এও এক সংক্রমক ব্যাধি

গত দুই বছরে আপনার পাড়ায় কতজন কোভিড রুগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে? গড়ে প্রতিদিন কতজন কোভিড সংক্রমিত হয়েছে? এবং সেই একই দুই বছরে পাড়ায় মোট কতজনের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে কোভিড-১৯ নামক ভয়ঙ্কর ভাইরাস? বেশ, আপনি বলবেন আবিশ্ব কোথাও কোভিড সংক্রমণ দুই বছর ধরে একটানা চলেনি। খুব সত্যি কথা। কিন্তু এই যে একটার পর একটা ঢেউ আর নিত্যনতুন ভ্যারিয়েন্টের মিছিল। সেই সেই ঢেউপর্বের হিসেবগুলিও কি আপনি রেখেছেন একটি দিনে জন্যেও?

আচ্ছা বেশ, নাগরিক মানুষ আপনি। নিজের পাড়ায় কে অসুস্থ হচ্ছে। কে মারা যাচ্ছে। সে খবর আপনার জানা নাই থাকতে পারে। কিন্তু আপনার পরিবার, আত্মীয়স্বজন। বন্ধুবান্ধব? মোবাইল আর নেট সংযোগে প্রত্যেকের সাথেই যোগাযোগ থাকার কথা নিশ্চয়ই। গত দুই বছরে কতবার আত্মীয়স্বজন আর বন্ধুবান্ধবদের জন্য হাসপাতালে দৌড়াদৌড়ি করতে হয়েছে আপনাকে? এই সময় পর্বে, যখন এক একটি ঢেউ পর্বে প্রতিদিন হাজার হাজার করোনা রুগীর মৃত্যুর খবর জানছিলেন টিভি কাগজ আর ইনটারনেটে, সেই একই সময়পর্বে নিজের কতজন আত্বীয়স্বজন বন্ধুবান্ধবকে দাহ করে ফিরেছন? না, কাউকেই সেই হিসেব দিতে হবে না। অন্তত নিজের কাছে সেই হিসেবটুকু রেখেই দেখুন না, আপনার শিক্ষা বুদ্ধি অভিজ্ঞতায়, সচেতন প্রজ্ঞা কি বলে?

সংক্রমক রোগ হলেই যে মহামারী হবে, এমন তথ্য কোথায় পেলেন আপনি? ভাইরাল ফিভার কি নতুন কিছু আপনার জীবনে? ২০১৯-এর আগে বছরে কতবার সর্দি কাশিতে ভুগেছেন জীবনে? আর কতবার প্যারাসিটমল কিংবা এন্টিবায়োটিক খেয়ে জ্বর সাড়িয়ে নিয়ে ডাক্তার খরচ বাঁচিয়েছেন? শীত আর বর্ষায় দফায় দফায় এই বাংলায় সর্দি কাশি জ্বরের প্রকোপ যে বেড়ে যায়। সে কথা কি অজানা ছিল আপনার? আপনি কি জানেন, এই সর্দি কাশি জ্বর আবহমান কাল ধরেই মূলত করোনা ভাইরাসের কারণেই হয়ে আসছে? এবং সারা বিশ্বের পরিসংখ্যান অনুযায়ী বছরে কম বেশি প্রায় সাত আট লাখ মানুষ এই সর্দি কাশি জ্বরেই মারা যায়?

একথা ঠিক দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে যাদের জ্ঞান ফুটেছে। বিশেষ করে এই বাংলায়। তাদের জীবন অভিজ্ঞতায় মহামারী প্রত্যক্ষ করার সুযোগ বা দুর্যোগ কোনটাই হয়নি আজও। ফলে টিভি কাগজ আর ইনটারনেটেই প্রত্যক্ষ করতে হচ্ছে মহামারী। কিন্তু আপনার নিজের পাড়ায়? সেখানে মহামারী লেগেছে কি এই দুই বছরে? মাহামারী অর্থাৎ আজ এর বাড়ি থেকে কান্নার রোল উঠলো তো কাল ওর বাড়ি থেকে। এইবেলা এক প্রতিবেশীকে দাহ করে ফিরলেন তো ওবেলা আর এক প্রতিবেশীকে নিয়ে ছুটলেন দাহ করতে। নাগরিক জীবনে না হয় পাড়ার কথা ছেড়েই দিন। একটু ভেবে বলুন তো, গত দুই বছরে এই বাংলায় আপনার কতজন আত্মীয় বন্ধুবান্ধব করোনা আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি না হতে পেরে পথেই মারা গিয়েছে? এক একজন বন্ধুবান্ধব আত্মীয়স্বজনকে দাহ করতে কতগুলি শ্বশানে ঘুরে ঘুরে ঘন্টার পর ঘন্টা লাইন দিয়ে পড়ে থাকতে হয়েছে প্রথম ও দ্বিতীয় ঢেউয়ের সময়ে? না, হিসেবটুকু আপনার নিজের কাছে মজুত রাখলেই যথেষ্ঠ।

হ্যাঁ একথা ঠিক। গত বছর কৃত্রিম উপায়ে ম্যানমেড অক্সিজেন সঙ্কট সৃষ্টি করে করোনায় মৃতের সংখ্যা বাড়িয়ে দেখানোর একটা ব্যবস্থা হয়েছিল। এবং তাতেও শেষ না হয়ে, অধিকাংশ শ্বশান বন্ধ করে রেখে দুই একটি শ্বশানের ডেডবডির লাইনের ছবি ভাইরাল করা হয়েছিল। মাঝখান থেকে অক্সিজেন সিলিণ্ডারের ব্যাবসার সাথে জড়িতরা বেশ দুই পয়সা অতিরিক্ত মুনাফা করে নিয়েছিল। দশ বছরের মুনাফা দুই মাসেই হাসিল করতে সক্ষম হয়েছিল। তাদের মুনাফা নিয়ে আমার আপনার মাথাব্যাথা করার দরকার নাই। কিন্তু আপনি কি এক বারের জন্যেও ভেবে দেখেছেন কখনো? ২০১৯ অব্দি সময়পর্বে, হাসপাতালে হাসপাতালে গড়ে দিনে কতজন রুগীর অক্সিজেন লাগতো? এবং হাসপাতালে নিতে দেরি হওয়ায় শুধু সময়মত অক্সিজেন না দিতে পারার কারণে সারা বাংলায় কতজন মানুষের মৃত্যু হতো? খুবই সত্য কথা। কোথাও কোনদিন এই প্রয়োজনীয় পরিসংখ্যানগুলি ঠিকমত রাখার বন্দোবস্তই করা হয়নি। তাই এই পরিসংখ্যান আমার আপনার কাছেও নাই। থাকার কথাও নয়। কিন্তু স্মরণ করে দেখুন তো। ২০২০’র আগে আত্বীয়স্বজর বন্ধুবান্ধবদের জন্য যখনই কোন হাসপাতালে কিংবা নার্সিংহোমে যেতে হয়েছে। ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে অক্সিজেনের নল লাগানো রুগীর মুখ কি কম দেখেছেন জীবনে? যাঁদেরই মোটামুটি হাসপাতাল নার্সিংহোমে যাওয়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে। তারাই জানেন। হাসপাতালে গেলে প্রথমেই যে দুইটি পরিসেবা মেলে। সেই দুইটি হলো স্যালাইন আর অক্সিজেন। অধিকাংশ রুগীর’ই প্রধানত এই দুইটি’র কোন একটি পেলেই ধরে প্রাণ আসে। তারপরে যার যার যেমন চিকিৎসার প্রয়োজন।

তাহলে একবার ভেবে দেখুনই না হয়। তখন তো আর কোভিড-১৯ ছিল না। তাহলে প্রতিদিন এত রুগীর অক্সিজেন লাগতো কেন? গত দুই বছরে এই ধরণের রুগীর সংখ্যা নিশ্চয় কমেও যায়নি বা শূন্য হয়েও যায়নি। এখন সেই অক্সিজেনের হাহাকার সৃষ্টি করে দিতে পারলেই কিন্তু কোভিডে আক্রান্ত না হওয়া রুগীটিও প্রয়োজনের অক্সিজেন না পেয়ে মারা যাবেন। ফলে কোভিডে আক্রান্ত রুগীর সাথেই কোভিডে আক্রান্ত না হওয়া রুগীর’ও অক্সিজেনের অভাব হলে মারা যাওয়ারই কথা। গত বছরের সেই ম্যানমেড অক্সিজেন সঙ্কটে কতজন কোভিড আক্রান্ত আর কতজন সাধারণ রুগী অক্সিজেনের অভাবে মারা গিয়েছিলেন। সেই পরিসংখ্যান কেন্দ্র বা রাজ্য কোন সরকারই কি দেখিয়েছে আপনাকে?

না, না। দেখাবেই বা কেন? আপনিই তো দেখতে চাননি। দেখার কথা মনেই হয় না আমার কিংবা আপনার। বরং অক্সিজেনের হাহাকার আর করোনা মহামারীকে এক করে দেখানোর প্রচার এমন ভাবেই সার্থক হয়ে উঠেছিল যে, ফ্রীতে ভ্যাকসিন পাওয়ার লাইনে আমি আপনি সোশ্যাল ডিস্টেন্সিং ভুলে পড়ি কি মড়ি করে ছুটেছিলাম। মনে পড়ছে নিশ্চয়? কে কাকে গুঁতো মেরে সরিয়ে কে কার আগে ভ্যাকসিন নেবে। তখন কিন্তু আর সোশ্যাল ডিস্টেন্সিং মানার দরকার হয়নি আমাদের। শুধু চোখ রেখেছিলাম দৈনিক মৃত্যুর সংখ্যাতত্বে। তাই তো?

সোশ্যাল ডিস্টেন্সিং সমাজিক দূরত্ব বিধি’র প্রচার করে করেই করোনা যুদ্ধে জয়ী হব আমরা। কিন্তু পুজো মার্কেটিংই হোক আর সাধের রাজনৈতিক নেতানেত্রীর বচন শুনতেই হোক। কিংবা লকডাউনের বাজারে একটা গাড়িতে তিন গাড়ি’র যাত্রীর সাথে গন্তব্যস্থলে রওনা দিতেই হোক। আমাদের কিন্তু মানসিক অসুবিধে হয়নি বিশেষ। হলে তো আমরা আরও বেশি করে সরকারী পরিবহন চালু রাখার দাবি করতাম নিশ্চয়। আরও বেশি করে পুজোর বাজার এড়িয়ে যেতাম। যে যে রাজনৈতিক দল ভোটের আগে যত বেশি করে জনসমাবেশ করেছে, তাদের তত কম করে ভোট দিতাম। না, সেরকম কিছুই আমরা করিনি। কারণ আমরা এটা দেখে নিয়েছি। করোনা আসলেই ততটাও সংক্রমক নয়। হলে ছবিটা অন্যরকম হতো। আমরা দেখে নিয়েছি, করোনা আদৌ কোন মহামারীও নয়। হলে ছবিটা অন্যরকম হতো। প্রাণের ভয় আমার আপনার কারুরই কিন্তু কম কিছু নয়।

হ্যাঁ নিজের বাড়ীর চারপাশে। নিজের আবাসনে। নিজের গ্রামে, যে যেখানেই থাকুন না কেন। বাজার হাট দেকান থেকে ঝাঁচকচকে শপিং মলে আপনি কিংবা আমি, কেউই কিন্তু পথে ঘাটে মড়া পড়ে থাকতে দেখিনি এই দুই বছরের বিশ্বজুড়ে চলতে থাকা অতিমারীতেও। কিন্তু সেই দৃশ্যের কোন না কোন স্মৃতি আমাদের বাপ ঠাকুর্দারা আজও বেঁচে থাকলে স্মরণ করতে পারতেন নিশ্চয়। কেননা তাঁদেরকে এক আধবার মহামারীর পর্বের ভিতর দিয়ে যেতে হয়েছিল জীবনে। মাহামারী টের পেতে তাঁদেরকে সকালের খবরের কাগজের পাতা ওলটাতে হয়নি। আকাশবাণী ঢাকা কিংবা কলকাতার শরণাপন্ন হতে হয়নি।  কিন্তু আমরা কি দেখছি আর কি দেখছি না। সেটা আর হয়তো এই একুশ শতকের নিও লিবারাল ইকনমির গ্লোবালাইজেশনের যুগে ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। ঠিক যতটা গুরুত্বপূর্ণ আমরা কি শুনছি আর শুনছি না। আমাদেরকে কি শোনানো হচ্ছে আর হচ্ছে না। এবং আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বরং আমাদের কি কি ভাবতে বলা হচ্ছে। কিভাবে ভাবতে ও অন্যকেও ভাবাতে বলা হচ্ছে। সেই সব।

ফলে আমি এবং আপনি, দুজনেই জানি কখন কোন ডোজ ভ্যাকসিন নিতে কোন লাইনে দাঁড়াতে হবে। কখন কখন লকডাউন জরুরী আর কেনই বা জরুরী, জানি বইকি সেই কথাও। কেন মাক্স না পড়লে সেটা অশিক্ষিতের মতো কাজ হবে। আর কেনই বা স্যানিটাইজার ছাড়া হাত না কচলালে একবিংশ শতকের স্মার্ট সিটিজেন হওয়া যাবে না। এইসবই আমাদের জানা। তাই ভুলেও আমরা লকডাউন বিরোধী মিছিলে হাঁটিনি। ভুলেও ছেলেমেয়েদের স্কুল খোলার দাবিতে রাস্তা অবরোধ করে বসে পড়িনি। ভুলেও ভেবে দেখতে যাই নি, ভারতীয় কৃষকরা দিল্লীর সীমান্তে রাজপথে অবস্থান করে তেরো মাস মাস্ক স্যানেইটাইজার ছাড়াই সোশ্যাল ডিস্টেন্সিং পালন না করেও কোন জাদুতে এত বড়ো অতিমারীতেও টিকে রইল সুস্থ হয়ে।

এবং কি আশ্চর্য্য! আমি এবং আপনি দুইজনেই কিন্তু এত বড়ো মহামারীতেও টিকে রয়েছি। অন্তত আজকের দিনেও। খুবই স্বাভাবিক। কেননা আমরা লকডাউন মেনে চলি। আমরা মাস্ক পড়ে ঘুড়ি। আমরা চেনা পরিচিত অপরিচিতের ছায়াও মাড়াই না। আমরা প্রতিদিন করোনাস্কুলে পড়াশুনা করি। সুবোধ ছাত্রছাত্রীর মতোন। ফলে যমও আমাদের ছুঁয়ে দেখতে রাজি নয়। করোনা তো কোন ছাড়। এবং নিয়মিত ভ্যাকসিন নেওয়ার লাইনে গিয়ে দাঁড়িয়ে বিশ্ব অর্থনীতিকে চাঙ্গা রাখি। ফলে আমরা করোনাকে ঠেকিয়ে দেবো। এ আর বেশি কথা কি?

৫ই জানুয়ারী’ ২০২২

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত