনতায় আমাদেরকে আর বাস করতে হয় না। কিন্তু কবে যে বাঙালি মুসলিমের অধীনতায় আমাদেরকে বাস করতে হতো, সেই প্রশ্ন করলে ইতিহাসের বইয়ের কোন পাতাই হয়তো খুঁজে পাওয়া যাবে না। তার একটাই কারণ, বাংলা যতদিন মুসলিম শাসনের অধীনস্ত ছিল, সেই মুসলিম সম্প্রদায়ের কেউই বাঙালি ছিলেন না। নবাব সিরাজদৌল্লাও নন। মীরজাফরও নন। কিন্তু এটা খুব সত্যি, বাংলার সমাজ ব্যবস্থায় বাঙালি মুসলিমদেরকে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বাঙালি হিন্দু সমাজপতিদের তর্জন গর্জন সহ্য করতে হয়েছিল। আজকের দিন তাই বাঙালি হিন্দু সমাজের আধিপত্য থেকে বাঙালি মুসলিম সমাজের স্বাধীনতার দিন অবশ্যই। কিন্তু ১৯৪৭ সালের সেই মাহেন্দ্রক্ষণে বাঙালি মুসলিম সম্প্রদায় নিজেদেরকে পাকিস্তানী কল্পনা করে যে উৎসব পালন করেছিলো। স্বভাবতঃই সেই উৎসব বেশিদিন স্থায়ী হয় নি। দেশভাগের পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে হয়েছিল ১৯৭১’এর মুক্তিযুদ্ধের ভিতর দিয়ে। সেদিন বাঙালি মুসলিমের বুদ্ধির গোড়ায় জল ঢুকেছিল। মুসোলমান হলেই বাঙালি হওয়া যায় না। সব মুসলিমই বাঙালি নয়। পাকিস্তান আর বাংলায় আকাশ পাতাল পার্থক্য বিদ্যমান। পাকিস্তানীদের বেয়োনটের খোঁচায় বাঙালি মুসলিমের পাকিস্তানী হয়ে ওঠার খোয়াব মাত্র তেইশ বছরেই ছুটে গিয়েছিল। কিন্তু বাঙালি হিন্দুদের কপাল ভালো। তাদের হিন্দুস্তানীদের বেয়োনটের খোঁচা খেতে হয় নি এখনো। কারণ করাচীর ভুল দিল্লী করেনি কখনোই। কংগ্রেসের সেই প্রজ্ঞাটুকু ছিল। বেয়োনটের খোঁচায় তালুক হাতছাড়াই হয়ে যায়। লাভের লাভ কিছুই হয় না। বরং আজকে বাঙালি হিন্দু সমাজ নিজেই স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে সর্বতো ভাবে হিন্দুস্তানী হয়ে ওঠার সাধনায় নিবেদিত প্রাণ। বাঙালি হিন্দুর একটা বড়ো অংশই নিজেদের হিন্দুস্তানী জানে। ১৯৪৭-১৯৭১ পর্বে যেমন পূর্ব বাংলার অধিকাংশ বাঙালি মুসলিমই নিজেদেরকে পাকিস্তানী বলে জানতো। আজকে যদিও স্বাধীন বাংলাদেশে সেই পাকিস্তানপন্থীদেরকেই দেশদ্রোহী বলে মানা হয়ে থাকে। কিন্তু কাঁটাতারের এই পারে বাঙালি হিন্দু সমাজের ছবিটা অবশ্য ঠিক ১৯৪৭-১৯৭১ পর্বের পূর্ব বাংলার মতো। আজ আমরা অধিকাংশ বাঙালি হিন্দুই আগে নিজেদের হিন্দুস্তানী মনে করি। সেখানেই আমাদের দেশপ্রেমের নোঙর। তারপরে ভাগ্যবিড়ম্বনায় আমরা বাঙালি।


আমরা সেই ভাগ্য বিড়ম্বিত বাঙালি হিন্দুরা তাই সকল হিন্দুকেই স্বাজাতি মনে করে আহ্লাদে আটখানা হই। চেষ্টা করি সেই সেই স্বাজতীয় হিন্দুদের মাতৃভাষাতেই তাদের সাথে আলাপ করার। তাদের পোশাক পরিচ্ছদ, খাদ্যাভাস এবং সংস্কৃতি আমদানি করে আপন করে নেওয়ার প্রাণান্তকর প্রয়াসে আমরা ক্লান্তিহীন। আমরা তাই সেই সেই অবাঙালি হিন্দুদের সাথে একাত্মতা স্থাপনের প্রয়াসে তাদের ধর্মীয় আচার বিচার উৎসব অনুষ্ঠানও আমাদের সংস্কৃতিতে জুড়ে নিচ্ছি। তাই আমাদের বারো মাসের তেরো পার্বণ এখন ছাব্বিশ পার্বণের দিকে গড়িয়ে চলেছে দ্রুত। রামনবমী থেকে শুরু করে ধনতেরাস, গনেশ চতুর্থী, ছট পুজো, হনুমান পুজো, দশেরা আরও কত কি। কিছুই আর বাদ দেওয়ার উপায় নাই। আমাদেরকে যেভাবেই হোক হিন্দুস্তানী হয়ে উঠতেই হবে। বাঙালি হিন্দুর তাই এই ১৪ই আগস্ট হিন্দুস্তানী হয়ে ওঠার বাৎসরিকও বটে। না, বাঙালি মুসলিম অবশ্য পাকিস্তানী হয়ে ওঠার সংক্রমক রোগ থেকে ১৯৭১’ই মুক্তি পেয়ে গিয়েছে।


আজকের এই মহান তিথিকে কাঁটাতার দিবস হিসেবেও পালন করা যায় বই কি। আমি যখন হিন্দু আর আপনি যখন মুসলিম। তখন আমাদের আত্মপরিচয়ের ভিতরেই কি আমরা কাঁটাতার বসিয়ে রাখি নি? রেখেছি বলেই না, মাখনের ভিতরে ছুরি চালানোর মতোন করে একদল, বাঙালির মাতৃভূমিকে কেটে টুকরো টুকরো করে দিয়ে গেল। সেই ১৪ই আগস্ট ১৯৪৭’এ। আজ দেখুন সেই কাঁটাতারকে আমরা কেমন পল্লবিত করে তুলেছি। আমাদের হৃদয় দিয়ে। আমাদের সাধনা দিয়ে। আমাদের ধর্ম দিয়ে। আমাদের কর্ম দিয়ে। আমাদের স্বপ্ন দিয়ে। আমাদের সাধ্য দিয়ে। তাই আমি আজ যতটা না বাঙালি তার থেকে অনেক বেশি হিন্দু এবং হিন্দুস্তানী। আর আপনিও যতটা না বাঙালি, তার থেকে অনেক বেশি মুসলিম। আপনার কৃতিত্ব শুধু এইটুকুই। আপনি আজ আর আপনার পূর্বপুরুষের মতো পাকিস্তানী হয়ে ওঠার খোয়াবে মত্ত নন। কিন্তু আমরা হিন্দুস্তানী হয়ে ওঠার সাধনায় তৎপর। হিন্দুস্তানীরা আমাদের যতই বাঙালি মনে করুক না কেন। আমাদের মাছ মাংসের এঁটোকাটায় যতই তারা আমাদেরকে হিন্দু নই বলে মনে করুক না কেন। আমরা তো জানি আমরা কতটা হিন্দু। কতটা হিন্দুস্তানী। কতটা একাত্ম অবাঙালি হিন্দুস্তানীদের সাথে। কতটা ভিন্ন বাঙালি মুসলিমের থেকে।


বাঙালি মুসলিমের থেকে আমাদের সেই ভিন্নতার রেজিস্ট্রেশন দিবসও আজ। ১৪ই আগস্ট। আজ বিচ্ছিনতা দিবস। আজ বিভেদের তিথি। আজ বিদ্বেষের পার্বণও বটে। বাঙালি হিন্দু আর বাঙালি মুসলিমের রক্তের ভিতরে মিল শুধু এই এক জায়গায়। বিচ্ছিন্নতায়। বিভেদে। বিদ্বেষে। তাই এই দুই সম্প্রদায়ই নিজেদেরকে দুইটি ভিন্ন জাতিগোষ্ঠী বলে ভাবতে ভালোবাসে। অন্তরে শান্তি পায়। বাঙালি মুসলিম হয়তো আজ আর পাকিস্তানী নয়। কিন্তু বাঙালি হিন্দু আজ হিন্দুস্তানী তো বটেই। না হলে সেটা দেশদ্রোহ বলেই গন্য হবে। রাষ্ট্রের কাছে যতটা না, তার থেকে অনেক বেশি পরিমাণে সমাজের কাছে। বাঙালি হিন্দু তাই সেই ঝুঁকি নিতে রাজি নয়। বাঙালি হওয়ার থেকে হিন্দুস্তানী হওয়া বেশি নিরাপদ। আর সেই সঙ্গেই বাঙালি মুসলিমের সাথে বাঙালি হিন্দুর মাতৃভূমি আর মাতৃভাষার যে প্রাকৃতিক যোগটা রয়েছে। সেইটাকেই অস্বীকার করা যায় জোরের সাথে। ঠিক যেমন আজকের বাংলাদেশের বাঙালি মুসলিমরা বাঙালি হিন্দু বলতে বাঙালি বোঝে না। বোঝে ইণ্ডিয়ান। বোঝে হিন্দুস্তানী। বাঙালি নয়। বাঙালি হিন্দুর সাথে বাঙালি মুসলিমের মাতৃভূমি আর মাতৃভাষার যে যোগটা রয়েছে। সেটিকে ছিন্ন করতে এই তো একমাত্র পথ। বাঙালি মুসলিমের কাছে। ফলে ১৪ই আগস্টের গুরুত্বের কোন শেষ নেই বাঙালি নামক প্রজাতিটির কাছে। বাঙালি নামক এই প্রজাতিটি এই ১৪ই আগস্টের কাছে চির কৃতজ্ঞ। চির ঋণী। এই প্রজাতিটি আজ আর ভাবতেই পারে না। বাংলার ইতিহাসে ১৯৪৭ সালের ১৪ই আগস্ট না এসে পৌঁছালে কি হতো। যে ১৪ই আগস্ট বাংলা ভাগের কালো দিন হওয়ার কথা। সেই ১৪ই আগস্টই বাঙালি নামক প্রজাতিটির কাছে আজ কৃতজ্ঞতা দিবস। মুক্তি দিবস। চির ঋণের দিন। ঋণ সেই সেই অবাঙালি জাতিগোষ্ঠী সমূহের কাছে। যাদের স্বার্থে ১৯৪৭ সালের এই দিনে বাঙালি নামক প্রজাতিটির মাতৃভূমিকে খণ্ড বিখণ্ড করা হয়েছিল। আজ সেই ১৪ই আগস্ট। আজ সেই উৎসবের দিন। বাঙালি নামক এক প্রজাতির ইতিহাসে।


১৪ই আগস্ট’ ২০২১

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত