আত্মপ্রত্যয় ও আত্মশক্তির বর্ষপূর্তি

 

আজ বর্ষপূর্তি। আজ কৃষক আন্দোলনের পূণ্যতিথি। বিশ্বের বৃহত্তম গণ আন্দোলন। দীর্ঘতম দিন ধরে চলতে থাকা গণ আন্দোলন। দিল্লীর সীমান্তে টিকরি সিঙ্ঘু গাজিপুর ও রাজস্থান হরিয়ানা সীমানায় শাজাহানপুর বর্ডারে হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ কৃষক এক বছর ধরে অবস্থান করছে। সম্পূর্ণ শান্তিপুর্ণ ভাবে চলতে থাকা তাদের এই আন্দোলনকে বিপথগামী করার হাজার রকমের অপচেষ্টাকে রুখে দিতে দিতে প্রতিহত করতে করতেই এই আন্দোলন আজ বর্ষপূর্তির উদযাপন সমারোহ পালন করছে। এবং ইতিমধ্যেই আন্দোলনের একান্নতম সপ্তাহে, আন্দোলনের প্রথম দাবিকে সরকার পক্ষ মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে। হ্যাঁ নতুন তিন কৃষি আইন বাতিলের ঘোষণা হয়েছে মাত্র। সংসদীয় প্রক্রিয়ায় সেই আইন বাতিল করা এখনো বাকি রয়েছে। কথায় বলে না আঁচালে বিশ্বাস নেই। কিন্তু শিয়রে সমন। উত্তরপ্রদেশ পাঞ্জাব সহ পাঁচ রাজ্যের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচন। ফলে আসন্ন সেই নির্বাচনগুলিতে নিশ্চিত ভরাডুবির হাত থেকে রক্ষা পেতেই শাসকদলের প্রধানকে এই তিন কৃষি আইন বাতিলের ঘোষণা দিতে হয়েছে। ফলত আশা করাই যায় লোকসভার আসন্ন অধিবেশনে সংসদীয় প্রক্রিয়াতেই এই তিন কৃষি আইন পুরোপুরি বাতিল করা হবে। খুব ভালো কথা। এক বছর ধরে সরকার পক্ষ থেকে এবং সরকারপন্থী মিডিয়ার পক্ষ থেকে যে কৃষক আন্দোলনকে দেশবিরোধী খালিস্তানপন্থী মাওবাদী চিনপন্থী পাকিস্তানপন্থী দেশদ্রোহীদের আন্দোলন বলে জনমানসে লাগাতার প্রচার চালানো হচ্ছিল। অবশেষে সেই তথাকথিত দেশদ্রোহীদের দাবিকেই সরকার প্রধান মেনে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন অন্তত। কি আশ্চর্য্য সমাপতন। মিডিয়া ও শাসকদল কর্তৃক অভিযুক্ত দেশদ্রোহীদের দাবিকেই তবে সরকার সংসদীয় প্রক্রিয়ায় মান্যতা দেওয়ার কথা ঘোষণা করে দিয়েছে। না, এখন অব্দি সরকার ভক্ত সরকারপন্থী কোন মিডিয়াকেই দেশবাসীর কাছে মিথ্যা প্রচারের জন্য কোনরকম ক্ষমা প্রার্থনা করতেও শোনা যায়নি। তিন কৃষি আইন বাতিলের ঘোষণা দিয়ে দেশবাসীর কাছে ক্ষমাভিক্ষা করলেও, সরকার প্রধান লোকসভায় দাঁড়িয়ে আন্দোলনরত কৃষকদেরকে পরজীবী ও আন্দোলনজীবী বলে উপহাস করার জন্যে কিন্তু দেশের কৃষিজীবীদের কাছে কোন ক্ষমাভিক্ষা করেননি। সুখের কথা আন্দোলনরত কৃষকদের কেউই সেকথা বিস্মৃত হননি আজও। দেশের কৃষকদের লক্ষ্য স্থির। তাঁদের কাছে এইসব ক্ষমাভিক্ষা করা না’করা বিশেষ কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। তাঁদের কাছে অনেক বড়ো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দেশের কৃষিব্যবস্থাকে কর্পোরেট মুনাফার করালগ্রাস থেকে রক্ষা করা। তাঁদের কাছে অনেক বড়ো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কৃষককে প্রচলিত অর্থনৈতিক যাঁতাকল থেকে উদ্ধার করা। এই লক্ষ্যে স্থির থেকেই তাঁরা চালিয়ে নিয়ে চলেছেন তাঁদের এই আন্দোলনকে।


দিনের পর দিন একটানা এক বছর ধরে প্রবল পরাক্রান্ত সরকারের নীতির বিরুদ্ধে এই রকম জোটবদ্ধ আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া, সত্যিই ঐতিহাসিক। কোন একজন নেতার অন্ধভক্ত হয়ে নেতার নির্দেশ পালন করা এক বিষয়। আর ধর্ম বর্ণ ভাষা জাতি নির্বিশেষে মিলে শতাধিক কৃষক সংগঠনের যৌথ উদ্যোগে একাধিক নেতানেত্রী দ্বার পরিচালিত আন্দোলনকে একটানা দীর্ঘ দিন চালিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্পূর্ণ অন্য বিষয়। চলমান কৃষক আন্দোলনের ঐতিহাসিকতা এইখানেই। এই যে একতা। এই যে জোটবদ্ধতা। এ এক অভুতপূর্ব ঘটনা। এক তুলনাহীন নিদর্শন। আগামী দিনে এই কৃষক আন্দোলনের বিভিন্ন দিক নিয়ে গবেষণায় একাধিক বিষয় উঠে আসবে। এবং শুধু ভারতবর্ষেই নয়। বিশ্বজুড়ে পরবর্তী গণ আন্দোলনগুলি চলমান কৃষক আন্দোলন থেকেই প্রেরণা সংগ্রহ করবে সন্দেহ নাই। এতবড়ো একটি আন্দোলন। লক্ষ্ লক্ষ কোটি কোটি কৃষক যে আন্দোলনে সামিল। সেই আন্দ‌োলনের লক্ষ্য ও দিশা স্থির রাখা কতবড়ো কঠিন কাজ। বিশ্ব ইতিহাসের একাধিক গণআন্দোলনের ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকালেই সেকথা অনুধাবন করা যাবে সন্দেহ নাই। চলমান কৃষক আন্দোলনের আসল সাফল্য এখানেই। কৃষকরা একজোট হতে পেরেছে। জাতি ধর্ম বর্ণ ভাষা সংস্কৃতি নির্বিশেষে। কৃষকরা অনুধাবন করতে পেরেছে অর্থনীতির কোন প্যাঁচে আটকিয়ে গিয়েছে তাদের সুখ সমৃদ্ধি ও স্বস্তি। কৃষকরা উপলব্ধি করতে পেরেছে সরকার কাদের চৌকিদারিত্ব করছে। সরকার কাদের স্বার্থ রক্ষায় কৃষকদের বলি দিতে উদ্যত হয়েছে। অর্থাৎ কৃষকদের কাছে মূল শত্রু ও তাদের দোসর কারা। সেই বিষয়টি দিনের আলোর মতোন সুস্পষ্ট হয়ে গিয়েছে। তাই কৃষকদের লক্ষ্য, এমন একটা আইনী বন্দোবস্তের ভিত প্রস্তুত করা। যাতে কৃষকদের শত্রু যারা, তারাও সমঝে থাকতে বাধ্য হয়। তিন কৃষি আইন বাতিল ও কৃষিজাত পণ্যের উপরে ন্যূনতম সয়াহক মূল্যের আইন প্রণয়ন সেই বন্দোবস্তের অন্যতম দুইটি দিক। নতুন তিন কৃষি আইন চালু হতেই কৃষকরা অনুধাবন করতে পেরেছিল, সেই আইনের দীর্ঘমেয়াদী ফলাফল ও অভিশাপের স্বরূপ। তাঁরা অনুধাবন করতে পেরেছিল নিজেদের জীবন অভিজ্ঞতার ভিতর দিয়েই। ফলে তাঁদের দাবিগুলি সম্বন্ধে তাঁদের ভিতরে আত্মপ্রত্যয়ের কোন অভাব ছিল না। আর সেই আত্মপ্রত্যয়ই এতবড়ো আন্দোলনের জীয়নকাঠি। যা জাতি ধর্ম বর্ণ ভাষা সংস্কৃতি নির্বিশেষে কৃষকদের ঐক্যবদ্ধ হতে সাহায্য করেছে। সরকারপন্থী মিডিয়া থেকে শুরু করে সরকারী ক্ষমতার মধুভোগী শাসকদল ও রাষ্ট্রশক্তি’র কারুর পক্ষেই ঠিক এই কারণেই চলমান কৃষক আন্দোলনকে প্রতিহত করা সম্ভব হয়নি। অন্তত এখনো। কৃষক আন্দোলনকে বানচাল করে দেওয়ার সব রকমের অপপ্রয়াসকে কৃষকরা দৃঢ়চিত্তে রুখে দিতে সমর্থ্য হয়েছে।


কৃষক আন্দোলনের শেষ পরিণতি যাই হোক না কেন। এই আন্দোলন অনেকগুলি বিষয়কে দিনের আলোর মতো সত্য করে দিয়ে গেল। রাষ্ট্র যতই শক্তিশালী হোক না কেন। সেই রাষ্ট্রও প্রকৃত গণ আন্দোলনের সামনে অসহায় বোধ করতে শুরু করে দেয়। ফলে রাষ্ট্রের কত ক্ষমতা। সেই বিচারে না গিয়ে। আন্দোলনের প্রাসঙ্গিকতা কতখানি। সেটি আগে বিচার করে দেখার দরকার। আন্দোলনের মূল লক্ষ্য সম্বন্ধে প্রত্যেক আন্দোলনকারীর সুস্পষ্ট ধারণা থাকা প্রয়োজন। দিল্লীর সীমান্তে অবস্থানরত আন্দো‌লনকারী কৃষকদের সেই লক্ষ্য আজও স্থির রয়েছে। রয়েছে বলেই তিন কৃষি আইন বাতিলের ঘোষণাতেই তাঁরা আন্দোলনের সমাপ্তি ঘটানোর কথা ভাবার প্রয়োজনই বোধ করছেন না। এবং আত্মপ্রত্যয়। আজ থেকে ঠিক এক বছর আগে নভেম্বরের ছাব্বিশ তারিখে কৃষকরা যখন দিল্লী চলোর ডাকে দিল্লীর অভিমুখে রওনা দিয়েছিলেন। সেই দিনই তাঁরা জানতেন। এই আন্দোলন দুই একদিনের বিষয় নয়। অনেক ঝড়ঝাপটা পাড়ি দিতে হবে। অনেক ষড়যন্ত্র প্রতিহত করতে হবে। অনেক ধৈর্য্য ধরতে হবে। সে দুই এক দিনের বিষয় নয়। ফলে তাঁরা আন্দোলনের প্রথম দিন থেকেই দীর্ঘকালীন লড়াইয়ের মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিলেন। সেই মানসিক প্রস্তুতিতেই তাঁরা প্রথম দিনেই প্রায় মাস ছয়েকের মতো খাদ্য সম্ভার নিয়ে ট্র্যকটর ট্রলিতে রওনা নিয়ে ছিলেন পাঞ্জাব হরিয়ানা পশ্চিমী উত্তরপ্রদেশ উত্তরাখণ্ডের নানান প্রান্ত থেকে। কতটা আত্মপ্রত্যয় থাকলে এই ভরসা জন্মায় যে, যত দিনই লাগুক আর যত দেরিই হোক না কেন, তাঁরা তিন কৃষি আইন রদ করে কৃষিজাত পণ্যের উপরে ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের আইন আদায় করে তবেই ঘরে ফিরবেন। তাঁদের এই আত্মপ্রত্যয় থেকেই সেই আত্মশক্তির জন্ম ও উদ্বোধন হয়েছিল। যার বলে আজ তাদের প্রথম দাবি পুরণের অন্তত মৌখিক স্বীকৃতি দিতে হয়েছে সরকার প্রধানকে দেশবাসীর কাছে ক্ষমাভিক্ষা করে হলেও। বাকি দাবিগুলির পরিণতি কি হয়। সেকথা ভবিষ্যতই বলবে।


ভারতবর্ষের আর্থ-সামাজিক-রাজনীতির পরিমণ্ডলে চলমান কৃষক আন্দোলন যে শক্তির সঞ্চার করেছে তার মূল্য হয়তো ভবিষ্যতই নির্ধারণ করবে। আজকেই সেই বিষয়ে সঠিক পরিমাপ করা হয়তো সম্ভব নয়। কিন্তু দিগন্তরেখায় আজকে যে আলোর উদ্ভাসন দেখা দিয়েছে। তাতে আশায় বুক বাঁধতে আর বিলম্ব করা উচিত নয়। বর্তমান সরকারের যাবতীয় জনবিরোধী নীতি’র বিরুদ্ধে সময় থাকতে জোটবদ্ধ প্রতিরোধের ব্যবস্থা গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরী। কৃষকরা আমাদের দেখিয়ে দিয়েছে, রাষ্ট্রশক্তি যত বড়ো পরাক্রমশীলই হোক না কেন। আত্মপ্রত্যয়ের দৃঢ়তা যদি অটুট থাকে। তবে আত্মশক্তির উদ্বোধন অবশ্যাম্ভাবী। যে কোন গণ আন্দোলনের প্রাণভোমরা এই আত্মপ্রত্যয়ের দৃঢ়তা ও আত্মশ‌ক্তির উদ্বোধনের ভিতরেই লুকিয়ে থাকে। সাফল্য তার পরের বিষয়। 


২৬শে নভেম্বর’ ২০২১

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত