অসুখের সিমটম ও অসুখের দুর্গন্ধ

 

সাধারণ ভাবে অধিকাংশ শহুরে মধ্যবিত্ত নিম্নবিত্ত এবং উচ্চবিত্ত নাগরিক সম্প্রদায়ের ভিতরেই রাজনীতির বিরুদ্ধে একটা বীতস্পৃহা পরিলক্ষিত হয়। বিশেষ করে শিক্ষিত শ্রেণীর নাগরিক হলেই। ফেসবুকেই বহু গ্রুপ খোলা হয়। যেখানে শর্তই থাকে। রাজনীতি বিষয়ক কোন আলোচনা করা চলবে না। বহু মানুষকে বলতে শোনা যায়। রাজনীতির ভিতরে নেই বাবা। বিষয়টা যেন অনেকটাই এইরকম হয়ে দাঁড়িয়েছে, রাজনীতি খুব নোংরা বিষয়। আমরা ওর ভিতরে নেই। রাজনীতি নিয়ে কিছু বললে বা লিখলে শ্রোতা বা পাঠক পাওয়া যায় খুব কম। আর পেলেও দেখা যাবে, তারা কোন না কোন রাজনৈতিক শিবিরের দলদাস। ফলে দলদাসদের সেই অন্ধভক্তি আর অযৌক্তিক এবং ক্ষেত্র বিশেষে কুরুচিকর মন্তব্য থেকে শুরু করে অশ্লীল গালিগালাজ এড়িয়ে যাওয়ার জন্যেই পারতপক্ষে অনেকেই রাজনীতি নিয়ে কোন উচ্চবাচ্য করেন না। আরও একটি কারণ রয়েছে। শহুরে শিক্ষিত নাগরিকদের একটি সাধারণ প্রকৃতিই হলো, ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’। পাছে তাঁর রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব লোকসমাজে বেআব্রু হয়ে পড়ে, সেই ভয়েও বহু মানুষ রাজনৈতিক প্রসঙ্গ এড়িয়ে চলেন। এই কারণেই সোশ্যাল মাধ্যমগুলিতে রাজনৈতিক আলোচনার সুস্থ পরিসর প্রায় নেই বল্লেই চলে। আর সেই সুযোগেই রাজনৈতিক আলোচনার প্রায় পুরো দিগন্তটাই দলদাসদের দখলে চলে গিয়েছে। যাদের শিক্ষাদীক্ষা রুচি সংস্কৃতি এবং বোধবুদ্ধির দৌড় তাদের ভাষা ও ভাবনাতেই পরিস্কার ধরা পড়ে যায়। যে কারণে অনেকেই রুচির কারণেও তাদেরকে এড়িয়ে চলার জন্যেই রাজনীতির আলোচনাও এড়িয়ে চলেন। এ যেন অনেকটা, পুরসভার কর্মীরা রাস্তায় নর্দমার ময়লা উঠিয়ে রেখে দিলে, সেই রাস্তাটাই পরিহার করার মতো ব্যাপার। ফলে সাধারণ ভাবে সুস্থ সমাজিক পরিসর বলতে বর্তমানে আমাদের মানসপটে যে ছবিটা ফুটে ওঠে, সেই ছবিতে রাজনীতির বিষয়গুলি সম্পূর্ণ ব্রাত্য। বর্তমানে বাংলায় ও বাঙালির সমাজে এটা কিন্তু একটা জলন্ত সমস্য। আমরা প্রতিদিনই এই সমস্যাটিকে চোখবুঁজে এড়িয়ে যেতে থাকি। কিন্তু কথায় বলে ‘চোখ বন্ধ থাকলেই প্রলয় বন্ধ থাকে না’। উল্টে আত্মরক্ষা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। আমাদের সময় ও সমাজ ঠিক সেই প্রলয়ের দিকেই যেন ছুটে চলেছে আজকে, বহু দশক ধরেই।


এরই সাথে জুড়ে রয়েছে বর্তমানে বাংলার ও বাঙালির রাজনৈতিক সংস্কৃতি। গণতন্ত্র একটা সুযোগ। রাজকোষের দখল নেওয়া। সেই রাজকোষের দখল নেওয়ার লক্ষ্য ছাড়া রাজনীতির আর কোন দিশা পরিকল্পনা কিংবা সাধনা নেই। ফলে একজন রাজনীতিবিদ বলতেই আমাদের মানসপটে ভেসে ওঠে সুযোগ সন্ধানী দুর্নীতিগ্রস্ত বিবেকহীন আদর্শহীন অনেক সময়েই দুর্বিনীত, এবং ক্ষেত্র বিশেষে মাফিয়া গোত্রের অপরাধী চরিত্রের নেতানেত্রী। ক্ষমতা দখল ছাড়া আর কোন দিশা নাই। সাধনা নাই। কর্ম নাই। ফলে নির্বাচনের প্রাক্কালে হাওয়া বুঝে শাসকদল থেকে বিরোধী দলে যাওয়ার দলত্যাগী মিছিলে যেমন ভিড় লেগে থাকে। তেমনই নির্বাচনী ফলাফলে অনুমান উল্টে গেলে আবার বিরোধী দল ছেড়ে শাসকদলে ফিরে আসার জন্যেও লম্বা লাইন পড়ে যায়। এবং দুই ক্ষেত্রেই। বুলি সেই এক। ‘দলে থেকে জনসেবার কাজ করতে পারছিলাম না’। অর্থাৎ জনসেবার কাজ ততক্ষণই করা যায়, যতক্ষণ দল ক্ষমতায় থাকে। ফলে সাড়ে তিনদশকের রাজ্যপাট হারানো দলের সলতেতেও তেল ঢালার কর্মী পাওয়া যায় না। আবার হাওয়া বুঝে শাসকদলের নৌকাডুবি অনুমান করে আগেভাগেই বিরোধী শিবিরে ঝাঁপ দেওয়ার নেতানেত্রীরও কোন অভাব হয় না নির্বাচনী সমীক্ষায় ভর করে। এই যেখানে একটি দেশের ও জাতির রাজনৈতিক সংস্কৃতি। তখন তার একটাই কারণ। পচনটা সমাজের একেবারে গোড়া থেকে আগা অব্দি ছড়িয়ে গিয়েছে। পচনটা শুধুমাত্র রাজনীতিতেই সীমাবদ্ধ মনে করলে বাস করতে হবে মূর্খের স্বর্গে। এবং দুঃখজনক হলেও সত্য। আমরা সেই মূর্খের স্বর্গে বাস করেই রাজনীতির বিষয়গুলি এড়িয়ে গিয়ে নিজেকে পচনমুক্ত রাখার বৃথা নাটক করতে থাকি। আর তাই আমাদের অনেকেরই বেদবাক্য। ‘রাজনীতিতে নেই বাবা’।


না, আজকের আলোচনা রাজনীতি নিয়ে নয়। যে সামাজিক অবক্ষয় ও পচন বর্তমান রাজনীতির মূল অসুখ, সেই অসুখের বিষয়েই একটু আত্মসমীক্ষার প্রয়োজন রয়েছে। এই অসুখের প্রধান কয়েকটি সিমটম হল, রুগী একবার এই অসুখের কবলে পড়লেই সুযোগসন্ধানী হয়ে উঠবে। সুবিধেবাদী হয়ে দাঁড়াবে। পরশ্রীকাতর হবে। আইনের ফাঁক খুঁজতে থাকবে। ঘুষ আর নয়তো ঘুষির উপরে নির্ভর করতে শুরু করবে, যার যতটুকু ক্ষমতা, সেই অনুপাতে। দুনিয়াশুদ্ধ অসাধুর ভিতরে নিজেকেই একমাত্র সাধু বলে প্রচার করে যাবে। সময় এবং সুযোগ মতো আইনের ফাঁকগুলি কাজে লাগিয়ে নানান ধরণের অনৈতিক এবং দুর্নীতিমূলক কর্মের সাধনায় আত্মনিয়োগ করবে। সুবিধে মতো দুর্বৃত্তদের সাথে হাত মেলাবে। এবং বাজারের হাওয়া বুঝে যখন তখন শিবির বদল করবে। না, ভাই এই অসুখ থেকে আমি আপনি কেউই মুক্ত নই। সে আমরা রাজনীতি থেকে যে যত মাইল দূরত্বই বজায় রাখি না কেন। আমাদের পচনটা শুরুই হয় সম্ভবত পরীক্ষার হলে টোকাটুকির বিদ্যায় হাত পাকানোর ভিতর দিয়ে। সেই বিষয়ে অক্ষমতা কিংবা সাহসের অভাব থাকলে সেই মাস্টারই ধর, যাঁর সাজেশন মতো যত বেশি প্রশ্ন কমন আসে। বাবা মা’ অভিভাবক এবং শিক্ষার্থী উভয়েই দৌড় লাগাচ্ছে সেই বিশেষ মাষ্টারের কাছে। যত বেশি সাজেস্টেড কোশ্চেন যিনি মিলিয়ে দিতে পারেন। এবং তাঁর দেওয়া নোট মুখস্থ করো ঝেড়ে। পরীক্ষায় স্টার মার্ক্স লেটার মার্ক্স বাঁধা। কপালে থাকলে ৫১ জন প্রথম ষ্থানাধিকারীর ভিতরেও স্থান পাওয়া অসম্ভব নয়। পচনের শুরু হলো। অসুখ শরীরে স্থায়ী বাসা বাঁধলো। প্রবল জ্বরের ঘোরে যেমন সংলাপ আর প্রলাপের ভিতরের সূক্ষ্ম পার্থক্য লোপ পেয়ে যায়। ঠিক তেমনই, টুকে নম্বর পাওয়া আর মুখস্থ করে নম্বর তোলার ভিতরের সূক্ষ্ম পার্থাক্যটিও আমাদের চেতনায় লোপ পেয়ে যায়। শিক্ষার একেবারে গোড়া থেকেই। সৌজন্যে পরম শ্রদ্ধেয় হিতাকাঙ্খি পিতামাতা অভিভাবক থেকে শুরু করে স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের পূজ্যপাদ শিক্ষকশিক্ষিকা। না, এর ভিতরে রাজনীতির কোন কূটকাচালী নেই। রাজনৈতিক নেতানেত্রীদের বহুচর্চিত অবক্ষয় ও পচন নেই। কিন্তু শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে পিতামাতা অভিভাবক শিক্ষকশিক্ষিকার নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ও চারিত্রিক পচন রয়েছে। তার গন্ধও কম দুর্গন্ধের নয়। বরং রাজনীতির বহু আলোচিত দুর্গন্ধের থেকে অনেক বেশি ভয়ানক এবং সর্বাত্মক।


তাহলে দেখা গেল, বাংলা ও বাঙালির শিক্ষা ব্যবস্থা, পারিবারিক মূল্যবোধ, উভয়ের ভিতরেই পচনের অসুখ অনেক গভীরে তার শিকড় ছড়িয়ে বসে রয়েছে। এই অসুখের পরবর্তী সিমটম আমরা দেখতে পাবো, একটা চাকরিতে ঢোকার জন্যে ঘুষের সংস্কৃতির রমরমা’তে। বাবা মা’ কারুরই কোন আপত্তি নেই। বরং উৎসাহ রয়েছে ষোলআনা। যদি ঘুষ দিয়েই সন্তানের চাকরিটা পাকা হয়ে যায়। আর তার জন্যেই এই নেতা অমুক আমলা। যাকে পারো ধরো গিয়ে। দরকারে পায়ে গিয়ে পড়ো টাকার বাণ্ডিল নিয়ে। যে পদের যা দর। চাকরিটা নিশ্চিত হোক। বিয়ের হাটে পাত্রী ত্বকচর্চায় ব্যস্ত। যত বেশি ফর্সা হওয়া যায়। তত ভালো পাত্র নিশ্চিত। ভালো অর্থাৎ মোটা মাইনে বাঁধা উপার্জন। অবশ্য আজকাল আর শুধু ত্বকচর্চা কেশচর্চাতেই ভালো পাত্র মেলে না। ভালো ডিগ্রীও চাই। ভালো পণ দেওয়ার ক্ষমতা থাকলে তো কথাই নাই। ফলে বিয়ের কনেকে নিয়ে বাবা মায়ে’র দৌড়াদৌড়ি। পার্লার থেকে কসমেটিক। কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিসি চন্দ্র জুয়েলার্স। যেভাবেই হোক উপযুক্ত পাত্র জোটাতে হবে। না, তাই বলে এযুগের কনেরা সকলেই অভিভাবক নির্ভর নয়। অধিকাংশই বিয়ের হাটে নিজেকে বিক্রী করতে তুখোড় দক্ষতার অধিকারী। ফলে ছেলেধরা বিদ্যায় তারা এক একজন ডিলিট পাওয়ার অধিকারী। বঙ্গসমাজে বিবাহের সাথে কোন কালেই প্রেম ভালোবাসার সম্পর্ক ছিল না। গোটা বিষয়টাই কনের দিক থেকে অর্থনৈতিক। আর পাত্রের দিক থেকে দৈহিক। কিন্তু উপরের পালিশটা জবরদস্ত সুন্দর করে সাজানো। না, এখানেও রাজনীতির অভিশপ্ত ছায়া নেই কোন। কিন্তু পচনের দুর্গন্ধটুকু ষোলাআনা খাঁটি। অসুখের বিস্তার সর্বব্যাপ্ত। বাঙালির শিক্ষা স্বাস্থ্য অন্নসংস্থান জীবনধারণ। সবকিছুতেই এই অসুখ তার সাম্রাজ্য বিস্তার করে বসে রয়েছে। না, আমরা তাই নিয়ে চিন্তিত নই। আমদের চিন্তা রাজনীতির ময়লা যেন আমাদের গায়ে না লাগে। আমরা যেন চলমান রাজনীতির পচাগলা সংস্কৃতির দুর্গন্ধ থেকে গা বাঁচিয়ে চলতে ফিরতে পারি। আবার সেই আমরাই যে কোন অসাধু প্রয়োজনে সেই রাজনীতির দাদা দিদিদের হাতে পায়ে ধরে দেশের আইনকে কি করে কতটা ফাঁকি দেওয়া যায়। কি করে বেনামী সম্পত্তি বাড়িয়ে নেওয়া যায়। কি করে পাঁচজনেকে বাঁশ দিয়ে নিজের আখের গুছিয়ে নেওয়া যায় পাকা এবং পোক্ত করে। সেই সব বাস্তব বুদ্ধিতেই দুইবেলা শান দিতে থাকি। এটাই আমাদের চরিত্র। এটাই আমাদের অসুখ। সেই আমরা রাজনীতিতে থাকি আর নাই থাকি। তফাৎ কিছু নাই। অসুখ এবং অসুখের সিমটম সব এক।  


ফলে এইরকম এক সর্বাত্মক পচন এবং অসুখের হাত থেকে ডাক্তার উকীল ব্যাবসাদার আমলা পুলিশ মিলিটারী সাংস্কৃতিক কর্মী বুদ্ধিজীবী সেলেব্রিটি কেউই যেখানে মুক্ত নয়। সেখানে খামোকা কবি থেকে সাহিত্যিকরাই বা ধোয়া তুলসীপাতা হতে যাবেন কোন দুঃখে? না, তাই বাংলার কবি সাহিত্যিকরাও এক একজন এই অসুখের বীজ সগৌরবে বহন করে নিয়ে চলেছেন। অভিমুখ তাদের ক্ষমতার অলিন্দমুখী। এবং সেই কবি সাহিত্যিকদের নিয়ে যে সাহিত্যবাজার। সেখানেও এই পচনের দুর্গন্ধ অনেক গভীর অব্দি প্রসারিত। ফলে একজন কবিকে একজন সাহিত্যিককেও সাহিত্যসাধনার পাশাপাশি সমান ভাবে পুরস্কার সাধনা, খ্যাতির সাধনাও করতে হয় বইকি। না করলে আর যাই হোক সাহিত্যের বাজারে বাজারদর উঠবে না কিছুতেই। বিক্রী হবে না বই। প্রয়োজনে পকেটের টাকা খসিয়ে বই ছাপাতে হবে। সেই বই জনে জনে ডেকে ডেকে উপহার দিয়ে দিয়ে সেল্ফি তুলে ওয়ালে ওয়ালে পোস্ট করতে হবে। তবে যদি কিছুটা বাজার দর ওঠানো যায়। সেই বাজারদর ওঠানোর প্রক্রিয়ায় পুরস্কার সাধনা খুবই কার্যকরি এক প্রক্রিয়া। ফলে কবি থেকে সাহিত্যিক সকলকেই এখন প্রতিষ্ঠানের পুজোয় দুইবেলা সন্ধ্যাহ্নিক করতে হয়। ফলে তাঁদেরকেও রাজনীতির কারবারীদের নানান রকম মিছিলে মিটিংয়ে ক্যামেরার ফোকাসে মুখ দেখাতে হয়। যে খেলার যে নিয়ম। আর ক্ষমতাসীন শাসকদলের নেক নজরে পড়ে গেলে তো কথাই নাই। এই কমিটির মাথায় তো ঐ কমিটির মাথায়। কিন্তু সেখানে পৌঁছাতে গেলেও কিছুটা গ্রাউণ্ড ওয়ার্ক জরুরী। আর সেটাই সাহিত্যিকের বাজারদর তৈরীর উপরে নির্ভর করে। সাহিত্যের বাজারদর আবার পুরস্কার পাওয়া না পাওয়ার উপরে ওঠানামা করে অনেকটাই। ফলে পুরস্কার পেতে হয়। নইলে পিছলে যেতে হয়। সেই রিস্ক কেই বা নিতে চায়? কজনের বুকের পাটা ততদূর চওড়া? তাই আজকের কবি কিংবা সাহিত্যিককে সাহিত্য সাধনার পাশাপাশি এই পুরস্কার সাধনায় মনোনিবেশ করতে হয় বইকি। তার জন্য, যখন যেমন সুবিধে। যে প্রতিষ্ঠানই হোক না কেন। চৌকাঠে বারবার মাথা ঠুকতেই হবে। আর মাথা ঠুকতে ঠুকতেই কপাল খুলে যাবে। সাহিত্যের এই বাজারের পাশাপাশিই রয়েছে সাহিত্যের নানাবিধ ঠেক। অনেকটা মূল কোর্সে ভর্তির পরীক্ষায় বসার জন্য প্রিপেরেটরি কোর্সে নাম লেখানোর মতো। সাহিত্যের বাজারে জাঁকিয়ে বসার জন্য সাহিত্যের নানান ঠেক থেকেই নিজেকে পালিশ করে নিতে হয়। অনেকেই লিটল ম্যাগাজিনের পরিসরকেই এই প্রিপেরেটরি ঠেক বলে ধরে নেয়। আর আজকাল তো ওয়েব দুনিয়ার হাত ধরে প্রিপেরেটরি ঠেকের পরিসর বিস্তৃত হয়ে গিয়েছে দিগন্তপ্রসারী। সেখানোও মস্ত সুবিধে। নানবিধ প্যাকেজ। নানবিধ সুবিধে। যেভাবেই হোক না কেন নিজের ঢাক পেটানোর ব্যবস্থা নিজেই করে নিতে হবে। একে ধরো ওকে ধরো। এখানে কবিতা পাঠ। ওখানে কবিতা পাঠ। আজ গল্প পাঠ তো কাল পত্রিকার মোড়ক উন্মোচন। এখানে একটা সাক্ষৎকার তো ওখানে নিজের নামেই আস্ত একটা সংখ্যা নামিয়ে দেওয়া। তার জন্য অসুবিধে কি? বন্ধুবৃত্ত গড়ে তোলা তবে কি কারণে? আমার নামে গোটা একটা সংখ্যা প্রকাশ। আর বন্ধুরা সেই সংখ্যায় আমায় নিয়ে দুকলম লিখবে না? তাই হয় নাকি। অনুরোধে কি না হয়? আর বন্ধুরও পোয়াবারো। এই ফাঁকে ছাপা পত্রিকায় নিজের নামটাও ছাপিয়ে নেওয়া গেল। তার জন্যে একটু পিঠ চাপড়িয়ে দিলেই যদি হয়, অসুবিধে কি? বন্ধুরই তো পিঠ। ফলে পরস্পর পিঠ চাপড়ানোর এক সংস্কৃতি গড়ে তুলেছি আমরা। তাতে সকলেরই স্বার্থরক্ষা। যার যখন সময় আসে। সেই তখন আলোর বৃত্তে। এর ফলে কয়েকটি উপকার হয়েছে সাহিত্যবাজারে। প্রতিষ্ঠান বিরোধীতা আর নয়। প্রতিষ্ঠান পুজোই এখন নিয়ম। সেই নিয়ম না মানলে সাহিত্যবাজারে আর করে কম্মে খেতে হবে না। সাহিত্য সাধনাই নয়। পুরস্কার সাধনা আর খ্যাতির সাধনায় মত্ত থাকায়, সাহিত্যিকদের নিয়ে আজ আর পুঁজিবাদের প্রবক্তা ও মালিকদের কোন মাথাব্যথা নেই। পুঁজির স্বার্থেই পুঁজিবাদের নিয়ম মেনেই কবি সাহিত্যিকদেরকেও ডন বৈঠক করিয়ে নেওয়া যাচ্ছে দুই বেলা। আজকের কবি আজকের সাহিত্যিক তাই আর সমাজের অসুখ নিয়ে মাথা ঘামাতে রাজি নয়। তাঁর যত মাথাব্যথা বই বিক্রী। পুরস্কার। একটা কমিটির মাথায় বসা। তারজন্য যেসময়ের যে নিয়ম। খেলাটা খেলে যেতে হবে। জিততে গেলে। পচনের দুর্গন্ধে নাকে রুমাল দিলেই যথেষ্ঠ। খ্যাতি আর প্রতিপত্তি। নাম আর যশ। অর্থ আর বিত্ত। ভিতরের অসুখ যত দূরারোগ্যই হয়ে উঠুক, অসুবিধে কি?


২৮শে নভেম্বর’ ২০২১

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত